একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন : গাইবান্ধা ১ এ জাপা’র ঘাটিতে আ’লীগের থাবা

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন : গাইবান্ধা ১ এ জাপা’র ঘাটিতে আ’লীগের থাবা

শাহাদৎ হোসেনে মিশুক, গাইবান্ধা : ঘটনাবহুল গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ আসনে ক্ষমতাসীন জোটের প্রধান দুই শরিকের মধ্যে চলছে টানাপোড়েন। জাতীয় পার্টির ঘাটি হিসাবে পরিচিত আসনটি এবার দখলে নিতে মরিয়া আওয়ামী লীগ, তবে বসে নেই জামায়াতও। ভোটের হিসাবে গুরুত্ব না মিললেও এখানে বিএনপি বরাবরই জামায়াত বা জাতীয় পার্টিকে সমর্থন দিয়ে থাকে।

১৯৭৩ সালে এ আসনে আওয়ামী লীগে প্রার্থী শামসুল হোসেন সরকার বিজয়ী হন কিন্তু ৭৯ সালে তিনি হেরে যান মুসলিম লীগে প্রার্থী রেজাউল আওয়াল খন্দকারের নিকট। ১৯৮৬ সালে শুরু হয় জাতীয় পার্টির স্বর্ণযুগ, ঐ বছর ও ৯১ সালেও হাফিজুর রহমান এবং ৯৬ সালে সরকার ওয়াহিদুজ জামান জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসাবে বিজয়ী হন।

২০০১ সালে ছন্দপতন ঘটে, সেবার আসনটি ছিনিয়ে নেয় জামায়াতের মাওলানা আব্দুল আজিজ। ২০০৮ সালে জাতীয় পার্টি তা উদ্ধার করে, সেখানে বিজয়ী হন বহুল আলোচিত এমপি লিটন হত্যার প্রধান আসামী অবসরপ্রাপ্ত কর্ণেল ডা. আব্দুল কাদির খান।

২০১৪ সালে বিনা ভোটের নির্বাচনে আসনটি দখলে নেন  আওয়ামী লীগের মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন। লিটন হত্যা পর এ আসনে ২০১৭ সালে উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী গোলাম মোস্তফা বিজয়ী হন, তিনিও সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হলে চলতি বছরের গত ১৩ মার্চ উপনির্বাচনে বিজয়ী হন জাতীয় পার্টির প্রার্থী ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী।

বর্তমানে ৩ লাখ ৩৮ হাজার ৫৫৬ ভোটারের এ আসনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। বড় দুই দলের (জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগ) মনোনয়ন প্রত্যাশীরা এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন। নিজেদের পরিচিতি তুলে ধরতে ব্যানার-ফেস্টুনসহ নানা প্রচারণা করছেন। সম্প্রতি উঠান বৈঠক ও জনসচেতনতামূলক কর্মকা- নিয়ে তারা বাড়ি বাড়িও যাচ্ছেন। সব মিলে জমে উঠেছে এ আসনের নির্বাচন।

জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম মেম্বর, বর্তমান এমপি ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী একক প্রার্থী হিসাবে রয়েছেন নির্বাচনী মাঠে। তরুণ এ এমপির এলাকায় গ্রহনযোগ্যতাও রয়েছে। তিনি শিক্ষা বান্ধব ও সমাজসেবক হিসাবে মানুষের দৃষ্টি কেড়েছেন। সম্ভ্রান্ত পরিবারের সদস্য হিসাবে পূর্ব থেকেই বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত। তিনি নিজে পার্টির উপজেলা শাখারও সভাপতি, পার্টির মধ্যে কোন অমিল না থাকায় এবারও ভোটের অংকে ভালো অবস্থানে রয়েছেন তিনি।

তবে ২০০১ সালে জামায়াত প্রার্থী নির্বাচিত হওয়ায় সাংগঠনিকভাবে এখানে জামায়াত শক্তিশালী অবস্থানে যায়। গোটা উপজেলায় জামায়াতের ব্যাপক প্রভাব বৃদ্ধি পায়। একারনেই আন্তর্জাতিক মানবতা বিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ওই দলের কেন্দ্রীয় নেতা দেলওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির আদেশ ঘোষিত হলে গোটা সুন্দরগঞ্জে জামায়াত শিবিরের তান্ডবে তছনছ হয়ে যায়। ওই ঘটনায় সারাদেশে সুন্দরগঞ্জের পরিচিতি এনে দেয়।

পরবর্তীতে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনে মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তার গুলিতে শিশু সৌরভকে হত্যা প্রচেষ্টায় গ্রেফতার হওয়ার ঘটনা সুন্দরগঞ্জ আরও আলোচনায় উঠে আসে।

স্বাধীনতা পরবর্তী ১৯৭৩ সালে দেশের প্রথম সংসদ নির্বাচনে আ’লীগ প্রার্থী সরকার নির্বাচিত করার পর  আর আ’লীগ প্রার্থী এ আসনে বিজয়ী হতে পারেননি। পরবর্তীতে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারী বহুল আলোচিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হন আ’লীগ প্রার্থী মরহুম মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন। তিনি আততায়ীর হাতে নিহত হলে তার শূন্য আসনে উপ-নির্বাচনে বিজয়ী হন আ’লীগ মনোনিত প্রার্থী প্রয়াত সংসদ সদস্য গোলাম মোস্তফা আহমেদ।

এক মর্মান্তিক সড়ক দূর্ঘটনায় তারও মৃত্যু হলে আবার শূন্য হয়। পুনঃরায় উপনির্বাচনে এমপি লিটনের বড় বোন আনন্দ গ্রুপ অব কোম্পানিজ এন্ড ইন্ডাষ্ট্রিজের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর আফরুজা বারীকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেয়া হয়। জাতীয় পার্টির প্রার্থী ব্যারিষ্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী আ’লীগ প্রার্থীকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে বিজয়ী হন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আ’লীগের হাফ ডজন সম্ভাব্য প্রার্থী দলের মনোনয়ন পেতে এখন থেকেই জেলা এবং কেন্দ্রীয় পর্যায় দৌড়ঝাপ শুরু করেছেন। ওই আসনে আ’লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে অন্যতম রয়েছেন নিহত সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনের স্ত্রী জেলা মহিলা আ’লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক খুরশীদ জাহান স্মৃতি।

তিনি স্বামীর সহচর হিসেবে রাজনৈতিক অঙ্গঁনে কাজ করেছেন। ভোটাররা তার পরিচিত। তিনি স্বামীর অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করতে। অপরদিকে এমপি লিটনের বড় বোন আনন্দ গ্রুপ অব কোম্পানিজ এন্ড ইন্ডাষ্ট্রিজের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর আফরুজা বারীও আ’লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী। ছোট ভাই মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনের খুনিদের সঠিক বিচার ও দ্রুত রায় কার্যকর করার প্রতিশ্রতি দেন এমপি লিটনের ভোটারদের। স্বামী ও ভাইয়ের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করতে দলীয় মনোনয়ন পেতে আগ্রহী দু’জনই।

এছাড়াও পৌর মেয়র উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আব্দুল্লাহ আল মামুন, জেলা আ’লীগের সহ-সভাপতি সৈয়দা মাসুদা খাজা, উপজেলা আ’লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম, উপজেলা আ’লীগের যুগ্ম আহবায়ক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ভালোবাসি সুন্দরগঞ্জ’ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি রেজাউল আলম রেজা ও সুন্দরগঞ্জ ডি ডাব্লিউ ডিগ্রী কলেজের উপাধ্যক্ষ দলের সাবেক উপজেলা সহ-সভাপতি আব্দুল হান্নান এবং জেলা পরিষদ সদস্য এমদাদুল হক নাদিম দলের মনোনয়ন পেতে আগ্রহী। তবে মহাজোট হিসাবে নির্বাচনে গেলে অনেক হিসাব নিকাশই পাল্টে যেতে পারে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

এআসনে বিএনপি কখনই শক্তিশালী অবস্থানে ছিলো না। এখনও সাংগঠনিকভাবে দুর্বল। এ আসনে তাই বিএনপি অনেকটাই জোট নির্ভর। তবে নির্বাচনী হাওয়া উঠায় নড়েচড়ে উঠেছেন দলের নেতাকর্মীরা। তারা দল গোছাতে এখন ব্যস্ত।

২০ দলের জোটই নির্ধারণ করবে কোন দলের প্রার্থী এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। তারপরও বিএনপি’র সম্ভাব্য প্রার্থীরা দলীয় পর্যায়ে তৎপরতা শুরু করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন উপজেলা বিএনপি’র সাবেক সভাপতি বর্তমানে জেলা সহ-সভাপতি ও সাবেক পিপি অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম জিন্না এবং বর্তমান উপজেলা সভাপতি ও হরিপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মোজাহারুল ইসলাম। তারা সাংগঠনিক তৎপরতার পাশাপাশি জনসংযোগও চালিয়ে যাচ্ছেন।

জামায়াত নেতা দেলওয়ার হোসেন সাঈদীর বিশেষ আদালতে ফাঁসির আদেশের পর সুন্দরগঞ্জে জামায়াত-শিবিরের তান্ডবের ঘটনায় সরকার কঠোর অবস্থানে যান। এ কারণে মামলা এবং গ্রেফতার আতংকে জামায়াত এখানে এখন কোনঠাসা।

নেতাকর্মীদের প্রকাশ্যে কোনো কার্যক্রম নেই। এছাড়া মানবতা বিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের কঠোর দন্ড হওয়ায় নেতাকর্মীদের অনেকেই মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাদের অধিকাংশই রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। তবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে ডামাতেলে শুরু হওয়ায় সুন্দরগঞ্জে জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে তার কিছুটা প্রভাব পড়েছে।

তবে তাদের কার্যক্রম একেবারে নীরবে। তারা নিজস্ব প্রার্থী হিসেবে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান মোঃ মাজেদুর রহমানের নাম মাঠে ময়দানে ছড়িয়ে দিয়েছে। ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে মাজেদুর রহমানকেই তারা চায়।

নতুন ভোটার ফয়সাল মাহমুদ বলেন, আমাদের সুন্দরগঞ্জ আসনে মন্ত্রী পর্যন্ত ছিল। কিন্তু তেমন কোন কাজ হয় নি। তবে এই উপজেলার অনেকাংশ নদী তীরবর্তী হওয়ায় ভাঙ্গন প্রকপ দেখা দিয়েছে। এই ভাঙ্গন রোধ থেকে ও উপজেলার উন্নয়ন যে ব্যক্তি আশা ব্যক্ত করবে তাকেই আমরা ভোট দিব।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এবারে মহাজোট ও ২০ দলীয় জোটের মধ্যেই প্রার্থীতা নির্ধারণ হবে। জোটবদ্ধভাবেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামবেন দু’পক্ষ। এটাই ধারণা সবার।


⇘সংবাদদাতা: শাহাদৎ হোসেনে মিশুক

,

0 comments

Comments Please

themeforestthemeforest

ছবি কথা বলে