কুড়িগ্রামে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন সংসদ সদস্য রুহুল আমিন

Member of Parliament Ruhul Amin
গোলাম মোস্তফা রাঙ্গা: কুড়িগ্রাম জেলার প্রতিকূল উপজেলার নাম রৌমারী ও রাজিবপুর। জেলা সদর হতে উপজেলাদ্বয়কে বিছিন্ন করেছে ব্রহ্মপুত্র নদ। জেলা শহর হতে নৌকায় যেতে সময় লাগে প্রায় ৪ঘন্টা। তাই সমাজকর্মীদের সেখানে পৌছানো একটি দূরহ ব্যাপার। তাই বলে তো আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের কাজ থেমে থাকতে পারে না। কেউ না কেউ নিজ দায়িত্বে সে কাজে ঝাপিয়ে পড়ে। 

তেমনি একজন একনিষ্ঠ সমাজসেবক রৌমারীর উপজেলা আনসার কোম্পানি কমান্ডার মোঃ রুহুল আমিন, এমপি। তিনি ১৯৮৬ সালে রৌমারী উপজেলায় উপজেলা আনসার কমান্ডার হিসেবে স্বেচ্ছাশ্রমে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সার্বিক সহযোগীতার লক্ষ্যে কাজ করা শুরু করেন। সেই থেকে তিনি আনসার বাহিনীর সদস্য হিসাবে একের পর এক আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন। 

সেই কাজের স্বীকৃতিস্বরুপ ২০১৭ সালে ১২ ফেব্রুয়ারি আনসার বাহিনীর সর্বোচ্চ পদক বাংলাদেশ আনসার সেবাপদকে ভূষিত হন এবং ৩৭তম জাতীয় সমাবেশে প্রধানমন্ত্রীর নিকট হতে পদক গ্রহণ করেন। 
সামাজিক উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন সংসদ সদস্য রুহুল আমিন  
তিনি কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলার যাদুরচরাধীন বারবান্দা গ্রামে ১৯৫৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। মরহুম জয়েন উদ্দিন পন্ডিত ও মরহুমা আলহাজ¦ জহিরন নেছার ৫ সন্তানের মধ্যে রুহুল আমিন দ্বিতীয় সন্তান। পরিবারের বড় ছেলে বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ¦ গোলাম হোসেন ছিলেন বিশিষ্ট সমাজসেবক ও রাজনীতিবিদ। বড় ভাইয়ের সংস্পর্শে থেকে দেশ ও সমাজের মানুষের জন্য সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেন রুহুল আমিন। বড় ভাই মরহুম আলহাজ¦ গোলাম হোসেন (বীর মুক্তিযোদ্ধা) ছিলেন জনহৈতশী ও এলাকার সুপরিচিত। তিনি ১৯৭৭ সালে প্রথম বার রৌমারী সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং ১৯৮৪ সালে ২য় বারের মত চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৮৫ ইং সালে রৌমারী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

এরপর ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ এবং ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত ২ বার কুড়িগ্রাম ৪ আসনে জাতীয় পার্টি থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে অত্যন্ত সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১ জুলাই ২০০৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন। বড় ভাইয়ের কর্মস্প্রীহা রুহুল আমিনের শরীরে শিহরণ তুলতো। চরে দুর্বিসহ জীবন যুদ্ধে এগিয়ে যাওয়া সাধারণ মানুষের জন্য কিছু করার চিন্তায় তিনি সদা মগ্ন থাকতেন।

তিনি রাজিবপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৭২ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ২য় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। তারপর ১৯৭২ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ রাইফেলস এ যোগদান করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন চরাঞ্চলের দুর্বিসহ জীবনের সাথী-সঙ্গী ও সহযোদ্ধাদের উন্নয়নে অনেক কিছুই করবেন। তাই তো তিনি বাংলাদেশ রাইফেলে ১২ বছর সুনামের সাথে চাকুরী করার পরেও ইস্তেফা দিয়ে চরাঞ্চলের মানুষের উন্নয়নে কাজ করার লক্ষ্যে নিজ এলাকায় চলে আসেন। 

কোন বড় কাজ শুরু করতে একটি সংগঠনের প্রয়োজন হয়। তাই তো তিনি দেশের ঐতিহ্যবাহী তৃর্ণমূল পর্যায়ের বৃহৎ সংগঠন আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীকে কাজ করার প্লাটফর্ম হিসাবে বেছে নেন। ১৯৮৬ সালে তিনি রৌমারী উপজেলায় উপজেলা আনসার কমান্ডার হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সার্বিক সহযোগীতার কাজ শুরু করেন। তিনি নিজ ব্যবসা ও কৃষি কাজের পাশাপাশি জনসাধারণের কথা ভেবে জনসেবামূলক কাজে আত্মনিয়োগ করেন। চারিদিকে তার সুনাম পরিচিতি লাভ করতে থাকে। তার জনসেবামূলক কর্মকান্ডের ফলশ্রুতিতে তিনি ২১ মার্চ ১৯৯২ এ রৌমারী সদর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে প্রথম বার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৮ পর্যন্ত পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন। ভাল কাজের প্রতিদান স্বরুপ তিনি ৫ মার্চ ২০০৩ এ দ্বিতীয় বারের মত বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে ২৫ জুন ২০১১ পর্যন্ত অত্যন্ত সুনাম ও দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। 

তিনি বাংলাদেশ ইউনিয়ন পরিষদ ফোরাম ও বাংলাদেশ ইউনিয়ন পরিষদ এসোসিয়েশন, কুড়িগ্রাম জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তার এই জনপ্রিয়তার নৈপুন্যতার দরুন ২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারি ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি জেপির মনোনয়নে কুড়িগ্রাম ৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে এলাকার উন্নয়নের জন্য দিনরাত নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিভিন্ন সময়ে তিনি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মন্দির নির্মাণের আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকেন। বাংলা ভাষার পাশাপাশি তিনি হিন্দি ভাষায় দক্ষ। তার জনপ্রিয়তা ও উন্নয়নের উদাহরণস্বরূপ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থেকে পদক ও সম্মাননা লাভ করেই যাচ্ছেন। 

রাষ্ট্রপতি কর্তৃক আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে জাতীয় পুরস্কার১৯৮৭ সালে আনসার বাহিনী থেকে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে জাতীয় পুরস্কার; ২০০২ সালে আনসার ভিডিপি’র মহাপরিচালক কর্তৃক অভিপ্রায় সম্মানসূচক অভিজ্ঞতা সনদ; ২০০১ সালে বিডিআর কর্তৃক বড়াইবাড়ী সীমান্ত যুদ্ধে পুরস্কার ও সনদ; ২০০১ সালে বীর মুক্তিযোদ্ধা খালেদা জিয়া পদক; ২০০৩ সালে আনসার বাহিনী কর্তৃক স্বর্ণ পদক; ২০০৪ সালে আনসার বাহিনী কর্তৃক রৌপ্য পদক; ২০১৪ সালে বাংলাদেশ শিক্ষা পর্যবেক্ষণ সোসাইটি কর্তৃক “সমাজ সেবায়” বিশেষ অবদানের জন্য সফল সম্মাননা ২০১৪ এবং নর্থবেঙ্গল ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিল কর্তৃক “গণমানুষের জনপ্রিয় নেতা” হিসেবে বিশেষ অবদানের জন্য নর্থবেঙ্গল গোল্ড অ্যাওয়ার্ড ২০১৪; ২০১৫ সালে বাংলাভিশন ফাউন্ডেশন কর্তৃক “সমাজসেবায়” বিশেষ অবদানের জন্য বাংলাভিশন পদক ২০১৫ এবং বিশ্ব ইতিহাস গবেষণা একাডেমি কর্তৃক “সমাজসেবায়” বিশেষ অবদানের জন্য বেস্ট পারফরমেন্স অ্যাওয়ার্ড ২০১৫ লাভ করেন। 

সর্বশেষ ২০১৭ সালে ১২ ফেব্রুয়ারি আনসার বাহিনীর সর্বোচ্চ পদক বাংলাদেশ আনসার সেবাপদকে ভূষিত হন এবং ৩৭তম জাতীয় সমাবেশে প্রধানমন্ত্রীর নিকট হতে পদক গ্রহণ করেন। 

তিনি তার সুখানুভুতি প্রকাশ করে বলেন, “এই আনসার বাহিনীর সদস্য হতে পেরে আমি ধন্য। এই বাহিনীর প্রতি আমি ও আমার পরিবার-পরিজন কৃতজ্ঞ। যতদিন সুস্থতা ও সামর্থ থাকবে ততদিন এই বাহিনীর সদস্য হয়ে কাজ করে যাবো”। তিনি আনসার বাহিনীর ঐতিহ্য সম্পর্কে বলেন, এ বাহিনী বাংলাদেশের আকাশে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের ন্যায়। এই বাহিনীর ইতিহাস বাংলাদেশের ইতিহাসকে আরো সমৃদ্ধ করেছে। 

১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে আনসার কমান্ডার আব্দুল জব্বার জীবন বিলিয়ে দিয়ে আনসার সদস্যদের তথা দেশের মুক্তিকামী মানুষকে উজ্জ্বীবিত করেছেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর আনসার সদস্যরা প্রায় চল্লিশ হাজার রাইফেল ও গোলাবারুদ নিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে দুর্বার প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মেহেরপুর জেলার মুজিবনগরে বৈদ্যনাথতলায় আনসার বাহিনীর প্লাটুন কমান্ডার ইয়াদ আলীর নেতৃত্বে ১২ জন আনসার সদস্য স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার অস্থায়ী মুজিব নগর সরকারকে সর্বপ্রথম গার্ড অব অনার প্রদান করার গৌরব অর্জন করেন। অনেক জায়গায় আনসার সদস্যগণ সম্মুখ যুদ্ধ ও আক্রমণ শুরু করে। হাজার হাজার আনসার সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে চলে যায় এবং বিভিন্ন স্থানে মুক্তিবাহিনীর শিবির স্থাপন করে যুবকদের প্রশিক্ষণ প্রদান শুরু করেন। দেশের ভেতর অনেক আনসার গেরিলা যুদ্ধ চালাতে থাকে। নয় মাস স্বাধীনতা যুদ্ধে এ বাহিনীর ৯ জন অফিসার, ৩ জন কর্মচারী এবং ৬৩৫ জন আনসার শাহাদৎ বরণ করেন।
Member of Parliament Ruhul Amin is going to work
স্বাধীনতা যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগের জন্য বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক চাঁদপুরের আনসার কমান্ডার এলাহী বক্স পাটোয়ারীকে “বীর বিক্রম” এবং মাগুরার আনসার কমান্ডার গোলাম এয়াকুবকে “বীর প্রতীক” উপাধিতে ভূষিত করেন। স্বাধীনতার ইতিহাসে আনসার বাহিনীর নাম উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।
স্বাধীনতা-উত্তর আনসার বাহিনীর কর্মতৎপরতাও ব্যাপক হারে শহর-বন্দর ও গ্রাম-গঞ্জে বিস্তার লাভ করে। স্বাধীনতার ২৩ বছর পূর্বে ১৯৪৮ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি আনসার বাহিনী গঠিত হয়। যার লক্ষ্য হচ্ছে দেশের আইন শৃংখলা রক্ষাসহ রাষ্ট্র ও জননিরাপত্তা বিধান আর্থ-সামাজিক অবস্থা পূনর্গঠন তথা যাবতীয় জাতি গঠনমূলক কাজে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ। অতঃপর ১৯৪৮ সালের ১৭ জুন আনসার “অ্যাক্ট-১৯৪৮” অনুযায়ী আনসার সংগঠন একটি স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করে। বর্তমান বিভিন্ন কেপিআইসহ বিমান বন্দর, রেল রক্ষা ও মহাসড়কে আনসার বাহিনীর নিরাপত্তা বিধান কার্যক্রম মানুষের মনে চির অম্লান হয়ে থাকবে।

দুই পুত্র এবং দুই কন্যার সন্তানের জনক রুহুল আমিনের স্ত্রী খালেদা আমিন পেশায় গৃহিনী। বড় ছেলে মোঃ খালেকুজ্জামান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক এবং অপর ছেলে মোঃ খোরশেদ আলম বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি)-এর সদস্য। বড় মেয়ে মোছা. নুরুন্নাহার আক্তার খুশি গৃহিনী এবং মোছা: সাদিয়া আমিন ৯ম শ্রেণিতে অধ্যায়নরত। রুহুল আমিনের ছোট ভাই আলহাজ¦ মোঃ লুৎফর রহমান রাজিবপুর ডিগ্রী কলেজের প্রভাষক। অপর ভাই মোঃ আতাউর রহমান সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক এবং ছোট ভাই মোঃ মোজাফ্ফর হোসেন কলাবাড়ী বিবিসি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।

, ,