জামালপুরের ভাষা সৈনিক ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আব্দুর রহমান সিদ্দিকি

জামালপুরের ভাষা সৈনিক ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আব্দুর রহমান সিদ্দিকি


ভাষা আন্দোলন, আইয়ুব বিরুধি আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া বৃহত্তর ময়মনসিংহের বিস্মিত প্রায় আওয়ামী রাজনীতিবিদ আব্দুর রহমান সিদ্দিকির আজ ২৭তম মৃত্যুবাষিকী।

আব্দুর রহমান সিদ্দিকির জন্ম ১৯২৮ সালে জামালপুর জেলার মেলান্দহ থানাধিন ছবিলাপুর গ্রামে। বাবার নাম আলহাজ মনির উদ্দিন আহামেদ  মায়ের  নাম  নসিমন  খাতুন। 

তিনি ১৯৪৬সালে বালিজুরি এফ এম উচ্চ বিদ্যালয় হতে মেট্রিকুলেশন পাশ করে ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজে ভর্তি হন। তার বড় ভাই ছিলেন গৌরীপুর রেলস্টেশনের স্টেশন মাস্টার, সেই সুবাদে গৌরীপুর এবং ময়মনসিংহ দুজায়গাতেই তিনি প্রগতিশীল রাজনীতি এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন । 

১৯৪৮ সালে  তিনি কলেজে খাদ্যনীতি বিরোধি আন্দোলনে অংশ নিয়ে সর্বপ্রথম জেলে যান। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে তিনি নেত্রকোনায় আদিবাসীদের সাথে টঙ্ক বিরোধি আন্দোলনে জড়িত হন। এরপর তিনি জামালপুরে ফিরে “প্রবাহ সাহিত্য মজলিসে” যোগ দিয়ে ভাষা আন্দোলনে জোড়ালো ভুমিকা পালন করেন। 

১৯৫২ সনের ২২শে ফেব্রুয়ারি জামালপুর থেকে সিদ্দিকিসহ আট জন গ্রেপ্তার হন। জেল থেকে বের হয়ে তিনি ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামীলীগের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পরেন। 

১৯৫৩ সালে আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সাথে সিদ্দিকি বিভিন্ন জেলা থেকে আগত অতিথিদের থাকা খাওয়াসহ দেখভালের দায়িত্ব পালন করেন যা বঙ্গবন্ধুর “অসমাপ্ত আত্মজীবনী” বইতে উল্লেখ করেছেন। 

১৯৫৪ সালে তিনি আওয়ামী নেতৃতাধীন যুক্তফ্রন্ট প্রার্থীর পক্ষে নিজ এলাকায় ভুমিকা রাখেন। ১৯৫৫ সালে তিনি ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামীলীগের প্রচার সম্পাদক নির্বাচিত হন। এরপর কুখ্যাত আইয়ুব বিরোধি আন্দোলনে অংশ নেয়ায় তাকে ৯২ক ধারায় গ্রেপ্তার করে দেড় বৎসর জেলে আটকে রাখে। জেল থেকে বের হয়ে তিনি জেলা বিড়ি শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হন। 

সিদ্দিকি  ও  হাতেম  আলি  তালুকদার, জেলা  আওয়ামী লীগ  নেতা  মাওলানা  আলতাব  আলীর  প্রকাশনায়  “এই দুর্ভিক্ষে”  নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন, যার ফলে ততকালীন সামরিক শাষক তাদের নামে হূলিয়া জারী করেন। 

১৯৫৮ সালে আইউব খান সামরিক শাসন জারি করলে প্রকাশ্য রাজনীতি নিষিদ্ধ হয়ে যায় । সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করার মানষে সিদ্দিকি, আলি আসাদ এবং আরএম সাইদ ইস্টবেঙ্গল লিবারেশন পার্টি গঠন করেন। 

প্রকাশ্য রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকায় তিনি বিড়ি শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যক্রমের আড়ালে ইস্ট বেঙ্গল লিবারেশন পার্টির কার্যক্রম চালাতে থাকেন । ১৯৫৯সালের শেষের দিকে তিনি আলি আসাদ ও আরএম সাইদ কে সাথে নিয়ে ভারত সরকারের সহযোগিতার প্রত্যাশায় ভারত গমন করেন। 

তৎকালিন পশ্চিম বঙ্গ কংগ্রেস নেতা সুরেন ঘোষের সহায়তায় প্রধানমন্ত্রী শ্রী নেহেরুর সাথে দেখা করেন। তারা ঐ সময় ভারত থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবি সম্বলিত লিফলেট ছাপিয়ে আনেন, তবে সেখান থেকে ফেরার পথে ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে  ভারতীয় পুলিশের  হাতে গ্রেপ্তার হয়ে এক মাস জেল খাটেন। 

দেশে ফিরে দেখেন তাদের সবার নামে হুলিয়া জারি হয়েছে। সিদ্দিকি ও আলি আসাদ ঢাকা চলে আসেন ও ভারত থেকে ছাপানো লিফলেট বিভিন্ন জেলার রাজনৈতিক নেতা ও বারের সম্পাদকদের কাছে প্রেরন করেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত আছে ১৯৮৭সনের “সাপ্তাহিক বিচিত্রার” বিজয় দিবস সংখ্যার প্রচ্ছদ প্রতিবেদনে। 

১৯৬০সনের শুরুর দিকে পল্টন মাঠের পাশে গোপন বৈঠক চলাকালে সিদ্দিকি আবারও গ্রেপ্তার হন। দীর্ঘকাল জেলে কাটিয়ে ১৯৬৩ সালের শেষের দিকে তিনি মুক্তি পান। এরপর দেশব্যাপী ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলন শুরু হলে তিনি ঝাপিয়ে পড়েন। আন্দোরনের মধ্যে ১৯৬৬ সনের ৮ই মে বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তার হন, ঠিক একদিন পর ৯ই মে গৌরীপুর থেকে সিদ্দিকিও গ্রেপ্তার হন। ১১ই মে ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামীলীগ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বঙ্গবন্ধু, আব্দুর রহমান সিদ্দিকিসহ আওয়ামিলীগের সব নেতা কর্মীর মুক্তি দাবি করে আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করে। 

সারাদেশব্যাপী তীব্র আন্দোলনের পর আইয়ুব সরকার ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারী বঙ্গবন্ধু, মনি সিং, সিদ্দিকিসহ ৩৪ নেতার মুক্তিদানের প্রেস নোট জারি করেন এবং তারা মুক্তি পান। 

মার্চের প্রথম সপ্তাহে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষ দসিদ্দিকিসহ ৩৪নেতাকে নাগরিক সম্বর্ধনা দেন। ১৯৭০ সালে কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে মত বিরোধ হলে তিনি দলত্যাগ করে ভাষানী ন্যাপে যোগদান করেন এবং ময়মনসিংহ জেলা ন্যাপের সাধারন সম্পাদক নিযুক্ত হন। 

১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি ভারতের আম্পতি শরণার্থী শিবিরে বাংলাদেশের মানুষকে অস্ত্র সহায়তা ও ট্রেনিং এর দাবিতে অনশন করেন। তিনি কলকাতা থেকে “সংগ্রামি বাংলা” নামে প্রত্রিকা পকাশ করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচারণা চালান। 

সিদ্দিকি পত্রিকাটির প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক ছিলেন। পত্রিকাটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনুধাবন করে জাতীয় জাদুঘরে তা সংরক্ষন করেছেন। 

স্বাধীনতার পরও তিনি মানুষের অধিকার আদায়ের রাজনীতি করেছেন। ১৯৭৪ এর ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময় লঙ্গর খানা খোলা ও খাদ্য দপ্তর ঘেরাও এর অপরাধে তিনি জামালপুর থেকে গ্রেপ্তার হন এবং প্রায় একবছর তিন মাস জেলে কাটান। 

মেজর জিয়ার শাসনামলে ভাষানী ন্যাপ বিলুপ্ত করে প্রায় সবাই বিএনপিতে যোগদান করেন। কিন্তু সিদ্দিকি ও তার রাজনৈতিক আদর্শ বিসর্জন না দিয়ে হাজি দানেশ, রাশেদ খান মেননদের সাথে প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল গঠন করেন। ১৯৭৯ সালে তিনি আওয়ামী লীগ থেকে জামালপুর-৩ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচনে অংশ নেন। 

১৯৮০ সনের দিকে সিদ্দিকি রাজনীতি থেকে বিদায় নেন । রাজনৈতিক জীবনে সিদ্দিকি প্রায় ১২ বৎসর জেলে কাটান। ১৯৯৩ সনের ১৬ই অক্টোবর আজকের এইদিনে তিনি মৃত্যু বরন করেন । তাকে নিজ গ্রাম ছবিলাপুরে সমাহিত করা হয়। তার মৃত্যুর পর জামালপুর প্রেসক্লাব ও “ভাষানী স্মৃতি সংসদ” ঢাকাতে স্মরন সভা অনুষ্ঠিত হয়। তিনি বত্রিশ বছরের রাজনৈতিক জীবনে মাওলানা ভাষানী, শেখ মুজিবর রহমান, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, রফিক উদ্দিন ভুইয়া প্রমুখ নেতার সান্নিধ্য পেয়েছেন। 

লেখক-
মো: শাহ জাহান সিদ্দিক, 
পিতা আবদুর রহমান সিদ্দিকী


-সেবা হট নিউজ: সত্য প্রকাশে আপোষহীন

0 comments

মন্তব্য করুন

খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।

Dara Computer Laptops