জমজম কূপের পানি পান করার ফজিলত ও নিয়ম

জমজম কূপের পানি পান করার ফজিলত ও নিয়ম
সেবা ডেস্ক: সৌদি আরবে পবিত্র হজ পালন শেষে বাংলাদেশে ফিরতে শুরু করেছেন সন্মানিত হাজীরা। পরিবার কিংবা প্রতিবেশী, আত্মীয় স্বজনদের জন্য হাজিদের বিশেষ উপহার থাকে জমজম কূপের পানি।

আগ্রহ নিয়ে সবাই জমজম পানি পান করে থাকেন। এ বরকতময় পানি পানের আগে জেনে নেয়া প্রয়োজন এ পানি পান করার ফজিলত ও নিয়ম।

জমজম পানির পরিচয়:

জমজম মসজিদে হারামের কাছে অবস্থিত একটি প্রসিদ্ধ কূপ। পবিত্র কাবা ও এই কূপের মধ্যে দূরত্ব হলো মাত্র ৩৮ গজের। জমজম নবী ইব্রাহিম (আ.) এর ছেলে নবী ইসমাঈল (আ.) এর স্মৃতিবিজড়িত কূপ।

হজ ও ওমরাহ আদায়কারীর জন্য বিশেষভাবে এবং পৃথিবীর সব মুসলমানের জন্য সাধারণভাবে জমজমের পানি পান করা মুস্তাহাব। সহিহ হাদিসে বিধৃত হয়েছে যে নবীজি (সা.) নিজে জমজম থেকে পানি পান করেছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৫৫৬)

জমজম পানি পানের ফজিলত:

হজরত আবু জর (রা.) বর্ণনা করেন, নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘জমজমের পানি বরকতময়, স্বাদ অন্বেষণকারীর খাদ্য।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৪৭৩)

মুসনাদে তায়ালুসিতে এই হাদিসের একটি বর্ধিত অংশ উদ্ধৃত হয়েছে, ‘এবং রোগীর ওষুধ।’ আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজের সঙ্গে পাত্রে ও মশকে করে জমজমের পানি বহন করতেন। তা অসুস্থদের ওপর ছিটিয়ে দিতেন এবং তাদের পান করাতেন। (সুনানে তিরমিজি)

এ বর্ণনা থেকে এ কথাও জানা যায় যে জমজমের পানি বহন করা জায়েজ। আর যারা জমজম কূপের কাছে নয়, তাদের পান করানো নববী সুন্নত।

জমজমের পানি পানের নিয়ম:

জমজম থেকে পানি পানকারী ব্যক্তির জন্য সুন্নত হলো পুরোপুরিভাবে পরিতৃপ্ত হয়ে পান করা। ফকিহগণ জমজমের পানি পানের কিছু আদব উল্লেখ করেছেন, যেমন- কিবলামুখী হওয়া, বিসমিল্লাহ বলা, তিন শ্বাসে পান করা, পরিতৃপ্ত হওয়া, শেষে আলহামদুলিল্লাহ বলা ইত্যাদি। জমজমের পানি ইবাদত মনে করে পান করা উচিত। জমজমের পানি পান করার সময় একটি বড় কাজ হলো দোয়া করা।

এ পানি পানের উদ্দেশ্য:

জাবির (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জমজমের পানি যে উদ্দেশ্য নিয়ে পান করবে তা পূরণ হবে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩০৬২)

এ জন্য আমরা পূর্বসূরি মনীষীদের জীবনেতিহাসে দেখতে পাই যে তারা জমজমের পানি পানের সময় বিভিন্ন দোয়া করতেন। এখানে কয়েকজন মনীষীর উদ্ধৃতি দেয়া হলো-

আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ুতি (রহ.) বলেন, হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি জমজমের পানি পান করেছিলাম স্মৃতিশক্তিতে হাফিজ শামসুদ্দিন জাহাবি (রহ.) এর স্তরে পৌঁছার নিয়তে। সুয়ুতি বলেন, ইবনে হাজার ওই স্তরে পৌঁছেছিলেন; বরং তার স্মৃতিশক্তি আরো অধিক প্রখর হয়েছিল। (তাবাকাতুল হুফফাজ : ১/৫২২)

হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) নিজে বলেন, আমার হাদিস শিক্ষাজীবনের প্রথম দিকে একবার আমি জমজমের পানি পান করলাম এবং আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলাম যে, তিনি যেন আমাকে হাদিস মুখস্থ করার ক্ষেত্রে হাফিজ জাহাবি (রহ.) এর অবস্থা দান করেন। তারপর যখন আমি ২০ বছর পর আবার জমজমের পানি পান করলাম এবং ওই স্তর থেকে বেশি কিছুর জন্য প্রার্থনা করতে মন চাইল, তখন আমি আরো উঁচু স্তরের জন্য দোয়া করলাম। আমি আশাবাদী যে আল্লাহ তা-ও আমাকে দান করবেন। (মাওয়াহিবুল জালিল : ৩/১১৬)

আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ুতি (রহ.) জমজমের পানি পান করেন এই নিয়তে যে, আল্লাহ তায়ালা যেন তাকে ফিকহশাস্ত্রে ইমাম সিরাজুদ্দিন আল বুলকিনি (রহ.) এর স্তরে এবং হাদিসশাস্ত্রে হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) এর স্তরে পৌঁছে দেন।

প্রসিদ্ধ মুফাসসির আল্লামা ইবনুল আরাবি (রহ.) বলেন, ৪৮৯ হিজরির জিলহজ মাসে আমি মক্কায় অবস্থান করছিলাম। আমি খুব বেশি করে জমজমের পানি পান করতাম। প্রতিবার পানের সময় আমি ইলম ও ঈমানের নিয়ত করতাম। ফলে আল্লাহ তায়ালা এর বরকত আমাকে দান করেন এবং আমি যথাসাধ্য ইলম হাসিল করলাম। কিন্তু আমলের নিয়তে জমজমের পানি পান করতে ভুলে গেলাম। হায়! যদি আমলের নিয়তেও পান করতাম, তবে আল্লাহ আমাকে ইলম ও আমল উভয়টির বরকত নসিব করতেন। কিন্তু তা হলো না। (আহকামুল কোরআন : ৩/৯৮)

আবু বকর মুহাম্মাদ ইবনে জাফর বলেন, হাদিসশাস্ত্রের প্রসিদ্ধ ইমাম ইবনে খুজায়মা (রহ.)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, এত ইলম আপনি কীভাবে অর্জন করলেন? প্রত্যুত্তরে তিনি বললেন, নবীজি (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘জমজমের পানি যে নিয়তে পান করা হয় তা-ই কবুল হয়।’ আর আমি যখন জমজমের পানি পান করেছিলাম, তখন আল্লাহর কাছে উপকারী ইলম প্রার্থনা করেছিলাম। (সিয়ারু আলামিন নুবালা : ১৪/৩৭০)

শায়খ ইয়াহইয়া ইবনে আহমাদ আল আনসারি (রহ.) কোরআন হিফজের নিয়তে জমজমের পানি পান করেন। ফলে তিনি খুবই স্বল্প মেয়াদে কোরআন হিফজ করতে সক্ষম হন।

হাকিম আবু আবদুল্লাহ (রহ.) জমজমের পানি পান করেন উৎকৃষ্ট রচনা সংকলনের নিয়তে। ফলে তিনি ছিলেন স্বীয় যুগের সবচেয়ে ভালো মানের লেখক ও সংকলক। (ফাতহুল কাদির : ২/৩৯৮-৪০০)

কখনো আলেমরা বড় বড় উদ্দেশ্য সামনে রেখে জমজমের পানি পান করতেন। যেমন, হাফিজ ইবনে হাজার (রহ.) বর্ণনা করেন, ইমাম শাফেয়ি (রহ.) তীর নিক্ষেপে পারদর্শিতা অর্জনের নিয়তে জমজমের পানি পান করেন। ফলে প্রতি ১০টি তীরের ৯টিই তিনি লক্ষ্যস্থলে পৌঁছে দিতে পারতেন। (ফায়জুল কাদির : ২/৫০৭)

হাফিজ সাখাওয়ি (রহ.) ইবনুল জাজারি (রহ.)-এর জীবনালোচনায় লেখেন, তার পিতা ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। ৪০ বছর পর্যন্ত কোনো সন্তান লাভ করেননি। এরপর তিনি হজে গেলেন এবং পুণ্যবান সন্তান পাওয়ার নিয়তে জমজমের পানি পান করলেন। পরে এক রাতে সালাতুত তারাবির পর মুহাম্মাদ আল জাজারির জন্ম হয়। আর জ্ঞান-গরিমায়, বিশেষত কিরাতশাস্ত্রে ইবনুল জাজারি (রহ.)-এর যে শীর্ষ অবস্থান ছিল, তা তো বিজ্ঞজনের জানাই আছে। (আল গায়াহ : ১/৫৮)

কোনো কোনো আলেমের ব্যাপারে বর্ণনা পাওয়া যায় যে যখন তিনি জমজমের পানি পান করেন, দোয়া করেন, ইয়া আল্লাহ! আপনার নবী (সা.) আমাদের বলে গেছেন, ‘জমজমের পানি যে নিয়তে পান করা হয় তা-ই কবুল হয়।’ ইয়া আল্লাহ! আমি এই জমজমের পানি পান করছি, যেন কিয়ামত দিবসে তৃষ্ণার্ত না হই। (আখবারু মক্কা : ২/৩২)

এ পানি দাঁড়িয়ে নাকি বসে পান করা সুন্নত?

জমজম পানি সাধারণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে-বসে দুভাবেই পান করা জায়েজ। ভীড় না থাকলে দাঁড়িয়ে পান করা জায়েজ নেই, এমন কথা ঠিক নয়। ভীড় ছাড়াও জমজম পানি দাঁড়িয়ে পান করা যে জায়েজ আছে এ সম্পর্কে ফিকহ-ফাতাওয়ার অনেক কিতাবে এবং হাদিসের শরাহগ্রন্থসমূহে উল্লেখ আছে। যেমন আলমুহীতুল বুরহানী ১/১৭৯; খুলাসাতুল ফাতাওয়া ১/২৫; শরহুল মুনইয়াহ ৩৬; তাবয়ীনুল হাকায়েক ১/৪৪; উমদাতুল কারী ৯/২৭৮; মিরকাতুল মাফাতীহ ৮/১৬৫-১৬৬

উপরন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জমজম পানি দাঁড়িয়ে পান করেছেন-এ হাদিসের ভিত্তিতে বহু ফকীহ ও মুহাদ্দিস জমজম পানি দাঁড়িয়ে পান করাকে উত্তম ও আদব বলেছেন। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন শামসুল আইম্মা হালওয়ানী (রাহ.), শাইখুল ইসলাম খাহারযাদা (রাহ.) (আলমুহীতুল বুরহানী ১/১৭৯), ইবরাহীম হালাবী (রাহ.) (শরহুল মুনইয়াহ ৩৬), মোল্লা আলী কারী (রাহ.) (শরহুশ শামায়েল ১/২৫০)- সহ প্রমুখ ফকীহ ও হাদীসবিশারদ। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মূলত ভীড়ের কারণেই জমজম দাঁড়িয়ে পান করেছেন এটি কোনো সুনিশ্চিত ও চূড়ান্ত কথা নয় এবং তা হাদিস ও আছার দ্বারা প্রমাণিতও নয়; বরং ফিকহ ও হাদিসবিশারদগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দাঁড়িয়ে জমজম পান করার সম্ভাব্য কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে একটি ভীড়ের কারণকেও উল্লেখ করেছেন। তারা আরো যে সমস্ত কারণকে উল্লেখ করে থাকেন তা হলো, ১. জমজম পানি দাঁড়িয়ে পান করাও যে জায়েজ তা বুঝানোর জন্য। ২. বসার যথাযথ ব্যবস্থা না থাকা অর্থাৎ পান করার স্থানটি ভেজা বা স্যাঁতস্যঁতে হওয়ার কারণে তিনি দাঁড়িয়ে পান করেছেন। সুতরাং এসব কারণের মধ্যে শুধু একটিকে গ্রহণ করে বাকিগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া আদৌ ঠিক নয়।

এ পানি পানের দোয়া:

হজরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু এ পানি পান করার সময় একটি দোয়া বর্ণনা করেছেন- ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা ই’লমান নাফিআ’; ওয়া রিযক্বান ওয়াসিআ’; ওয়া আ’মালান সালিহা; ওয়া শিফাআম মিং কুল্লি দা-য়িন।’

অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আপনি আমাদের উপকারী জ্ঞান দান করুন; আমাদের রিজিকে বরকত দিয়ে দিন; আমাদের নেক কাজ করার তাওফিক দান করুন; সকল অসুস্থতাতে শেফা বা সুস্থতা দান করুন।’

 -সেবা হট নিউজ: সত্য প্রকাশে আপোষহীন

,

0 comments

Comments Please