বাংলাদেশী বিজ্ঞানী’র উদ্ভাবন: পাঁচবার ধান দিবে এক গাছ!

বাংলাদেশী বিজ্ঞানী’র উদ্ভাবন পাঁচবার ধান দিবে এক গাছ!



সেবা ডেস্ক: কানিহাটি গ্রাম, মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলা’র হাজীপুর ইউনিয়নে অবস্থিত। কৃষি-নির্ভর এ গ্রামের দিগন্ত’জোড়া মাঠে এখন ধান’ক্ষেত। শিশির ভেজা বাতাসে দুলছে সোনালি ফসল। 

এই গ্রামেরই দুই বিঘা জমি ঘিরে টান টান উত্তেজনা। কারণ এই জমির ধান সাধারণ নয়, এই ধান ভিন্ন প্রকৃতির। বিস্ময়’জাগানো পাকা এ ফসল কাটা হবে আর কয়েক’দিন পর। তখন নিভৃত কানিহাটি গ্রাম থেকে সৃষ্টি হবে নতুন এক ইতিহাস। একবার রোপণে এ ধানের গাছে বছরজুড়ে পাঁচবার ফলন এসেছে।

ধানের এ নতুন জাত উদ্ভাবন করেছেন অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী ধান গবেষ’ক ও জিন’বিজ্ঞানী আবেদ চৌধুরী। তিনি জানান, বোরো হিসেবে বছরের প্রথমে লাগানো এ ধান ১১০ দিন পর পেকে’ছে। ওই গাছেই পর্যায়ক্রমে ৪৫ দিন পরপর একবার বোরো, দু'বার আউশ এবং দু'বার আমন ধান পেকেছে।

এক গাছে পাঁচ ফলনের এমন ঘটনা পৃথিবী’তে বিরল বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানী’রা। তবে আবেদ চৌধুরী আছেন তার উদ্ভাবন আরও এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টায়। তিনি ওই গাছেই ছয়’বার ফসল তোলার গবেষণা চালিয়ে যাবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। পাশাপাশি নতুন জাতের ধানটি সারাদেশে’ই চাষাবাদ সম্ভব কিনা তা যাচাই করবেন। এজন্য বিভিন্ন জেলায় এ ধানের পরীক্ষামূলক চাষ করবেন।

আবেদ চৌধুরীর ভাষ্য, কম সময়ে পাকা এই ধানের উৎপাদন বেশি, খরচও কম। তবে প্রথম ফলনে’র চেয়ে পরের ফলন’গুলোতে উৎপাদন কিছুটা কম। কিন্তু পাঁচবারের ফলন মিলিয়ে উৎপাদন প্রায় পাঁচ গুণ বেশি।

কুলাউড়ার কানিহাটি গ্রামের সন্তান আবেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে কৃষি বিষয়ে উচ্চশিক্ষা শেষে চাকরি নিয়ে চলে যান অস্ট্রেলিয়া’য়। সেখান’কার জাতীয় গবেষণা সংস্থার প্রধান ধানবিজ্ঞানী হিসেবে ধানের জিন নিয়ে গবেষণা করে কাটিয়ে দিয়েছেন ২০ বছর। এ পর্যন্ত তিনি প্রায় ৩০০ রকমের নতুন ধান উদ্ভাবন করেছেন। পেশাগত কারণে বিদেশে’র মাটিতে গবেষণা করলেও দেশে তার গ্রাম কানিহাটিতে গড়ে তুলেছেন খামার।

আবেদ চৌধুরী বলেন, 'আম-কাঁঠালে’র মতো বছরের পর বছর টিকে থাকার সৌ’ভাগ্য ধান গাছের হয় না- এটা কোনো’ভাবেই মানতে পারছিলাম না। তাই নেমে পড়ি গবেষণায়।'

ধান গাছের দ্বিতীয় জন্ম নিয়ে ১৪ বছর ধরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান আবেদ চৌধুরী। ২০১০ সালে’র ডিসেম্বর মাসে কানি’হাটি গ্রামে ২৫ বর্গমিটারে’র একটি ক্ষেতে ২০টি ধানের জাত নিয়ে গবেষণা শুরু করেন তিনি। এর মধ্যে চীন, ফিলিপাইন’সহ বিভিন্ন দেশের ও স্থানীয় ধানের জাত ছিল। যে জাত’গুলোর ধান পাকার পর কেটে নিয়ে গেলে আবার ধানের শীষ বের হয়, সেগুলো তিনি আলাদা করেন। এভাবে ১২টি জাত বের করেন। তিন বছর ধরে জাত’গুলো চাষ করে দেখলেন, নিয়মিতভাবে এগুলো দ্বিতীয়’বার ফলন দিচ্ছে। তারপর তিনি শুরু করেন একই গাছে তৃতীয়বার ফলনের গবেষণা। তাতেও সফল হলেন। কিন্তু এর মধ্যে চারটি জাত ছাড়া বাকিগুলো চতুর্থবা’র ফলন দিয়ে ধ্বংস হয়ে যায়।

আবেদ চৌধুরী জানান, চারটি জাত একই গাছ থেকে পাঁচ’বার ফলন দিচ্ছে। এই চারটি জাতের ওপর ১০ বছর ধরে চলছে গবেষণা। চলতি বছরের জানুয়ারি’তে বোরো ধানের এই চারটি জাত দুই বিঘা জমিতে রোপণ করা হয়। পরিমাণমতো ইউরিয়া সার প্রয়োগ করা হয়। সঠিক’ভাবে সেচ ও পরিচর্যা করার পর ১১০ দিনের মধ্যে ৮৫ সেন্টিমিটার থেকে এক মিটার উচ্চতার গাছে ফসল আসে। পরে মাটি থেকে ৩৫ সেন্টি’মিটার উচ্চতায় পরিকল্পিত’ভাবে ওই ধান কেটে ফেলা হয়।

মে মাসে প্রথম দিকে প্রথম’বার কাটা ধানে হেক্টরপ্রতি উৎপাদন হয়েছে চার টন। তারপর থেকে ৪৫ দিন অন্তর প্রতিটি মৌসুমে হেক্টর’প্রতি কখনও দুই টন, কখনও তিন টন ফলন এসেছে। সবগুলো জাত হেক্টরপ্রতি প্রায় ১৬ টন ফলন দিয়েছে।

বিজ্ঞানী আবেদ চৌধুরী বলেন, দুটি পদ্ধতি’র মাধ্যমে জাতগুলো করা হয়েছে। স্থানীয় জাতের সঙ্গে বিভিন্ন উচ্চ ফলন’শীল জাত এবং স্থানীয় জাতে’র সঙ্গে স্থানীয় হাইব্রিড জাতের সংকরায়ন ঘটানো হয়েছে। ১০-১২ বছর আগে এগুলো থেকে দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয়’বার ফলন দেওয়ার জন্য উপযোগী করে চিহ্নিত করা হয়।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশে হেক্টরপ্রতি ধান উৎপাদ’ন হয়ে থাকে তিন থেকে চার টন। গতকাল শুক্রবার আবেদ চৌধুরী বলেন, 'এটি একটি ঐতিহাসি’ক ঘটনা। শুধু বাংলাদেশে’র জন্য নয়, সারা পৃথিবী’র জন্য ঐতিহাসিক। আমার নিজ গ্রাম কানিহাটির কৃষকদের সমন্বয়ে আমি এটি করতে পেরেছি। সারা বছর যেহেতু ধান দিচ্ছে, সেহেতু বর্ষজীবী বলা যেতে পারে। কারণ একটি ঋতুর পরই সাধারণত ধানের জীবনে’র অবসান ঘটে। কিন্তু আমার উদ্ভাবিত ধান বোরা, আউশ ও আমন তিন মৌসুম বা পুরো বছর ধরে ফসল দিয়েছে।'

তিনি বলেন, সাধারণ’ত ধান একবার লাগানো হয় এবং ১২০ দিন পর কাটা হয়। এভাবে আমাদে’র বোরো, আউশ ও আমন ধান আছে। আমার উদ্ভাবিত ধান’গুলো লাগানো হয়েছে বছরের প্রথমে বোরো হিসেবে। তারপর একটি বোরো, দুটি আউশ এবং দুটি আমন দিয়ে’ছে। যতবার ফসল কেটে ঘরে নেওয়া হয়েছে, ততবার’ই গাছটি আরও বেশি বড় হয়ে উঠেছে। এটি একটি যুগান্ত’কারী ফলাফল। এবার আর কয়েকদিন পর পঞ্চম’বারের মতো ধান কেটে গাছগুলো রেখে দেওয়া হবে। এই গাছ থেকে আরও ফলন আনতে গবেষণা চলবে।

নতুন ধানের নাম’করণ বিষয়ে আবেদ চৌধুরী বলেন, একই গাছের শরীর থেকে পাঁচ’বার ধান বেরিয়ে আসে। ফলে এই ধানের তিনি নাম দিতে চান 'পঞ্চব্রীহি'। নাম’করণের ব্যাখ্যা তুলে ধরে তিনি বলেন, ধানকে ব্রীহি বলা হয়। এটা যেহেতু পাঁচ’বার ফলন দিয়েছে, সেহেতু 'পঞ্চব্রীহি' নাম দিতে চাই। পরবর্তী ষষ্ঠবার ফল দিলে ষষ্ঠব্রীহি নামে নাম’করণ করা যেতে পারে। তবে এই ধানের নাম এখনও তিনি চূড়ান্ত করেননি।

তিনি বলেন, বছরের যে কোনো সময়ে এ ধান রোপণ করা যায়। এখন পরের ধাপ’গুলোতে কিছুটা কম উৎপাদন হচ্ছে। আমার চেষ্টা থাকবে, আরও বেশি ফলন বের করার।

পঞ্চমবার ফলন দেওয়া ধান উদ্ভাবন সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরে আবেদ চৌধুরী বলেন, এর আগে আমি অন্য ধানের জাত উদ্ভাবন করেছি। দু'বার ফসল হয়, এমন ধানও উদ্ভাবন করে’ছিলাম; যাকে আন্তর্জাতি’ক মিডিয়া 'রাইস টুআইস' বলেছে। আবার অনেকে 'জীবন বর্ধিত ধান' বলেছে। এই প্রথম সারা বছর ধরে আমার অন্য আরেক’টি ধানের জাত মাঠে থাকল। এ ধানের চারা ৫ সেন্টি’মিটার দূরত্বে রোপণ করতে হয়। ফলে গাছটি মাটি থেকে ভালো’ভাবে শক্তি নিয়ে বেড়ে উঠতে পারে এবং একটি ধান গাছ থেকে আরও বেশ কয়েকটি ধান গাছ গজাতে থাকে।

এই ধান পরিবেশ’বান্ধব উল্লেখ তিনি বলেন, কোনো একটি জমি যতবার চাষ দেওয়া হবে, তত’বার মিথেন গ্যাস ও কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হবে। একবার চাষ দিয়ে দু'বার ফসল উৎপাদন করলে উৎপাদন খরচ কমে যাওয়া’র পাশাপাশি তা কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমিয়ে এনে জল’বায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখবে।

ধানের এই জাতগুলোকে দেশের কৃষক’দের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বিষয়ে আবেদ চৌধুরী জানান, এ ধানের বীজ সংগ্রহ সহজ। কৃষক’রা নিজেরাই তা করতে পারবেন। অন্য ধানের মতো বীজ’তলায় রোপণের পর চারা তুলে চাষ করতে হয়।

তিনি বলেন, 'আপাতত আমি নিজের খরচে কানিহাটি’তে পরীক্ষা’মূলক চাষ করব। তারপর সারা’দেশে চাষ করে দেখব। সারা’দেশের ফলাফল বিশ্নেষণ করে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ধানের বীজ কৃষক’দের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়ে ভাবব।'

আবেদ চৌধুরী অস্ট্রেলিয়া’য় থাকলেও সবকিছু দেখার জন্য রাসেল মিয়া নামে এক’জনকে দায়িত্ব দিয়ে যান। রাসেল মিয়া বলেন, এ ধানে চিটা নেই। খরচ কম এবং ফলন বেশি। জমিতে রেড়ি করে বোরো রোপণের পর আর জমি রেড়ি করতে হয় না। নির্দিষ্ট একটা মাপে ধান কেটে নেওয়া’র পর মোড়া অংশে লতাপাতা ও ঘাস বাছাই করে সার দিই। এটুকু করলেই আবার ধানের গাছ বাড়’তে থাকে।

রাসেল জানান, যদি পোকা’মাকড়ে ধরে তাহলে সামান্য কীট’নাশক ব্যবহার করতে হয়। এই ধান মেঘবৃষ্টি নষ্ট করতে পারে না। খুব শক্ত ধানের গাছ। এলাকা’র কৃষকরা এ ধানের ফলন দেখে চাষাবাদ করতে আগ্রহী হয়েছেন।

কুলাউড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুল মোমিন বলেন, এক গাছে পাঁচ’বার ধান উৎপাদন নতুন দেখেছি। এটি দেশের জন্য সুখবর। এই উদ্ভাবনে’র রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়া উচিত।

বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে’র (বিনা) নবনিযুক্ত মহা’পরিচালক, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানী ও বিশিষ্ট কৃষিবিদ ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম বলেন, পুনর্জন্ম পদ্ধতি’তে একটি ধান গাছে চারবার ফলন আসা সম্ভব। তবে পাঁচবার ফলন বের করা একটু কঠিন।

ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলামের ভাষ্য, প্রথম’বার ফলন আসার পর পরের বার ফলন কমতে থাকে। এ জন্য এটি এতটা লাভ’জনক নয়। ততদিনে এই ধান কেটে আরেক’টি ফসল লাগালে লাভজনক হবে। এক গাছে সর্বোচ্চ দু'বার ফলন হলে ভালো। এ পদ্ধতি’তে এখন ফল বাড়াতে আরও গবেষণা করা যেতে পারে।

তিনি বলেন, এটি জীন’বিজ্ঞানীর কাজ নয়। ফলন বাড়ানোর বিষয়ে কৃষিতত্ত্ব’বিদ ও মৃত্তিকা বিজ্ঞানী’রা গবেষণা করতে পারেন। মাটি, গাছ, প্রজনন, বায়োকেমেস্ট্রি ও জিন’সহ সব ব্যবস্থাপনা দেখতে হবে। আবেদ চৌধুরী শুধু জিনের অবস্থা দেখছেন। লাভক্ষতি হিসাব করতে হবে। শুধু উদ্ভাবন করলে হবে না, ফলন আশা’ব্যঞ্জক না হলে কৃষক তা নেবেন না।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে’র (ব্রি) মহাপরিচালক কৃষিবিজ্ঞানী ড. মো. শাহজাহান কবীর বলেন, একটি ধানের গাছ থেকে একাধিক’বার ফসল সম্ভব, কিন্তু ফলন কম হবে। এটি টেকসই কোনো উদ্ভাবন নয়। যেখানে আমরা জমিতে আরও বেশি উৎপাদনের চেষ্টা করছি, সেখানে তিনি খরচ বাঁচানোর জন্য উৎপাদন কমনোর প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে তো লাভ নেই। এসব বিষয় নিয়ে আবেদ চৌধুরীর সঙ্গে আমরা একাধিক’বার কথা বলেছি। তাকে আমরা দাওয়াত দিয়েছি, কিন্তু তিনি আসেন না। আমরা তো বিজ্ঞান নিয়েই ৫০ বছর ধরে চর্চা করছি। ধানের ফলন বাড়ানোসহ নানা বিষয় নিয়ে কাজ করছি।

ড. আবেদ চৌধুরী বংশগতি’বিষয়ক গবেষক। একদল অস্ট্রেলীয় বিজ্ঞানী’র সঙ্গে তিনি ফিস (ইন্ডিপেনডেন্ট সিড) জিন আবিস্কার করেন। তিনি লাল রঙের চাল ও রঙিন ভুট্টাও উদ্ভাবন করেছেন। তার ডায়াবেটিস ও ক্যান্সার প্রতিরোধক রঙিন ভুট্টা বিশ্বব্যাপী আলোচিত। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চ ফলন’শীল ধান উৎপাদন ও ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ে গবেষণা করছেন। 


শেয়ার করুন

-সেবা হট নিউজ: সত্য প্রকাশে আপোষহীন

,

0comments

মন্তব্য করুন

খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।