লাইসেন্স প্রদান ও বাতিলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ এমআরএ’র কার্যক্রম বিশৃঙ্খলা ক্ষুদ্রঋণ খাতে
লাইসেন্স প্রদান ও বাতিলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ এমআরএ’র কার্যক্রম বিশৃঙ্খলা ক্ষুদ্রঋণ খাতে

সেবা ডেস্ক:  দারিদ্র্য দূরীকরণে ক্ষুদ্রঋণকে দেশের অর্থনীতির প্রথম বিপ্লব হিসাবে ধরা হয়। ক্ষুদ্র অর্থায়ন দেশের জিডিপিতে (গ্রোস ডমেস্টিক প্রোডাক্ট) ৯ থেকে ১৩ শতাংশের মতো অবদান রাখছে। তবে এ খাতের যে অর্জন তা ম্লান করছে অনিয়ম দুর্নীতি। গ্রাহকের টাকা আত্মসাত্, চাকরি দেওয়ার নামে টাকা হাতিয়ে নেওয়াসহ বিভিন্ন অনিয়মের সঙ্গে জড়াচ্ছে কিছু ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানে চাকরিরতরা। অনেকক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না তাদের। এদিকে ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ) প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, জনবল কম হওয়ায় তাদেরকে রুটিন কাজ করতেই বেশিরভাগ সময় ব্যয় হয়ে যায়। তাই এ বিষয়ে যে নিবিড় তত্ত্বাবধান করা দরকার তেমন কিছু হচ্ছে না।
স্বাধীনতার পর পরই দেশে ক্ষুদ্রঋণের প্রচলন ব্যাপকভাবে শুরু হয়। ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার নানান ঝক্কি-ঝামেলা এড়ানো, জামানত ছাড়া ঋণ পাওয়ার সুবিধা, দ্রুত ঋণ প্রাপ্তি, বাড়ি এসে ঋণ দেওয়াসহ নানান সুবিধার কারণে ক্ষুদ্রঋণদান প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে গ্রামীণ মানুষ ঋণ নেয়। আর গ্রামের সহজ-সরল মানুষের সেই সুযোগ নিয়ে কিছু প্রতিষ্ঠান বা প্রতিষ্ঠানের চাকরিরত বক্তি তাদের সঙ্গে প্রতারণা করছে। শুরুর দিক থেকেই এ খাত অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে চলায় কারো বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও কম ছিল। এর পর এমআরএ গঠিত হয়। এ প্রতিষ্ঠানটি এ খাতে কাজ করছে। তবে এখন প্রতারণার ধরন পাল্টেছে। এখনো ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন ধরনের আর্থিক অনিয়ম করছে। তাদের অনিয়মের মধ্যে অন্যতম হলো প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ আত্মসাত্। এছাড়াও চাকরি দেওয়ার কথা বলে টাকা সংগ্রহ করে পরে চাকরি না দেওয়া, গ্রাহকদের কাছ থেকে বেশি সুদ সংগ্রহ করাসহ নানান অনিয়ম করছে এসব প্রতিষ্ঠান।
এ বিষয়ে বিআইবিএমের মহাপরিচালক ও এমআরএর পরিচালনা পর্ষদের সদস্য প্রফেসর ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, ক্ষুদ্রঋণ খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করছে এমআরএ। তবে জনবল সংকটের কারণে অনেক কাজই করা যাচ্ছে না। লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজও ঠিকমতো পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে না। রুটিন কাজেই বেশিরভাগ সময় ব্যয় হয়। এজন্য প্রতিষ্ঠানের জনবল বাড়ানো গেলে এ খাতে শৃঙ্খলা আরো আসবে বলে তিনি মনে করেন।
এমআরএ তথ্যে দেখা গেছে, চলতি বছরের শুরু থেকে যেসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে চাঁদপুরের ভলান্টারী অ্যাসোসিয়েশন ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (ভারকপ) ও সমাজ উন্নয়ন প্রচেষ্টা, রাজবাড়ীর বসন্তপুর পল্লীসেবা সংস্থা, নোয়াখালীর সোসাইটি ফর পীস এন্ড চ্যারিটি, রাজশাহীর এমএসপি-মাইক্রোক্রেডিট প্রোগ্রাম, ঢাকার ইন্টিগ্রেটেড সোশ্যাল এইড, সোশ্যাল এডভান্সমেন্ট এন্ড ভিলেজ ইকোনমি (সেভ) ও ইন্টিগ্রেডেট ভলানটিয়ার্স ফর সোশ্যাল এডভান্সমেন্ট (ইবসা)। এছাড়া সাতক্ষীরার গণ প্রগতি, কক্সবাজারের ফাউন্ডেশন ফর ওয়েলফেয়ার একটিভিটিজ এন্ড ডেভেলপমেন্ট, কুমিল্লার রেড, নারায়ণগঞ্জের সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার এন্ড ইকোনমিক্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন রয়েছে। এর বাইরে জামালপুর ও শেরপুরে কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান সৃজন মহিলা সংস্থা, ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় কার্যক্রম পরিচালনাকারী আন্ডারপ্রিভিলেজড চিলড্রেনস এডুকেশন প্রোগ্রামস (ইউসেপ)- বাংলাদেশ, ফেনী ও চট্টগ্রামে কার্যকম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান মাইন বহুমুখী সমাজকল্যাণ সমিতি, মাদারীপুরের অবলম্বন মানবকল্যাণ সংস্থার লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৮০টি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের সনদপত্র বাতিল করেছে এমআরএ।
এমআরএ থেকে পাওয়া সূত্রে জানা গেছে, সনদের জন্য সারা দেশ থেকে ৫ হাজার ক্ষুদ্রঋণ দানকারী প্রতিষ্ঠান আবেদন করেছে। এর মধ্যে এমআরএ থেকে লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এখন ৬৮৫টি। ২০১৬ সালের শুরু থেকে এ পর্যন্ত লাইসেন্স পেয়েছে আটটি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে রয়েছে কুড়িগ্রামের সততা সংস্থা (এস.এস), বগুড়ার আশার আলো সমাজ কল্যাণ সংস্থা (এ. এস. কে. এস) ও সমাজ উন্নয়ন কর্ম (সার্ক), নারায়ণগঞ্জের আইডিয়াল কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন, সিরাজগঞ্জের মানব মুক্তি সংস্থা ও সোনার বাংলা পল্লী উন্নয়ন সংস্থা, রাজবাড়ীর হীরা সমাজ উন্নয়ন সংস্থা এবং চট্টগ্রামের হাম ট্রাস্ট।
ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার আগে প্রাথমিক অনুমোদন দেওয়া হয়। সেক্ষেত্রে তাদের কার্যক্রম সন্তোষজনক হলে চূড়ান্ত অনুমোদন মেলে। অন্যথায় তাদের প্রাথমিক অনুমোদনও বাতিল করা হয়। সাময়িক অনুমোদন নেওয়া প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে করুণ অবস্থা। চলতি বছরের শুরু থেকে মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান কাজ করার অনুমোদন পেয়েছে। প্রতিষ্ঠান দুটি হলো বগুড়ার গ্রামীণ আলো এবং জয়পুরহাটের শ্যামপুর সমাজ উন্নয়ন সংস্থা (এস.এস.ইউ.এস)। অপরদিক চলতি বছরে সাময়িক অনুমোদন প্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের তালিকা থেকে বাদ পড়েছে ১৫টি প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগই ঢাকার। পিপল ফর দা পিপল, উচ্ছ্বাস ফাউন্ডেশন, আনন্দ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন, ধরিত্রি ফাউন্ডেশন ফর ইনফরমেশন এডুকেশন, হেল্প ফাউন্ডেশন, সোসিও ইকনোমিক ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি অফ বাংলাদেশ (সিডার) এবং আরাফা শক্তি ফাউন্ডেশনের ঠিকানা ঢাকা ব্যবহার করা হয়েছিল। এছাড়া খুলনার চলন্তিকা যুব সোসাইটি, মানিকগঞ্জের ফাউন্ডেশন ফর একটিভিটি লিনিয়েজ অব অবজারভেশন (আলো), রাজশাহীর প্রদিপ্ত মানব কল্যাণ সোসাইটি ও আমাদের সোসাইটি, চট্টগ্রামের মুক্তির আলো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (এমএএসডিএফ), ঝালকাঠীর দারিদ্র্য দূরীকরণ সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা, মাদারীপুরের সোসাইটি ফর পভার্টি ডিক্রিসিং এন্ড প্রোগ্রেসিভ এবং মুন্সীগঞ্জের নীলিমা হেলথ এন্ড এডুকেশন সোসাইটিকে সাময়িক অনুমোদনপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।-ইত্তেফাক.