শতভাগ বিদ্যুতায়নের চূড়ান্ত পথে হাঁটছে বাংলাদেশ

শতভাগ বিদ্যুতায়নের চূড়ান্ত পথে হাঁটছে বাংলাদেশ

সেবা ডেস্ক: বিগত বিএনপি ও  জামায়াত জোট সরকারের সময়ে বিদ্যুতের কথা বলা হলেই বাংলাদেশের মানুষের মনে পড়ে প্রতি ঘন্টায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কথা। বাংলাদেশে বছরের প্রতিটি দিনই থাকত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সমস্যা। দুর্বিষহ হয়ে পড়তো জন সাধারণের জীবন। একটি দেশের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সম্পদ হিসেবে বিদ্যুৎ এবং গ্যাসকে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। এই দুটি রাষ্ট্রীয় উপাদান যখন জনগণের সেবা প্রদান করতে বিঘ্নিত হয় তখন হুমকির মুখে পড়তে হয় দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে।

দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের এই ঘটনা এখন সুদূর অতীত। গুটি গুটি পায়ে দেশে এখন বৃদ্ধি পেয়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদন। গড়ে তোলা হচ্ছে নিত্য নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র। বিদ্যুতের এই সক্ষমতার ফলে শিল্প – কারখানায় ত্বরান্বিত হয়েছে উৎপাদন। এর ফলে বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত হয়েছে গ্রাম গঞ্জের প্রতিটি কোণ। বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠছে এক-একটি জনপদ। গ্রামে গ্রামে ঘুরছে শিল্পায়নের চাকা। চিকিৎসা সেবাও এ জন্য অনেকটা হাতের নাগালে চলে এসেছে। গ্রামের বাজারগুলোতে বেড়েছে বেচাকেনা। শিক্ষার্থীরা রাতে ভালোভাবে পড়ালেখার সুযোগ পাচ্ছে।

বর্তমানে দেশের মোট ৯২.৫০ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধাভোগ করতে পারছে। বিদ্যুৎ বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার পরিসংখ্যানের মাধ্যমে জানা যায় ২০২১ সালের ভিতর দেশের মোট বিদ্যুৎ সুবিধাভোগীর সংখ্যা শতভাগ হবে। কারণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন। ২০০৯ সালে দেশে উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ২৬৮ মেগাওয়াট। ২০১৮ সালের ১৯ মার্চ সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় ১০ হাজার ৮৪ মেগাওয়াট। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই ধারা অব্যাহত থাকলে শতভাগ বিদ্যুতের এই বষয়টি আর স্বপ্ন থাকবে না।

দেশে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগেই শতভাগ বিদ্যুৎ সংযোগের কথা থাকলেও কিছু কারিগরি কারণে তা কিছুটা সময় লাগবে। এজন্য ২০২১ সালের ভিতর আলোকিত হবে গোটা বাংলাদেশ। দেশের চরাঞ্চল ও পার্বত্য অঞ্চলগুলোতে বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপন কিছুটা সময় সাপেক্ষ। এজন্য বিকল্প পদ্ধতিতে এখানে বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপন করা হবে। এই প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৭০০ কোটি টাকা। পার্বত্য অঞ্চলগুলোতে সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা হবে। সন্দীপে সাবমেরিন দিয়ে ৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এ ছাড়া অফ গ্রিড এলাকা হাতিয়ায় বিদ্যুতের জন্য জেনারেটরের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

মনপুরায় ‘সূর্যগ্রাম’ নামক প্রকল্প দিয়ে সূর্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প নেওয়া হবে। বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের ৪৬০টি উপজেলার মধ্যে এখন পর্যন্ত ২৩৯টি উপজেলায় শতভাগ বিদ্যুৎ পৌঁছেছে। চলতি বছর এবং আগামী বছর অবশিষ্ট উপজেলায় শতভাগ বিদ্যুৎ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। বর্তমানে পল্লী বিদ্যুতের সমিতিগুলো প্রতি মাসে তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ দিচ্ছে। আগে বিদ্যুতের মিটার পাওয়া কষ্টকর হলেও শতভাগ বিদ্যুতায়ন কর্মসূচির পর এখন সংযোগ প্রদান দ্রুত ও সহজতর হয়েছে। সরকারের বিদ্যুৎ বিভাগ, পাওয়ার সেল, বিভিন্ন কোম্পানি ও সংস্থার কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ৪৬০টি উপজেলার ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি এলাকায় ৩ লাখ ৯০ কিলোমিটার বৈদ্যুতিক লাইন, ১০.০৭৫ এমভিএ ক্ষমতাসম্পন্ন ৮৬৭টি বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্র নির্মাণের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছে বিদ্যুৎ সুবিধা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

২০১৭-১৮ বছরে বিদ্যুৎ সুবিধাপ্রাপ্ত গোষ্ঠী ৮০ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৯০ শতাংশ। আর এই সুবিধা পৌঁছে দিতে ২৭ হাজার কিলোমিটর নতুন বিতরণ লাইন নির্মাণ করা হয়েছে। ২০২১ সালের মধ্যে ২৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে সবার জন্য বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে দেশের বিদ্যুৎ বিভাগ। এটি বাস্তবায়নে ৬ হাজার কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন এবং ১ লাখ কিলোমিটার বিতরণ লাইন ও প্রয়োজনীয় উপকেন্দ্র নির্মাণ ও এর ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে। ছয় হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ ও দুই হাজার ক্ষমতার পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আর অত্যন্ত দুর্গম, চর ও দ্বীপাঞ্চলের বিদ্যুবিহীন এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সোলার প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে প্রত্যন্ত এলাকায় ৪৫ লাখ মানুষ সৌর বিদ্যুতের সুবিধা পাচ্ছেন। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ২৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত মোট ৩৪টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু করা হবে।

একসময় দেশে প্রচলিত ছিল উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর বিদ্যুতে স্বয়ংসম্পূর্ণতার গল্প। বর্তমানে বাংলাদেশও সেই বিদ্যুতে স্বয়ংসম্পূর্ণ গল্পের একটি অংশীদার। শত বাধা বিপত্তি পেরিয়ে, অসম্ভবকে সম্ভব করে দেশ আজ এগোচ্ছে শতভাগ বিদ্যুতায়নের দিকে।
⇘সংবাদদাতা: সেবা ডেস্ক

,

0 comments

Comments Please

themeforestthemeforest

ছবি কথা বলে