রৌমারীতে মুড়ি ফসল উৎপাদনে কৃষকের ব্যাপক সাড়া

রৌমারীতে মুড়ি ফসল উৎপাদনে কৃষকের ব্যাপক সাড়া



শফিকুল ইসলাম: কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলায় মুড়ি (ফসল) ধান উৎপাদনে কৃষকের মাঝে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। এ চাষে কৃষকের খরচ কম ও লাভ বেশি। জেলার দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের একটি ঘনবসতিপূর্ণ জনপদ। 

ব্রহ্মপুত্র নদ ও হলহলিয়া নদীসহ মোট ৫টি শাখা নদী দ্বারা বেষ্ঠিত। কৃষি প্রধান এ উপজেলায় মোট আয়তন ১৯ হাজার ৭’শ হেক্টর। আবাদযোগ্য জমি ১৬৬ হেক্টর। নিট আবাদী জমির পরিমান ১৫ হাজার ৫’শ ৫৫ হেক্টর। বর্তমানে রৌমারী একটি খাদ্য উদ্বৃত্ত উপজেলা। এ উপজেলায় প্রধান প্রধান ফসলের মধ্যে ধান, পাট, গম সরিষা, চিনা, কাউন, চিনাবাদাম, ভুট্টা ইত্যাদি হলেও ধানের প্রায় সিংহভাগ উৎপাদিত হয় রবি ও খরিপ-২ মৌসুমে। নদী বেষ্ঠিত হওয়ায় জুন-আগষ্ট মাস পর্যন্ত কয়েক দফায় বন্যায় সম্মখিন হতে হয় এখানকার কৃষকদের। ফলে বোরাধান কর্তনের পর খরিপ-১ মৌসুমে শুধু উচু জমি আউসধানও অল্প সবজি চাষ হলেও বাকি সব জমিই ১০ থেকে ১২ হাজার হেক্টর পতিত থাকে।  ২০২০-২১ অর্থ বছরে এ উপজেলায় বোরা ধান চাষ হয়েছে ১০ হাজার ২০ হেক্টর জমির মতো। চলতি খরিফ-১ মৌসুমে আউস ধানের পাশাপাশি বর্তমানে মাঠে কিছু কিছু জায়গায় বোরো ধানের কাটা মুড়ি থেকে ধান উৎপাদন হচ্ছে। যা ইতিপূর্বে তেমন পরিলক্ষিত হয়নি। 
কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর খামার বাড়ি উপপরিচালক মো: মঞ্জুরুল হক মুড়ি ফসল চাষ সম্প্রসারনের নির্দেশনা ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত তথ্য উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের প্রদান করেন। প্রাপ্ত নির্দেশনা ও তথ্যের ভিত্তিতে এই প্রযুক্তিতে কাজে লাগিয়ে বন্যার আগে অল্প খরচে অতিরিক্ত একটি ফসল উৎপাদনের জন্য উপজেলার ১৮ টি বøকে ২ হেক্টর করে মোট ৩৬ হেক্টর জমিতে মুড়ি ফসল চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করে প্রত্যেক এসএএও অগ্রাসরায়মান কৃষকের সাথে পরামশের্র পাশাপাশি উঠান বৈঠক, মাঠ দিবস ও প্রশিক্ষনে এ বিষয়ে আলোচনা করে অন্যান্য কৃষকদের অবহিত করার নির্দেশনা প্রদান করা হয়। 
উপসহকারি কৃষি কর্মকর্তাগণ কৃষকদের মুড়ি ফসল চাষে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত পরামর্শ প্রদান করে থাকেন। যার ফলশ্রæতিতে চলতি খরিফ-১ মৌসুমে অত্র উপজেলার প্রাথমিক ভাবে ২৫ হেক্টর জমিতে অর্জন সম্ভব হলেও বিভিন্ন কারনে শেষ পর্যন্ত ১২ হেক্টর জমিতে মুড়ি ফসল দন্ডায়মান ছিল। উপজেলার কৃষি অফিসার ৩টি মুড়ি ফসল জমিতে নমুনা শস্য কর্তন করেন। যেখানে তিনি বিঘা প্রতি গড়ে ৭ মন ধানে ফলন পেয়েছেন। তিনি আরো জানানা যে বন্যা প্রবণ এ উপজেলায় খরিফ-১ মৌসুমে পতিত জমির সুষ্ঠ ব্যবহার করতে হলে মুড়ি ফসলের বিকল্প নেই। তাই কৃষকদের উদ্বৃত্ত করতে তাদেরকে সার প্রণোদনা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা সেই সাথে কোন জাত ও মৌসুম মুড়ি ফসল চাষে উপযোগি সে বিষয়ে মাঠ পর্যায়ে গবেষনায় আওতায় নিয়ে আসার জন্য প্রদর্শনি বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবী। আগামী খরিফ-২ মৌসুমে আমন ধানে মুড়ি ফসল রেখে গবেষনা চালানো হবে।
শৌলমারী ইউনিয়নের বোয়ালমারী ক্লকে কর্মরত উপসহকারি কৃষি কর্মকর্তা মাসুদ রানা জানান, ত্রা বøকে প্রথমে ৫ হেক্টর জমিতে ২০ জন কৃষক মুড়ি ফসল রাখলেও প্রয়োজনীয় সেচের অভাব, গরু, ছাগলের উৎপাতে শেষ পর্যন্ত ৩ হেক্টর জমির ফসল কর্তন করতে সক্ষম হয়েছেন। ফলে উক্ত বøক হতে বন্যার আগেই মাত্র ৫৫-৬০ দিনের অতিরিক্ত ৬০ হতে ৭০ মন ধান উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছেন। 
একই ইউনিয়নের বড়াইকান্দি বøকে কর্মরত উপসহকারি কৃষি কর্মকর্তা বাবুল আকতার জানান, তার বøকে প্রায় ২ হেক্টর মুড়ি ফসল জমি হতে ৪৫/৫০ মন ধান পাওয়া যায়। আগামী বছরে মুড়ি ফসলের জমি আরো বৃদ্ধি পাবে বলে তিনি আশাবাদি।
বোয়ালমারী গ্রামের কৃষক রুহুল আমিন জানান, ধান কাটার পর যে কুশি হয় আগে তারা মুলত গরুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার হত। এখন থেকে যে বন্যার আগেই ধান পাওয়া সম্ভব তার প্রমাণ তিনি এবারেই পেয়েছেন। তিনি উপসহকারি কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে তার ৪০ শতাংস জমিতে ব্রি ধান-২৮ কর্তনের সময় ৫ ইঞ্চি মুড়ি রেখে সেচ দিয়ে ১০ কেজি ইউরিয়া,৫ কেজি এমওপি সার প্রয়োগ করে ৫৫ দিন পর ৭মন ধান পেয়েছেন। এতে তার খরচ হয়েছে মাত্র ১ হাজার টাকা। ধান হবে কি না এ অনিশ্চিতা থাকায় তিনি সঠিক যতœ নেননি। ফলে ফলন কম হয়েছে বলে তিনি জানান। আগামী বছর তিনি ৬ একর জমিতে মুড়ি ফসল চাষ করবেন বলে জানিয়েছেন। তিনি আরো বলেন, জমি পতিত রেখে কোন লাভ নাই। একটু যতœ নিলে যদি কম খরচে বন্যার আগে ২৫-৩০ মন ধান পাওয়া যায় তবে খারাপ কি? তার দেখাদেখি আশপাশের অনেক কৃষক  মুড়ি ফসলের চাষ করবেন বলে জানিয়েছেন। কৃষক রুহুল আমিন আরো জানান, সবাই মুড়ি ফসল চাষ করলে সেচ নেওয়া সুবিধা হবে। পাখি,গরু, ছাগলের উপদ্রব কমবে এবং ভালো পরিচর্যা করলে অল্প দিনেই বিঘা প্রতি ১০ থেকে ১২ মন ধান উৎপাদন করা সম্ভব। সর্বপরি তিনি কৃষি বিভাগের পরামর্শ পেয়ে অতিরিক্ত একটি ফসল পেয়ে  খুশি সেই সাথে তিনি সরকারের কাছে সারের প্রণোদনা দাবী করেন। এ বিষয়ে কৃষকদের প্রশিক্ষিত করার দাবী জানিয়েছেন এবং  আশপাশের কৃষকদের মুড়ি ফসল চাষে পরামর্শ দিবেন বলে জানিয়েছেন। সার্বিক ভাবে বন্যা প্রবণ ও জনপদে রবি মৌসুমে অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ হলেও বধিঞ্চু জনসংখ্যার খাদ্যের চাহিদা মেটাতে হলে খরিপ-১ মৌসুমে প্রায় ১০ হতে ১২ হাজার হেক্টর জমির মুড়ি ফসল উৎপাদনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। মুড়ি ফসল প্রযুক্তির সম্প্রসারন নিশ্চিত করার মাধ্যমে অতিরিক্ত ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষকদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি হবে আশা করা যায়।
এবিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা (ভার:) শাহাদত হোসেন জানান, কৃষি বিজ্ঞানে ধান কর্তনের পর (ধানের গোড়া) থেকে সামান্য যতেœ সহজ উপায়ে আবারো ধান উৎপাদন করা  সম্ভব। এতে কৃষকের খরচ অনেক কম হবে এবং লাভ হবে কয়েকগুণ বেশি। আশাকরি কৃষকেরা আগামীতে ব্যাপক হারে মুড়ি ফসল উৎপাদন করবেন। উপসহকারি কৃষি কর্মকর্তাগণ সার্বক্ষণিক কৃষকের পাশে থাকবেন।
 

শেয়ার করুন

-সেবা হট নিউজ: সত্য প্রকাশে আপোষহীন

0 comments

মন্তব্য করুন

খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।