
সেবা ডেস্ক: রাজধানী ঢাকার গুলশানে অবস্থিত হোলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে তিন বছর আগে আজকের দিনে ভয়ংকর হামলা করেছিল জঙ্গিরা। ২০১৬ সালের ১ জুলাই হোলি আর্টিজানে তারা সৃষ্টি করেছিল বিভীষিকাময় আবহ। সারাদেশ স্তম্ভিত হয়েছিল প্রায় ১৫ থেকে ১৬ ঘন্টা। এক নম্বর প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়নের উদ্ধার অভিযানের পর ভেতরে জঙ্গিদের পৈশাচিকতার দৃশ্য দেখে দেশবাসী হয়ে পড়ে শোকে কাতর।
তবে এ বিষয়ে কাজ করা গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে জঙ্গিরা নির্মূল না হলেও বড় হামলা করার মত শক্তি নেই তাদের। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দেশের শত্রু কুলাঙ্গার জঙ্গিদের কোমর ভেঙে দিয়েছে।
২০১৬ সালের ১ জুলাই রাজধানীর গুলশান ২-এর ৭৯ নম্বর সড়কের ৫ নম্বর প্লটের স্পেনিস এই রেস্তোরা ও বেকারি-হোলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার ঘটনায় ৯ জন ইটালি নাগরিক, ৭ জন জাপানি নাগরিক, এক জন ভারতের নাগরিক ও তিন জন বাংলাদেশি নির্মমভাবে নিহত হন। এছাড়া অভিযান চালাতে গিয়ে ডিবির সহকারী পুলিশ কমিশনার রবিউল করিম ও বনানী থানার ওসি সালাহ উদ্দিন নিহত হন। কুৎসিত এ ঘটনায় নিহত হন ২৩ জন। পরে প্যারা কমান্ডোদের ‘অপারেশন থান্ডার বোল্ট’ অভিযানে ৫ জঙ্গি নিহত হয়।
এছাড়া, সিলেটের আতিয়া মহলে অভিযান চালাতে গিয়ে নিহত হন র্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লে.কর্নেল আবুল কালাম আজাদ। পরবর্তীতে সারাদেশে জঙ্গি নির্মূলে ২৭টি কম্বিং অপারেশন (চিরুনি অভিযান) চালায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো। অভিযানগুলোতে নিহত হয় ৭৩ জঙ্গি।
পরবর্তীতে ওই হামলায় তামিম ও সরোয়ার জাহান মানিকসহ ২১ জন জঙ্গির নাম উল্লেখ করে গত বছরের ২৩ জুলাই আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) জমা দেয় মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট সংস্থা কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটে (সিটিটিসি)। চার্জশিটে বলা হয়, ছয় মাস আগে থেকে নব্য জেএমবির জঙ্গিরা ওই হামলার পরিকল্পনা করে প্রস্তুতি নেয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, দেশকে অস্থিতিশীল করা।
সিটিটিসি প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম রোববার জঙ্গিদের বর্তমান সক্ষমতা ও অবস্থান বিষয়ে বলেন, জঙ্গিদের মাথা চাড়া দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। এরা বিভিন্ন সময়ে অপতৎপরতা চালানোর চেষ্টা করে। এটাও আমাদের মনিটরিংয়ে (নজরদারিতে) ধরা পড়ে। জঙ্গি হামলার বিষয়ে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকতে হবে। ওদের বড় হামলার কোনো সক্ষমতা নেই। আমাদের কাছে এ ধরণের হামলার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই।
মামলাটির বিচারকার্য চলছে ঢাকার সন্ত্রাস দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো: মজিবুর রহমানের আদালতে। মামলার রাষ্ট্রপক্ষে বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মো: জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানান, অভিযোগ গঠনের পর দুটি তারিখে আসামিরা হাজির হয়নি। এছাড়া বাকি সব কার্য দিবসে সাক্ষ্য গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এভাবে সাক্ষ্যগ্রহণ চললে এ বছরে মামলাটির বিচার শেষ হতে পারে।
সিটিটিসি যে ২১জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে তাদের মধ্যে ১৩ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে নিহত হয়েছে। হোলি আর্টিজানে হামলার পর প্যারা কমান্ডোদের অপারেশন থান্ডারবোল্ট অভিযানে নিহত ৫ জঙ্গি হলো- নিবরাস ইসলাম, মীর মামীহ মোবাশ্বীর, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল ও খায়রুল ইসলাম পায়েল। পরে ২০১৬ সালের ২৬ জুলাই কল্যাণপুরের জাহাজবাড়ী ভবনে অভিযানে নিহত হয় আবু রায়হান তারেক। একই বছর ২৭ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় অভিযানে নিহত হয় মূল হোতা কানাডার বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তামিম আহমেদ চৌধুরী।
এছাড়া, আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর অভিযানে রাজধানীর রূপনগরে মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম, আজিমপুরে তানভীর কাদেরী, সাভারের আশুলিয়ায় সরোয়ার জাহান মানিক, মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধে নূরুল ইসলাম মারজান বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। পরবর্তীতে অভিযান চালানো হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে। এ অভিযানে নিহত হয় বাশারুজ্জামান চকলেট ও ছোট মিজান।
পরে এ মামলায় গ্রেফতারকৃত ৭ জঙ্গি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তারা হলেন- পরিকল্পনাকারী রাজীব গান্ধী, রাকিবুল হাসান রিগান, হাদিসুর রহমান সাগর, অস্ত্র সরবরাহকারী মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান, সংগঠক সোহেল মাহফুজ ও রাশেদুল ইসলাম র্যাশ। এ ঘটনায় শরিফুল ইসলাম ওরফে খালিদ ও মামুনুর রশীদ ওরফে রিপন নামে দুই জঙ্গি এখনও পলাতক। গোয়েন্দাদের ধারণা তারা ভারতে আত্মগোপন করে আছে।
এ মামলায় কানাডার টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাহমিদ হাসিব খান, তার বান্ধবী ফাইরুজ মালিহা, তাহানা তাসমিয়া, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির বিবিএ ফ্যাকাল্টির সাবেক শিক্ষক আবুল হাসনাত রেজাউল করিমের স্ত্রী শারমিনা করিম, ভারতীয় নাগরিক সাত প্রকাশ, জাপানি নাগরিকের গাড়িচালক আব্দুর রাজ্জাক রানা, হোলি আর্টিজানের নিরাপত্তা কর্মী জসিম, হোলি আর্টিজান বেকারীর কর্মচারী শাহরিয়ার, সহকারী কুক আকাশ খান, ওয়েটার লাজারুস সরেন, সুমন রেজা, সবুজ, শিশির, সুহিন ও সমীর বাড়ৈসহ ২১১ জন প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।
বিভীষিকার তিন বছর পূতি উপলক্ষে নিহত ও আহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গুলশান ২ নম্বরের হোলি আর্টিজানের সেই বাড়িটি আজ সোমবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন। অপরদিকে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান হোলি আর্টিজান ট্র্যজেডি দিবস পালন করবে।
এ বিষয়ে গুলশান থানার ওসি (তদন্ত) মাহবুব আলম জানান, জঙ্গি হামলার বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ঘটনাস্থলটি আজ ৩ ঘণ্টার জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে। বাড়ির সামনে একটি বেদি স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে যে কেউ এসে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে পারবেন। এছাড়া, জাপানি দূতাবাস থেকে শ্রদ্ধা জানানো হবে। ইতালির নিহত ৯ নাগরিকের স্মরণে অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ইতালির একটি প্রতিনিধি দল ঘটনাস্থল শ্রদ্ধা জানাবেন। পুলিশের পক্ষ থেকেও নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হবে।
-সেবা হট নিউজ: সত্য প্রকাশে আপোষহীন

খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।