আজ ইসলামপুর পাকহানাদার মুক্ত দিবস

আজ ইসলামপুর পাকহানাদার মুক্ত দিবস

লিয়াকত হোসাইন লায়ন, জামালপুর প্রতিনিধি ॥ আজ স্বাধীনতার ৪৭ বছর। ডিসেম্বর মাস বাঙ্গালী জাতির গৌরবের মাস। এই মাসের ৭ ডিসেম্বর আজকের দিনেই ইসলামপুরের মাটি পাকহানাদার মুক্ত হয়েছে।

জানা যায়, ১৯৭১ সালে হাজার মুক্তি কামী ছাত্র জনতা আনন্দ উল্লাশের মধ্যে দিয়ে থানা চত্তরে জালাল কোম্পানীর কমান্ডার প্রয়াত শাহ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন স্বাধীনতার প্রথম বিজয় পতাকা উত্তোলন করেন। এই দিনটি ইসলামপুর বাসীর জন্য অত্যান্ত গৌরবের।

বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহাদত হোসেন স্বাধীন সহ স্থানীয় মক্তিযোদ্ধারা জানান, যখন এই মাসের আগমন ঘটে তখনই মনটা ফিরে যায় অতীতের সেই ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে। বিশাল জনসমুদ্রে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের কণ্ঠে ঘোষিত হয় বাঙ্গালী জাতির বঞ্চনার ২৩ বছরের ইতিহাস । এবাবের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।

সে সময় ইসলামপুর উপজেলার উত্তর দরিয়াবাদ ফকিরপাড়ার সন্তান জালাল কোম্পানী কমান্ডার বীর সন্তান শাহ্ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিনের নেতৃত্বে ওই সময় জয় বাংলা মন্ত্রে উজ্জীবিত, উদ্দীপ্ত হয়ে ফকির পাড়া এলাকার তৎকালীন জামালপুর মহকুমাধীন ইসলামপুর সহ বিভিন্ন থানার সামরিক প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত দ্বিতীয় প্রতিরক্ষা মুজাহিদ বাহিনীর শতাধিক সদস্য সংগঠিত হয়ে ইসলামপুর জে, জে, কে, এম উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় মাঠে সমাবেত হয়।

সেই ঐতিহাসিক ক্ষনে এলাকার ছাত্র, যুবক ও বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে ড্রীল ও বাশের লাঠি দিয়ে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। অতপর টাঙ্গাইলের মধুপুরে পাক হানাদার বাহিনী বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নেওয়ার উদ্দেশে কমান্ডার আশরাফ ও শাহ্ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিনের নেতৃত্বে ১০০ জন মুজাহিদ সদস্যদের নিয়ে জামালপুরের উদ্দেশে রওয়ানা হন।

ওইদিন আমরা তারা জামালপুরে পিটিআই ও মহিলা কলেজে অবস্থান নেই। জামালপুর সংগ্রাম কমিটির নেতৃবৃন্দের প্রচেষ্ঠায় জামালপুর ট্রেজারী থেকে ১০০টি থ্রি নট থ্রি রাইফেল ও গুলি সংগ্রহ করে প্রতিরোধ যুদ্ধে প্রস্তুতি নেন। ১৯ মার্চ জয়দেবপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে বিদ্রোহ করে ময়মনসিংহে অবস্থান কারী সেক্টর কমান্ডার এস ফোর্সের অধীনায়ক বাংলাদেশের প্রথম সেনা প্রধান মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহর নিদের্শনা ও নেতৃত্বে ক্যাপ্টেন হাকিমের তত্ত্বাবোধানে টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর নামক স্থানের পাক হানারদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ১ এপ্রিল হইতে ২২ এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিরোধ ও সম্মুখ যুদ্ধে অংশ গ্রহন করেন।

পাক হানাদার বাহিনীর ভারী অস্ত্র ও বিমান হামলার মুখে টিকতে না পেরে ছত্র ভঙ্গ হয়ে পড়েন সকলে। পাক হানাদার বাহিনী টাঙ্গাইল, মধুপুর হইতে জামালপুর পর্যন্ত সকল প্রতিরোধ ভেঙ্গে ২২ এপ্রিল জামালপুর দখল করে নেয়। ২৭ এপ্রিল ইসলামপুর থানাও দখল করে নেয়। ইসলামপুর থানার রাজাকারদের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের বাড়িঘরে অগ্নি সংযোগ, লুট পাট ও হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়।

পরর্বতীতে শাহ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিনের নেতৃত্বে টাঙ্গাইল প্রতিরোধ যুদ্ধ থেকে ফেরত কিছু সংখ্যক মুজাহিদ সদস্য ও অন্যান্য পেশার লোকজনদের নিয়ে ভারতের মেঘালয় রাজ্যে মহেন্দ্রগঞ্জে আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দ্রের সমন্বয়ে স্থাপিত প্রাথমিক রিক্রুট মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ শিবিরে যোগদান করেন।

প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের ইনর্জাচ করিমুজ্জামান তালুকদার এমএনএ, রাশেদ মোশারফ এমপিএ, আশরাফ হোসেন এমপি’র নির্দেশে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ডুকে পাক- হানাদার বাহিনী ও স্বাধীনতা বিরোধীদের গতি বিধি পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব পালন ও মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের উদ্দেশ্য মতিউর রহমান মতি, গোলাম মোস্তুফা, মাওলানা আনোয়ার হোসেন, শাহাদত হোসেন মজির উদ্দিন আহমেদ, শ্রী পরিমল সেন (নারু বাবু), আঃ গণি সরদার, ইদ্রিস আলী বাহাদুর, ও স্কাউট লিডার শ্রী সুভাষ চন্দ্র দাস বিভিন্ন পেশার লোক জনদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেন।

ভারতের মহন্দেগঞ্জে রিক্রুটিং প্রশিক্ষণ শিবিরে পরবর্তী আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত অবস্থান করা হয়। বাছাইকৃত লোকদের তুরাসহ অন্যান্য স্থানে ভারতীর সামরিক বাহিনীর অধিনে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য পাঠনো হয়। প্রশিক্ষণ শেষে তারা বিভিন্ন ক্যাডারে অন্তভুক্ত হয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গেরীলা যোদ্ধে অর্ন্তভুক্ত হয়। ১২ আগস্ট কর্নেল আবু তাহের সেক্টর কমান্ডার হিসাবে যোগদান করেন।

এ সময় ১১ নম্বর সেক্টর কমান্ডারের নির্দেশ মোতাবেক বিভিন্ন পেশার লোকজনদের নিয়ে জালাল উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি কোম্পানী গঠন করা হয়। সেক্টর কমান্ডার এর নির্দেশ মোতাবেক উক্ত কোম্পানীর মুক্তি যোদ্ধাদের নিয়ে ইসলামপুর থানাধীন সিরাজাবাদ এলাকার বহ্ম্রপুত্র নদীর পাড়ে মাদারি ছন আখ ক্ষেতে নামক স্থানে একটি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়।

সেখানে থ্রিউরিক্যাল ও প্রেক্টিক্যাল প্রশিক্ষণ প্রদানসহ গেরিলা যুদ্ধ চালানো হয়। জালালের নাম অনুসারে জালাল বাহিনী নামে পরিচিতি লাভ করে। প্রতিদিন জালাল বাহিনী নিয়ে পাক হানাদার বাহিনী ও রাজাকারদের স্থাপনা আক্রমন করেন। কমান্ডার জালাল উদ্দিন, আলা উদ্দিন জোদ্দার, মোঃ মমতাজ উদ্দিন, জয়নাল আবেদীন, এস এম কুদ্দুছ, নাগর আলী সুলতান মাহমুদ সহ আমাদের পুরস্কৃত করেন।

মুক্তিযোদ্ধের চুড়ান্ত পর্যায়ে জালাল বাহিনী ইসলামপুরের পাক হানাদার বাহিনী ক্যাম্প দখলে প্রস্তুতির উদ্দেশে ৬ ডিসেম্বর দুপুর পলবান্ধা ইউনিয়নের পশ্চিম বাহাদুরপুর পাইমারী স্কুল মাঠ সংলগ্ন ইসলামপুর সিরাজাবাদ রোডে অবস্থান নেয়।

মুক্তিযোদ্ধারা চারটি ভাগে বিভক্ত হয়ে এক প্লাটুন থানা পরিষদের উত্তর পশ্চিম কর্নারে ঋষি পাড়া রেল ক্রসিং এলাকা ২নম্বর প্লাটুনকে সর্দার পাড়া অস্টমিটেক খেয়া ঘাট সংগলগ্ন ব্রহ্মপূত্র নদের দক্ষিণ পাড় ইসলামপুর টু সিরাজাবাদ রোড এলাকায় ৩ নম্বর প্লাটুনকে থানার পূর্ব পাশে পাকা মোড়ি মোড় বর্তমানে ইসলামপুর হাসপাতাল সংলগ্ন রোড়ে এবং ৪ নম্বর রিজার্ভ প্লাটুনকে পশ্চিম বাহাদুরপুর প্রাইমারি স্কুল সংলগ্ন উত্তর পাশে অবস্থান নেয়।

ওইদিন দুপুর হতে পরের দিন ভোর পর্যন্ত একটানা যুদ্ধ হয়। হানাদার বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের গোলাগুলির দাপটে টিকতে না পেরে অস্ত্র গোলাবারুদ এবং অন্যান্য জিনিস পত্র ফেলে আকর্ষিক ভাবে রনে ভঙ্গ দিয়ে স্পেশাল ট্রেন যোগে জামালপুরের দিকে পালিয়ে যায়। পালিয়ে যাওয়ার সময় ঝিনাই ব্রিজসহ তিনটি রেল ব্রিজ ধ্বংস করে জামালপুর পর্যন্ত আমাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন করে দেয়।

অতপর ৭ ডিসেম্বর বেলা ১১ টা সময় থানা প্রসাশন রাজনৈতিক নের্তৃবৃন্দ মজির উদ্দিন আহমেদ, গণি সরদার, টুআইসি আলাউ উদ্দিন জোরদার, প্লাটুন কমান্ডার শাহাদত হোসেন স্বাধীন ও হাজার মুক্তি কামী ছাত্র জনতা আনন্দ উল্লাশের মধ্যে দিয়ে থানা চত্তরে জালাল কোম্পানীর কমান্ডার প্রয়াত শাহ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন স্বাধীনতার প্রথম বিজয় পতাকা উত্তোলন করেন। সেই সাথে ইসলামপুরের মাটি শত্রুমুক্ত হয়। উল্লেখ্য যে স্পেশাল জালাল কোম্পানী কমান্ডার শাহ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন ২৭ আগষ্ট ২০১৭ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
⇘সংবাদদাতা: লিয়াকত হোসাইন লায়ন

, , ,

0 comments

Comments Please

themeforestthemeforest

ছবি কথা বলে