পিলখানা: প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ় সিদ্ধান্ত গণহত্যা এড়াতে সাহায্য করে

পিলখানা প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ় সিদ্ধান্ত গণহত্যা এড়াতে সাহায্য করে



দেশ-বিদেশের অনেক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর দেশকে অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করার যে ষড়যন্ত্র, সেই সূত্রেই পিলখানা ট্র্যাজেডি বা তৎকালীন বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) বিদ্রোহের নামে সেনা অফিসারদের হত্যা করা হয়েছিল। 


তখনকার সদ্য ক্ষমতা হাতে নেওয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অসীম ধৈর্য, বিচক্ষণতা ও  সাহসিকতার সঙ্গে দৃঢ় সিদ্ধান্ত সেদিন বড় ধরনের গণহত্যা এড়াতে সাহায্য করেছিল।


সেদিন যা হয়েছিল: দিনটি ছিল বুধবার। একদিন আগেই পিলখানায় তৎকালীন বিডিআর সদর দফতরে তিনদিনব্যাপী রাইফেলস সপ্তাহের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২৫ ফেব্রুয়ারি ছিল বর্ণাঢ্য ওই আয়োজনের দ্বিতীয় দিন। নানা বর্ণিল আয়োজন আর উৎসবের মধ্য দিয়ে ২৬ ফেব্রুয়ারি শেষ হওয়ার কথা ছিল রাইফেলস সপ্তাহের। কিন্তু তার আগেই হত্যাযজ্ঞ।


সেদিন সকাল ৯টায় যথারীতি পিলখানায় দরবার হলে বসে বার্ষিক দরবার। সারাদেশ থেকে আসা বিডিআরের জওয়ান, জেসিও, এনসিওসহ বিপুলসংখ্যক সদস্যে তখন পরিপূর্ণ গোটা দরবার হল। দরবার মঞ্চে তৎকালীন বিডিআর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদসহ বিডিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।


তবে বার্ষিক দরবারের আনন্দমুখর পরিবেশ বদলে যায় কিছুক্ষণের মধ্যেই। বিপথগামী বিডিআর জওয়ানরা দরবার হলে ঢুকে মহাপরিচালকের সামনে তাদের নানা দাবি নিয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করে। সিপাহি মাঈন ডিজির সামনে তাক করে বন্দুকের নল। আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে এ ঘাতক গুলি চালাতে না পারলেও অপর জওয়ানরা এলোপাতাড়ি গুলি ছুঁড়তে শুরু করে। এক পর্যায়ে ব্যারাক থেকে শত শত বিডিআর সদস্য বেরিয়ে দরবার হল ঘিরে ফেলে। শুরু করে বৃষ্টির মতো গুলি। অস্ত্রাগার নিয়ন্ত্রণে নেয় বিদ্রোহীরা; গোলা-বারুদ আর গ্রেনেডের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পুরো পিলখানা পরিণত করতে থাকে ধ্বংসস্তূপে। মুহূর্তেই সেই বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে দেশের অন্যান্য বিডিআর ব্যাটালিয়নেও। পিলখানায় বিপথগামী বিদ্রোহীরা মেতে ওঠে নারকীয় হত্যাযজ্ঞে।


উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সকাল ১০টার দিকে সাভার ও ঢাকা সেনানিবাস থেকে সাঁজোয়া যান এবং ভারী অস্ত্র নিয়ে পিলখানার দিকে রওনা হন সেনা সদস্যরা। সকাল ১১টার মধ্যেই তারা ধানমণ্ডি ও নীলক্ষেত মোড়ে শান্তিপূর্ণ অবস্থান নেন। এক পর্যায়ে বিদ্রোহীরা সদর গেট ও ৩ নম্বর গেট থেকে গুলি ছুঁড়তে থাকে সেনা সদস্যদের লক্ষ্য করে। বিডিআরের ১ নম্বর ও ৫ নম্বর গেটের আশপাশসহ বিভিন্ন পয়েন্টে আর্টিলারি গান ও সাঁজোয়া যান স্থাপন করা হয়। এতে বড় ধরনের রক্তপাতের আশঙ্কায় গোটা রাজধানীতে ছড়িয়ে পড়ে চরম আতঙ্ক। বিদ্রোহ সামাল দিতে শুরু হয় তৎপরতা। 


বিদ্রোহ শুরুর পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বাসভবনে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন উ আহমেদ ও বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যদের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেন। মাঠপর্যায়ে বিদ্রোহীদের সঙ্গে মধ্যস্থতা বৈঠক চলতে থাকে ধানমণ্ডির আম্বালা ইন-এ। বিদ্রোহ দমনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় নানাভাবে দফায় দফায় বৈঠক করেন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন, এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতারা। জীবনের ঝুঁকি নিয়েও তারা ছুটে যান পিলখানায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যান।


এরই ধারাবাহিকতায় বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও আলোচনা হয় বিদ্রোহীদের। পরে গভীর রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন পিলখানায় গেলে তার কাছে অস্ত্র সমর্পণ করেন বিদ্রোহীরা। সেখান থেকে বেরিয়ে আসার সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিদ্রোহীদের হাতে জিম্মি কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের সদস্যকে সঙ্গে করে নিয়ে আসেন।


তবে এরপরও পিলখানা বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে থাকতে দেখা যায়। এক পর্যায়ে ২৬ ফেব্রুয়ারি বিকাল থেকে পিলখানা শূন্য হয়ে পড়লে পুলিশ ও সেনাবাহিনী পিলখানার নিয়ন্ত্রণ নেয়। অবসান হয় ৩৬ ঘণ্টার বিদ্রোহের। এ ঘটনায় প্রাণ হারান ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবিরাম তৎপরতায় অনিবার্য আরও বড় ধরনের রক্তগঙ্গা থেকে রক্ষা পায় গোটা জাতি।


পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহের মামলায় হাইকোর্টের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর্যবেক্ষণে বিদ্রোহ দমনে সময়োপযোগী ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রধানমন্ত্রী, সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী ও নৌ বাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করে বলা হয়, বিডিআর বিদ্রোহের ভয়াবহতা ও আকস্মিকতায় সদ্য নির্বাচিত ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকার প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অসীম ধৈর্য, বিচক্ষণতা ও সাহসিকতার সাথে দৃঢ় মনোবল নিয়ে শক্ত হাতে বিদ্রোহ দমনের যৌক্তিক ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত ছিল দূরদর্শিতাপূর্ণ।


বাংলাদেশ রাইফেলসের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ কাজে লাগিয়ে বিডিআর বিদ্রোহের মাধ্যমে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বিনষ্ট, অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা বিঘ্নের লক্ষ্যে একটি স্বার্থান্বেষী মহলের পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত বাহিনীকে ধ্বংসের চক্রান্ত রুখে দেয়ার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রনায়কোচিতভাবে তার গৃহীত পদক্ষেপ ছিল সময়োপযোগী। পাশাপাশি আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় প্রশিক্ষিত ও সুশৃংঙ্খল প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী ও নৌ বাহিনী দেশের সংবিধান ও গণতন্ত্রের প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও অবিচল আস্থা রেখে চরম ধৈর্যের সাথে উদ্ভূত ভয়ংকর পরিস্থিতি মোকাবেলার মাধ্যমে পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়ে সমগ্র দেশবাসীর ভালোবাসা ও সুনাম অর্জন করেছেন।

 


শেয়ার করুন

-সেবা হট নিউজ: সত্য প্রকাশে আপোষহীন

,

0comments

মন্তব্য করুন

খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।