দেশেও উৎপাদন হচ্ছে চিকিৎসা সরঞ্জাম

দেশেও উৎপাদন হচ্ছে চিকিৎসা সরঞ্জাম


সেবা ডেস্ক: উদ্যোক্তারা বলতে গেলে অনেকটা নিজেদের আগ্রহে বৈচিত্র্যময় চিকিৎসা সরঞ্জাম বাংলাদেশেই উৎপাদনে বিনিয়োগে এসেছেন। সামনে অফুরন্ত সম্ভাবনা দেখে বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদনে বাংলাদেশে নতুন কারখানা স্থাপন হচ্ছে। বছরের পর বছর আমদানিনির্ভর এ খাতে এসেছে আমূল পরিবর্তন। নিজেদের চিকিৎসা সরঞ্জাম শিল্পের উঠে আসার গল্প শোনাচ্ছেন মিরাজ শামস

সুচ থেকে শুরু করে স্টেথিস্কোপ কিংবা অপারেশন থিয়েটার, আইসিইউ ও স্বাস্থ্যসেবার পরীক্ষাগারের নানা যন্ত্রপাতি এখন দেশেই তৈরি হচ্ছে। বছরের পর বছর আমদানিনির্ভর এ খাতে এসেছে আমূল পরিবর্তন। এমনটা সম্ভব হয়েছে কিছু উদ্যোক্তার চেষ্টায়। মূলত গত এক দশকে স্বাস্থ্যসেবার এ খাতের অনেক কিছু বদলে গেছে। চিকিৎসা সরঞ্জামের অনেক কিছুই উৎপাদন হচ্ছে দেশীয় কোম্পানিতে।

উদ্যোক্তারা বলতে গেলে নিজেদের আগ্রহে বৈচিত্র্যময় এ খাতে বিনিয়োগে এসেছেন। সামনে অফুরন্ত সম্ভাবনা দেখে বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদনে নতুন নতুন কারখানা স্থাপন হচ্ছে। চাহিদার তুলনায় জোগান কম থাকায় এখন প্রযুক্তিনির্ভর যন্ত্রপাতিও উৎপাদন করছে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। নামিদামি বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে দেশে তৈরি পণ্য বিক্রিও হচ্ছে বেশ। আগামী দিনে বড় পরিসরে রপ্তানির স্বপ্ন নিয়ে কাজ শুরু করেছে বেশকিছু কোম্পানি। এতে বিনিয়োগও বাড়ছে। ইতোমধ্যে কিছু পণ্য ব্রাজিল, ভারত, ইইউ, যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে।

নিজেদের শুরুর কথা জানিয়ে ন্যাশনাল ইলেক্ট্রো কেয়ারের মহাব্যবস্থাপক রকিবুল ইসলাম নিরব জানান, এক যুগ আগে এ খাতে কাজ শুরু করা সহজ ছিল না। সব বাধা পেরিয়ে এখন ২৭ ধরনের পণ্য তৈরি করছেন তারা। এ ছাড়া সার্জিক্যাল ডায়াথারমি ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের রক্তে হিমোগ্লোবিন পরীক্ষার গ্লুকোমিটার সেন্টিফিউজসহ বিভিন্ন যন্ত্র তৈরি করছেন। এসব পণ্য চীন ও ভারতের চেয়ে মানে অনেক ভালো বলে সহজে বাজারও ধরতে পেরেছেন তারা। দেশে তৈরি বলে দামও আমদানির চেয়ে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম। তিনি বলেন, এ খাতে পণ্য তৈরির খরচ অনেক বেশি। তাছাড়া দেশের হালকা প্রকৌশল খাত পিছিয়ে থাকায় যন্ত্রাংশ উৎপাদনের সহযোগী প্রতিষ্ঠানও তেমন নেই। এ শিল্পের সঙ্গে পশ্চাৎ সংযোগ শিল্পের সহযোগিতা জরুরি। এ ক্ষেত্রে সরকারের সহযোগিতা পেলে এগিয়ে যাওয়া সহজ হবে। তিনি সম্ভাবনাময় এ খাতের জন্য সহায়ক নীতিমালা তৈরির আহ্বান জানান।

বলতে গেলে বছরজুড়ে চাঙ্গা থাকে স্বাস্থ্যসেবায় ব্যবহূত ছোটখাটো থেকে শুরু করে নানা ধরনের সরঞ্জামের বাজার। যুগের পর যুগ মূলত আমদানি করেই মেটানো হচ্ছে এ চাহিদা। এতে ক্রেতাদের দামও গুনতে হচ্ছে বেশি। নিডল, সিরিঞ্জের মতো কিছু সরঞ্জাম তৈরির মাধ্যমে আস্তে আস্তে পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে এ খাতে। ক্রেতাদের আস্থাও এগিয়ে দিয়েছে উদ্যোক্তাদের। বর্তমানে ১০ প্রতিষ্ঠান চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদন করছে। এখনও তারা স্থানীয় চাহিদার সবটুকু মেটাতে পারছে না।

রাজধানীর চিকিৎসা সরঞ্জামের পাইকারি বড় দুটি মার্কেটের ব্যবসায়ীরা জানান, সারা বছর বিভিন্ন ক্যাটাগরির যতটুকু যন্ত্রপাতি বা সরঞ্জামের প্রয়োজন হয়, সেগুলোর সবটুকু পূরণ করতে পারে না স্থানীয় কোম্পানিগুলো। এ কারণে এখনও অনেক কিছু আমদানি করতে হয়। অভ্যন্তরীণ বাজারের ১০ শতাংশের চাহিদাও মেটাতে পারছে না তারা। অথচ দেশি কোম্পানির পণ্যে আগ্রহ রয়েছে ক্রেতাদের।

দেশে তৈরি হচ্ছে যা :দেশে প্রমিক্সো হেলথ কেয়ার, জেএমআই, সেলট্রন ইলেক্ট্রো মেডিক্যাল সার্ভিসেস, ন্যাশনাল ইলেক্ট্রো ও গেটওয়েলের কারখানায় বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম তৈরি হচ্ছে। করোনার কারণে এখন মাস্ক, গ্লাভস ও পিপিইর উৎপাদন বেড়েছে। অবশ্য আগে থেকেই স্বাস্থ্যসেবা খাতের নিত্যপ্রয়োজনীয় এই তিন পণ্য তৈরি হতো। অন্যান্য অতি প্রয়োজনীয় কিন্তু ছোট সরঞ্জামের মধ্যে সিরিঞ্জ, নিডল, ক্যানোলা দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন হচ্ছে। এর বাইরে অপারেশন থিয়েটারের (ওটি) টেবিল, ওটি লাইট, করোনারি কেয়ার ইউনিটের (সিসিইউ) বেড, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) বেড ও অন্যান্য সরঞ্জাম, ইসিজি মেশিন, প্রসূতি টেবিল, ডেন্টাল চেয়ার, রোগী মনিটর ও রোগী পরীক্ষার টেবিল, নেবুলাইজার, এয়ার পাম্প ম্যাট্রেস, ওজন মাপার স্কেল, অটোক্লেভ, সাকশন মেশিন, বেবি ইনকিউবেটর, ফটোথেরাপি মেশিন ও ফিজিওথেরাপির যন্ত্রপাতি তৈরি হচ্ছে।

যেসব সরঞ্জামের চাহিদা বেশি :চিকিৎসায় প্রতিদিন অসংখ্য সরঞ্জাম ও যন্ত্রের ব্যবহার করতে হয়। ক্যাটাগরি অনুযায়ী বলতে গেলে, মেডিকেল ইকুইপমেন্ট বা ডিভাইস, ডিসপোজেবল সিরিঞ্জ ও অন্যান্য সরঞ্জাম, ইলেক্ট্রো-মেডিকেল ইকুইপমেন্ট ও টেকনোলজি, ল্যাবরেটরি ইকুইপমেন্ট, সার্জিক্যাল ইকুইপমেন্ট ও এক্সেসরিস, ডেন্টাল ও ডায়াগনস্টিক ইকুইপমেন্ট এবং অ্যাকসিডেন্ট ও ইমার্জেন্সি ইকুইপমেন্ট প্রতিদিন বেশি কাজে লাগে। আমদানি করা এসব যন্ত্রের বাজারে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশি কোম্পানিগুলো জায়গা করে নিচ্ছে। এখনও সেভাবে ব্র্যান্ড হিসেবে খুব বেশি পরিচিতি না পেলেও প্রতিষ্ঠানগুলো বেশ ভালো করছে বলে জানান পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ের বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা।

অন্যদিকে, দৈনিক ব্যান্ডেজের কাপড়ের দরকার হয় অনেক বেশি। দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য পোশাক হলেও এখনও বিভিন্ন ধরনের ব্যান্ডেজের কাপড় আমদানি করতে হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে- এলডি এক্সক্লুসিভ বেল্ট (অপারেশনের পর কাটা জায়গায় ব্যবহারের জন্য), এলডি ও আরডি প্যাড, এলডি কটন (অপারেশন কিংবা কাটা বা ক্ষতস্থান ড্রেসিংয়ে ব্যবহারের জন্য) এবং এলডি ব্যান্ডেজ বা পাতলা মসৃণ কাপড় (ব্যান্ডেজের কাজে ব্যবহারের জন্য)। এসব ক্ষেত্রে বিনিয়োগের সুযোগ ও সম্ভাবনা অনেক বেশি বলে জানিয়েছেন খাত-সংশ্নিষ্টরা।

মান তদারকিতে নেই জোরদার ব্যবস্থা : আমদানি করা নিম্নমানের অনেক চিকিৎসা সরঞ্জাম দেশে আসছে বলে জানান বিক্রেতারা। অনেকে কিনে নিয়ে যাওয়ার পর আবার ফেরত নিয়ে আসেন। বেশিরভাগ পণ্যে ওয়ারেন্টি ও গ্যারান্টি না থাকায় ফেরত দেওয়ার সুযোগ নেই। এতে বিপাকে পড়েন খুচরা বিক্রেতারা। আমদানি করা যন্ত্রপাতির মান পরীক্ষা ও তদারকিতে জোরালো পদক্ষেপ থাকলে এসব ভোগান্তি তৈরি হতো না। আবার দেশি কিছু প্রতিষ্ঠান বেনামে অনুমোদনবিহীন চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদন ও বাজারজাত করছে। এসব পণ্য ব্যবহার করে নানা ধরনের জটিলতায় ভুগছেন রোগীরা।

বিনিয়োগ সম্ভাবনা :দেশে এ খাতে বর্তমানে বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। এ বিনিয়োগে দেশের বাজারের মাত্র ১০ শতাংশ ধরা সম্ভব হয়েছে। এ খাতে আগামী দিনে আরও বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা। জাতীয় শিল্পনীতি ও রপ্তানি নীতিমালায় চিকিৎসা সরঞ্জামকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। চিকিৎসা খাতকে বিশাল সম্ভাবনাময় বিনিয়োগের খাত হিসেবে দেখছে বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষও (বিডা)। বিডার সম্প্রতি প্রকাশিত বিনিয়োগ হ্যান্ডবুকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের চিকিৎসা সরঞ্জাম খাত গত তিন বছরে অনেক দ্রুত প্রসারিত হয়েছে। গড়ে এ সময়ে বছরে ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হয়েছে, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। ২০২২ সাল পর্যন্ত প্রবৃদ্ধির এ ধারা অব্যাহত থাকবে বলে আশা করছে সংস্থাটি। গত তিন বছরে অবশ্য চিকিৎসা সরঞ্জামের আমদানিও বেড়েছে। ২০১৮-১৯ সালে ৪০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি হয়। অন্যদিকে, রপ্তানি হয় আড়াই কোটি ডলারের।

কাজে লাগানো হয়নি স্থানীয় বাজার :দেশে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জামের বাজার রয়েছে বলে জানান উদ্যোক্তারা। সরকারিভাবেই প্রায় আট থেকে ১০ হাজার কোটি টাকার সরঞ্জাম কেনা হয়। এত বড় বাজারের সুবিধা এখনও কাজে লাগাতে পারেননি উদ্যোক্তারা। বিদেশি বিনিয়োগও কম। চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদন করছে অল্প কয়েকটি কোম্পানি। ফি টেক সলিউশনের তথ্য তুলে ধরে বিডা জানায়, দেশের চিকিৎসা সরঞ্জামের মার্কেট দ্রুত বাড়ছে। ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিশ্বে এ খাতে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি হবে। এ সুযোগ নিতে পারেন দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তারা।

-সেবা হট নিউজ: সত্য প্রকাশে আপোষহীন

0 comments

মন্তব্য করুন

খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।

Dara Computer Laptops