
সিরাজগঞ্জ পৌরসভার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
ঈশা খাঁর আমলে বা তারও আগে যমুনা নদীর একপাড়ে ছিল মধুপর ও ভাওয়াল গড় আরেক পাড়ে ছিল সোহাগপুর ঘাট। তখন সিরাজগঞ্জ নামটা কেউ জানতো না। তবে সিরাজগঞ্জ অঞ্চলটি সুবাদার ইসলাম খানের সময়ে বড় বাজু পরগণার অধীনে ছিল এবং বড় বাজু পরগণার সদর দফতর অবস্থিত ছিল বেলকুচিতে। সদর দফতর স্হাপনে আফজাল মাহমুদ বিশেষ ভূমিকা পালন করলেও তার সম্পর্কে এর চেয়ে বেশি কিছু জানা যায়নি।১৭৭৮ সালে মেজর রেনেলের ম্যাপে বেলকুচিকে একটি গ্রাম হিসেবে দেখানো হয়েছে যেখানে সিরাজগঞ্জের কোন নাম নেই। ঐ সময় যমুনা নদী ৪/৫ ক্রোশ পূর্বদিক দিয়ে প্রবাহিত ছিল। ১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দে লর্ড কর্ণওয়ালিশের কাছ থেকে বড় বাজু পরগণার সাত আনা হিস্যা ক্রয় করে সিরাজ আলী চৌধুরী সিরাজগঞ্জ নামকরণের মাধ্যমে সিরাজগঞ্জ জমিদারীর পত্তনি গ্রহণ করেন। জমিদারী পত্তন লাভের পর থেকেই জনগণ অত্র এলাকাকে সিরাজগঞ্জ ডাকতে শুরু করলে নামটি ক্রমশ সবার কাছে প্রিয় হয়ে উঠে। অধিকাংশদের মতে জমিদার সিরাজীর নামকরণের মাধ্যমেই সিরাজগঞ্জ শহরের নামকরণ হয়েছে।
জমিদার সিরাজ আলী চৌধুরী তার কাছারি স্হাপন করেন সোহাগপুরে যে অঞ্চলটি মোমেনশাহী জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়। তিনি বাণিজ্যের প্রসার ও উন্নতিকল্পে সোহাগপুর বেলকুচির কাছাকাছি সিরাজগঞ্জ বন্দর স্হাপন করেন। এ কাজে তিনি অল্প খাজনায় জমি প্রদান করে, নানাবিধ সুবিধাদি প্রদানের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থান হতে বহু মাড়োয়ারি মহাজনকে এখানে নিয়ে এসে ব্যাবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটান। ক্রমে সিরাজগঞ্জের পরিচিতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাবসা-বাণিজ্যে সিরাজগঞ্জের গুরুত্ব বিবেচনা করে বৃটিশ সরকার ১৭৯২ খ্রিস্টাব্দে সিরাজগঞ্জে থানা প্রতিষ্ঠা করে।
থানা গঠনের পূর্বেই যমুনা নদীর ভাঙ্গনে সোহাগপুরের কাছারিসহ জমিদারীর সমস্ত চিহ্ন মুছে যায়। নদীর ভাঙ্গনে সিরাজগঞ্জ বিলীন হতে শুরু করলে ক্রমে তা উত্তর দিকে সরে এসে ১৮০৯ সালের দিকে খয়রাতি মহলরুপে জমিদারী সেরস্তায় লিখিত ভূতের দিয়ার নামে মৌজা নিলামে ক্রয় খরিদ করন জমিদার সিরাজী সাহেব। এই ভূতের দিয়ার নামক স্থানকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে সিরাজগঞ্জ বন্দর।
উক্ত বন্দর গড়ে ওঠার পেছনে পাবনা জেলার ইতিহাস গ্রন্থে বিবরণ পাওয়া যায় :
" তখন জিনাই নামক একটি ক্ষুদ্র স্রোতস্বিণী বেলকুচির নিকট দিয়ে প্রবাহিত হইত। কালক্রমে যমুনা নদী ধীরে ধীরে পাবনা জেলার দিকে অগ্রসর হইয়াছে। এই নদীর বিবরণে জানিতে পারা যায় ইহা ১৮০৯ হইতে ১৮৩০ অব্দ মধ্যে ভীষণ আকাশ ধারণ করিয়াছে এবং ক্রমে তা পাবনা জেলার দিকে আসিয়াছে। সুতরাং ১৮০৯ খ্রিস্টাব্দের পর হইতে সিরাজগঞ্জ বন্দর প্রতিষ্ঠার সময় ধরা যাইতে পারে। "প্রথম বন্দর বর্তমান বন্দর হতে ৩/৪ ক্রোশ দক্ষিণে অবস্থিত ছিল। ২ দুটো বন্দর ভেঙে তৃতীয় বন্দর ভুতের দিয়ার নামক স্থানে স্হাপিত হয়েছে।
তৃতীয় বন্দর কে কেন্দ্র করে সিরাজগঞ্জের সুনাম চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য সিরাজগঞ্জ বন্দর বিখ্যাত বন্দর গুলোর তালিকায় জায়গা করে নেয়। পরবর্তী সময়ে সিরাজগঞ্জের গুরুত্ব, যাতায়াতের সুবিধা বিবেচনা করে বৃটিশ শাসকরা ১৮৪৫ সালে সিরাজগঞ্জকে পৃথক মহকুমা ঘোষণা করে। সমসাময়িক সময়ে সিরাজগঞ্জ ২ ভাগে বিভক্ত ছিল। সিরাজগঞ্জ টাউন বা টানবন্দর এবং সেখান থেকে ৫ মাইল দূরে যমুনার তীরে অবস্থিত ছিল কোল বন্দর। টাউন বা টান বন্দর এবং কোল বন্দর দুটো বন্দরই ব্যবসা বাণিজ্যে সরগরম ছিল। কোল বন্দর হতে ৫ মাইল দূরে অবস্থিত টানবন্দর বা বর্তমান টাউনের পরিমাণ ছিল প্রায় ১১ বর্গমাইল। উক্ত আয়তনের এই শহরকে কেন্দ্র করেই সরকারের স্থানীয় প্রশাসন ব্যাবস্হার বির্বতন অব্যাহত থাকে।
১৮৪২ সালে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের ক্ষেত্রে বৃটিশ সরকার আইন পাশ করে বাংলা প্রদেশের জন্য পৌরসভা প্রতিষ্ঠার ব্যবস্হা করা হয়। ১৮৫০ সালে পৌরসভা আইন পাশ হয় এবং ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ বড় বড় শহরে পৌরসভা প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৮৬৮ জেলা শহর আইন গৃহীত হয়। সিরাজগঞ্জ পৌরসভা সূচনার ব্যাপারে শহরের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে 'শহর পঞ্চায়েত কমিটি ' বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এই সংগঠনের কাজ ছিল শহরের উন্নতি ও শোভা বর্ধন করা।
১৮৬৮ সালেই 'ডিস্ট্রিক্ট টাউন এ্যাক্ট সংশোধন করে পৌর শাসন সংস্থা 'মিউনিসিপালিটি নামে অভিহিত হয় এবং ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের পরিবর্তে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে সর্বময় কর্তা করে চেয়ারম্যান পদ সৃষ্টি করা হয়। এই আদেশের বলে ৮৪ টি শহর (জেলা, মহকুমা, বন্দরনগরী) চেয়ারম্যান শাসিত মিউনিসিপাল কমিটির সুযোগ লাভ করে। সিরাজগঞ্জ মহকুমা শহরও সেই আওতায় পড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় পূর্ব বাংলার অন্যান্য শহরের ন্যায় সিরাজগঞ্জ কে ১৮৬৯ সালের ১ এপ্রিল পৌরসভা ঘোষণা করা হয়।
ট্রেসটো ছিলেন সিরাজগঞ্জ পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান। তিনি অল্প সময়র মধ্যে সিরাজগঞ্জ পৌরসভাকে পুনর্গঠিত করেন এবং বাজেট পেশ করেন ৯,০৫৪.৯৮ টাকার। উক্ত সময় মিউনিসিপ্যালিটির আয়তন ছিল ১০.৫ বর্গমাইল। ১৮৬৯-২০১৯ মোট ৫৪ জন চেয়ারম্যান /ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান /দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা/মেয়র পৌরসভার দায়িত্ব পালন করেন। জনাব সৈয়দ আব্দুর রউফ মুক্তা ৫৪ তম পৌরসভার মেয়র। তিনি ৯/২/২০১৬ হতে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
তিনি ২০১৭-১৮ পৌরসভার সম্পূরক বাজেট এবং ২০১৮-১৯ সালের বাজেট পেশ করেন। তাতে রাজস্ব আয় ২১,২৪,৮৭,৯৮১/- ও উন্নয়ন বাজেট ১০০,১৮,১৩,৫৫২/- টাকা সর্বমোট বাজেট ১২১,২৪৭৯,৫৫৫/- টাকা এবং সার্বিক উদ্বৃত্ত বাজেট ১৮,২১,৫৭৮ যা পৌরসভার ইতিহাসে সর্ববৃহৎ বাজেট। চলমান বাজেট বাস্তবায়নে সবাই আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে।
সিরাজগঞ্জ পৌরসভা গঠিত হওয়ার পর ১৮৭২ সালে এক পরিসংখ্যানে অত্র শহরে ১৮৮৭৩ জন অধিবাসীর সংখ্যা পাওয়া যায়। বর্তমান পৌরসভার আয়তন ২৮.৪৯ বর্গকি.মি. এবং ২০১১ সালের আদম শুমারী তথ্য অনুযায়ী অত্র পৌরসভায় ২,৯৭,৬৩০ জন লোক বাস করে। অনক পথ পাড়ি দিয়ে, অনক পরিবর্তন -পরিবর্ধন ও সংশোধনের মধ্য দিয়ে আজ এ পৌরসভা এক বিশেষ স্থানে এসে পৌঁছেছে। আর্থ-সমাজিক বৈষম্যহীন এবং ন্যায়বিচারভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক ও শহরে পরিকল্পিত উন্নয়নের মাধ্যমে এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের সুষ্ঠু ব্যবস্হাপনার মাধ্যমে একটি ডিসি মডেল ও টেকসই নগর ব্যবস্হা গড়ে তোলা সম্ভব হবে যা সুশাসন ও গণতন্ত্রের ভিত্তিকে মজবুত করবে।
⇘সংবাদদাতা: সেবা ডেস্ক

খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।