বকশীগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী টক দই

বকশীগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী টক দই
ছবি: ইতিহাস ও ঐতিহ্যে বৃহত্তর জামালপুর

আজকালকার বেশিরভাগ মানুষই অনেক বেশি হাস্থ্য সচেতন। সুস্থ থাকতে সবাই চায়। কিন্তু তা বলে কি রোগবালাই থেকে মুক্তি পাচ্ছে। তাই খাবার সম্পর্কে সচেতন ও নিয়ম অনুয়াযী থাবার খেলে অনেক মুক্তি পেতে রােগ বালাই মুক্তি পেতে পারেন আপনারা। রোগ ঠেকাতে সবচেয়ে বড় হাতিয়ারই হচ্ছে খাদ্য। খাদ্য যেমন রােগকে দুরে রাখতে পারে, তেমনি আবার এই খাবারের কারণে শত রােগ মানুষের শরীরে বাসা বাঁধে। কাজেই অন্য কিছু নিয়ম কানুনের সাথে খাদ্যের ব্যাপারে সবাইকে হতে হবে অনেক বেশী সচেতন। প্রতিদিন কিছু স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললেই নীরােগ ও কর্মঠ শরীর নিয়ে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকা যায়।

আর এক্ষেত্রে টক দই খাওয়ার উপকারিতা অনেক। আর গ্রীস্মের প্রচণ্ড উত্তাপে কিছুটা স্বস্তি আনতেও টক দইয়ের গুণাগুণ অসীম। তাই আজ আপনাদের জন্য টক দইয়ের উপকারিতা তুলে ধরা হলাে। দই একটি দুগ্ধজাত খাবার ও দুধের সমান পুষ্টিকর খাবার। টক দই অত্যন্ত পুষ্টিকর, এতে আছে প্রয়োজনীয় ভিটামিন, মিনারেল, আমিষ ইত্যাদি। টক দইতে দুধের চাইতে বেশি ভিটামিন বি ক্যালসিয়াম ও পটাশ আছে। এতে কার্বোহাইড্রেট, চিনি ও ফ্যাট নেই। এটি রোগ প্রতিরোধ করতে ও রােগ সারাতে সাহায্য করে। নিয়মিত টক দই খাওয়া শুরু করলে এর ফল পাওয়া যায় সাথে সাথে। 

জামালপুরের বকশীগঞ্জে ঐতিহ্যবাহী খাবার গরু মহিষের টক দই। যে দই ছাড়া বিয়েশাদি, জামাই আপ্যায়নসহ যে কোন ধরনের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়না। সকল আপ্যায়ন শেষে দই না থাকলে যেন অনুষ্ঠানের পরিপূর্নতা পায়না। মূলত বকশীগঞ্জ উপজেলার মেরুরচর, সাধুরপাড়া,কামালপুর, নিলাক্ষিয়া ইউনিয়নে বেশি দই পাওয়া যায়। এসব এলাকার কৃষক গবাদি পশু গরুর পাশাপাশি মহিষ পালন করে। গরুর দইয়ের তােলনায় মহিষের দই বেশি ননি যুক্ত হওয়ায় চাহিদা একটু বেশি।

টক দইয়ের ‍উপকারিতা
টক দইয়ে প্রচুর পরিমান ক্যালসিয়াম ও ভিটমিন ডি থাকে, যা হাড় ও দাঁতের গঠনে ও মজবুত করতে সাহায্য করে। টক দইয়ের ব্যাকটেরিয়া অত্যন্ত উপকারী । এটা শরীরের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াকে মেরে ফেলে এবং উপকারি ব্যাকটেরিয়া বাড়িয়ে হজম শক্তি বাড়িয়ে দেয়। টক দইয়ের ব্যাকটেরিয়া হজমে সহায়ক। তাই এটি পাকস্থলীর জ্বালাপােড়া কমাতে বা হজমের সমস্যা কমাতে সাহায্য করে।

টক দই শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এছাড়া ঠান্ডা, সর্দি ও জ্বরকে দুরে রাখে। টক দইয়ে আছে ল্যাকটিক অ্যাসিড, যা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে ও ডায়রিয়া প্রতিরোধ করে। এটি কোলন ক্যান্সার রােগীদের খাদ্য হিসাবে উপকারি। যারা দুধ খেতে পারেন না বা দুধ যাদের হজম হয় না, তারা অনায়াসেই টক দই খেতে পারেন। কারন টক দইয়ের আমিষ দুধের চেয়ে সহজে ও কম সময়ে হজম হয়। টক দই ওজন কমাতেও সাহায্য করে। এর আমিষের জন্য পেট ভরা বােধ হয় ও শরীরে শক্তি পাওয়া যায়। ফলে অতিরিক্ত খাবার গ্রহন করতে ইচ্ছে করে না। আর অতিরিক্ত খাবার না খেলে সহজেই ওজন নিয়ন্ত্রনে রাখা যায়। টক দই শরীরের উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রনে রাখে। প্রতিদিন মাত্র এক কাপ করে টক দই খেলে উচ্চ রক্তচাপ প্রায় এক তৃতীয়াংশ কমে যায় এবং স্বাভাবিক হয়ে আসে।

কম ফ্যাট যুক্ত টক দই রক্তের ক্ষতিকর কোলেস্টেরল এলডিএল কমায়। হার্টের অসুখ ও ডায়াবেটিসের রােগীরা টক দই খেলে অসুখ নিয়ন্ত্রনে থাকে। টক দই শরীরে টক্সিন জমতে বাধা দেয় । তাই অন্তনালী পরিস্কার রেখে শরীরকে সুস্থ রাখে ও বুড়িয়ে যাওয়া বা অকাল বার্ধক্য রােধ করে। শরীরে টক্সিন কমার কারণে ত্বকের সৌন্দর্যও বৃদ্ধি পায় নিয়মিত টক দই খেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। টক দই রক্ত শোধন করে। টক দই শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। তাই গ্রীষ্মকালে টক দই খেলে শরীর ভালাে থাকে।

টক দই কিভাবে খাওয়া যায়?

টক দই খাওয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ্ধতি হচ্ছে বােরহানি করে খাওয়া। টক দইয়ের ভিতর বিট লবন, গােল মরিচ গুড়া, পুদিনা বাটা ইত্যাদি দিয়ে তৈরী করা বােরহানি খেতে যেমন অসাধারন তেমনি স্বাস্থ্যকরও বটে । এছাড়া স্বাদ অন্যরকম করতে তেতুলের রস ও জিরা গুঁড়াও মিশানাে যায় বােরহানির সাথে। টক দইয়ের ভিতর সবকিছু দিয়ে হ্যান্ড বিটার দিয়ে ভাল করে ফেটে বা ব্লেন্ডারে দিয়ে বােরহানি তৈরি করা

টক দই আরও খাওয়া যায় সালাদের সাথে। টমেটো, শসা, গাজর ইত্যাদি কেটে টক দই মিশিয়ে তার সাথে বিট লবন, গােল মরিচের গুড়া যােগ করে খেতে হবে। এছাড়াও বিভিন্ন ফল কেটে টক দই সহযােগেও খাওয়া যায়। দুটো পদ্ধতিই সুস্বাদু ও পুষ্টিকর।

যেভাবেই টক দই খাওয়া হােক না কেন মূল কথা হচ্ছে এটি ভীষন উপকারি। নিয়মিতভাবে টক দই খেলে আমাদের শরীর থাকবে অনেক রােগমুক্ত, সতেজ ও স্বাভাবিক। যা প্রতিটি মানুষেরই কাম্য। ঘরে কিভাবে টক দই তৈরি করবেন।

উপকরণ :
দুধ ১ লিটার, পানি ১ কাপ, দইয়ের বীজ (আগের দই) ১ টেবিল, মাটির হাঁড়ি ১টি।

প্রণালি: দুধে ১ কাপ পানি মিশিয়ে মাঝারি আঁচে পাঁচ মিনিট জ্বাল দিন। দুধে বলক এলে আঁচ কমিয়ে দিন। মৃদু আঁচে ১৫ মিনিট দুধ জ্বাল দিন। দুধ মাঝেমধ্যে নাড়তে হবে। হাঁড়ির তলায় যেন ধরে না যায়। দুধ ঘন হলে চুলা থেকে নামিয়ে নাড়তে থাকুন। দুধ কিছুটা ঠান্ডা হলে মাটির হাঁড়িতে ঢালুন। কুসুম গরম থাকতে দইয়ের বীজ দিয়ে নেড়ে দিন এবং ঢেকে রেখে দিন। চার-পাঁচ ঘণ্টা পর দই জমে যাবে। ঠান্ডা হওয়ার জন্য ফ্রিজে তুলে রাখুন ঘরে পাতা টক দই।

তথ্যসূত্র: ইতিহাস ও ঐতিহ্যে বৃহত্তর জামালপুর, বকশীগঞ্জ উপজেলা সরকারি গণগ্রন্থগার




শেয়ার করুন

-সেবা হট নিউজ: সত্য প্রকাশে আপোষহীন

0 comments

মন্তব্য করুন

খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।