নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা | ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫, বৃহস্পতিবার: দীর্ঘ ১৭ বছরের প্রতিক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে দেশের পথে রয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও আগামীর রাষ্ট্রনায়ক তারেক রহমান।
![]() | |
| অবশেষে দেশের পথে তারেক রহমান: ১৭ বছরের নির্বাসনের অবসান ঘটিয়ে আজ ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন |
সুদীর্ঘ নির্বাসিত জীবনের ইতি টেনে আজ বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) প্রিয় মাতৃভূমির মাটিতে পা রাখতে যাচ্ছেন তিনি। লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে তিনি সপরিবারে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। এই ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ঘিরে দেশজুড়ে বিএনপির নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মাঝে সৃষ্টি হয়েছে এক নজিরবিহীন আবেগ ও উচ্ছ্বাস।
বিএনপি ও লন্ডনস্থ দলীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে, বাংলাদেশ সময় গতকাল বুধবার দিবাগত রাত ১২টায় (লন্ডন সময় সন্ধ্যা ৬টা) বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি নিয়মিত ফ্লাইটে তিনি দেশের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন। তাঁর সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন সহধর্মিণী ডা. জোবাইদা রহমান এবং একমাত্র কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান।
এর আগে বাংলাদেশ সময় বুধবার রাত ৮টা ৫ মিনিটে লন্ডনের কিংস্টন লজের নিজ বাসভবন ত্যাগ করেন তারেক রহমান। রাত ১০টা ১৮ মিনিটে তিনি লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে পৌঁছান। সেখানে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে তিনি বিমানে আরোহণ করেন। বিমানবন্দরে তাঁকে বিদায় জানাতে যুক্তরাজ্য বিএনপির হাজার হাজার নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। এসময় এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
সবকিছু ঠিক থাকলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে বহনকারী উড়োজাহাজটি আজ ২৫ ডিসেম্বর বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করবে। তবে ঢাকায় পৌঁছানোর আগে বিমানটি সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক ঘণ্টার যাত্রাবিরতি করবে। সেখানেও স্থানীয় নেতাকর্মীদের একটি বিশাল অংশ তাঁকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত রয়েছে বলে জানা গেছে।
তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষ্যে রাজধানী ঢাকা সেজেছে নতুন সাজে। বিমানবন্দর থেকে শুরু করে গুলশান পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে ব্যানার, ফেস্টুন ও তোরণে ছেয়ে গেছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পরপরই তাঁকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব দিয়ে নিরাপত্তা ও প্রটোকল সুবিধা প্রদান করা হবে। বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানাবেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যবৃন্দ ও সিনিয়র নেতৃবৃন্দ।
বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, দেশে ফিরে তারেক রহমানের প্রথম ও প্রধান অগ্রাধিকার হলো তাঁর মমতাময়ী মা, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে দেখা। বেগম জিয়া বর্তমানে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
তবে লাখো জনতার ভালোবাসা ও প্রত্যাশার প্রতি সম্মান জানিয়ে বিমানবন্দর থেকে হাসপাতালের পথে একটি সংক্ষিপ্ত বিরতি নেবেন তিনি। রাজধানীর ‘জুলাই ৩৬ এক্সপ্রেসওয়ে’ (সাবেক ৩০০ ফিট) এলাকায় দলের পক্ষ থেকে তৈরি করা একটি গণঅভ্যর্থনা মঞ্চে তিনি অতি সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য যাত্রাবিরতি করবেন। সেখানে সমবেত দেশবাসী ও দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করবেন। এরপর তিনি সরাসরি এভারকেয়ার হাসপাতালে যাবেন এবং মায়ের পাশে কিছু সময় কাটাবেন। হাসপাতাল থেকে তিনি গুলশান এ্যাভিনিউয়ের ১৯৬ নম্বর নিজ বাসভবনে উঠবেন।
দীর্ঘ দেড় যুগ পর তারেক রহমানের এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তন কেবল একটি ব্যক্তিগত বা দলীয় ঘটনা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই প্রত্যাবর্তন সর্বজনীন প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষার মেলবন্ধন।
ইতিহাস সাক্ষী, রাজনীতিতে সময় সবকিছুর উত্তর দিয়ে দেয়। তারেক রহমানের ক্ষেত্রে এই কথাটি আজ ধ্রুব সত্য হয়ে ধরা দিয়েছে। একদিন পাহাড়সম মিথ্যা অভিযোগ আর অপপ্রচার মাথায় নিয়ে চিকিৎসার জন্য তিনি যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমিয়েছিলেন। আজ সেই তিনি আগের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি জনপ্রিয়তা নিয়ে, গণমানুষের নেতা ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হয়ে বীরের বেশে দেশে ফিরছেন।
আরও পড়ুন:

তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন: নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়ে ঢাকবে রাজধানী

অবশেষে ট্রাভেল পাস হাতে পেলেন তারেক রহমান: ২৫ ডিসেম্বর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন চূড়ান্ত
তারেক রহমানের রাজনৈতিক পথচলা কখনোই মসৃণ ছিল না। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের জোট সরকারের আমলে তাঁর বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে বিতর্কের পাহাড় গড়ে তোলা হয়। তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ এবং পরবর্তীতে ১/১১-এর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও সুশীল সমাজের একটি অংশ তাঁকে টার্গেট করে। বনানীর ‘হাওয়া ভবন’কে কেন্দ্র করে ছড়ানো হয় মিথ্যা প্রোপাগান্ডা, যা ছিল মূলত তাঁকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করার গভীর ষড়যন্ত্র।
সবচেয়ে গুরুতর ও স্পর্শকাতর অভিযোগ আনা হয় ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলাকে কেন্দ্র করে। ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় এবং পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সম্পূরক চার্জশিটের মাধ্যমে জোরপূর্বক জবানবন্দি আদায় করে তাঁকে এই হামলার ‘মাস্টারমাইন্ড’ সাজানোর অপচেষ্টা করা হয়। যদিও সময়ের পরিক্রমায় ও আইনি প্রক্রিয়ায় সেসব ষড়যন্ত্র আজ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।
২০০৭ সালের ৭ মার্চ সেনাসমর্থিত সরকারের সময় তিনি গ্রেপ্তার হন। রিমান্ডের নামে তাঁর ওপর চালানো হয় অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। নির্যাতনে তাঁর মেরুদণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর ১১ সেপ্টেম্বর চিকিৎসার জন্য তিনি লন্ডনে যান। সেই যে যাওয়া, এরপর কেটে গেছে ১৭ বছরেরও বেশি সময়। ছুঁয়ে দেখা হয়নি প্রিয় স্বদেশের মাটি।
২০০৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দেশে গণতন্ত্রের পথ রুদ্ধ করা হয়। ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল এবং পরবর্তীতে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে একনায়কতন্ত্র কায়েম করেন শেখ হাসিনা। এই দীর্ঘ সময়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলায় কারারুদ্ধ করা হয়, বাসা থেকে উচ্ছেদ করা হয় এবং চিকিৎসার মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত করা হয়।
২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বেগম খালেদা জিয়ার কারাবরণের পর দলের অস্তিত্ব যখন সংকটের মুখে, ঠিক তখনই আট হাজার মাইল দূর থেকে দলের হাল ধরেন তারেক রহমান। প্রথমে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং পরে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি দলের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন।
যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত জীবনেও ব্যক্তিগত ট্রাজেডি তাঁকে স্পর্শ করেছে। ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোর অকাল মৃত্যু তাঁকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করলেও তিনি ভেঙে পড়েননি। বরং শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে তিনি দলকে তৃণমূল থেকে সংগঠিত করেছেন। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করে তিনি দেশের প্রতিটি প্রান্তের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন। গুম, খুন, হামলা ও মামলার শিকার নেতাকর্মীদের তিনি সাহস জুগিয়েছেন।
তিনি ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে একদফা আন্দোলনের ডাক দিয়ে স্লোগান দিয়েছিলেন, ‘বাংলাদেশ যাবে কোন পথে, ফয়সালা হবে রাজপথে।’ তাঁর এই ধীরস্থির ও কৌশলী নেতৃত্বই বিএনপিকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করে আজকের এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে।
আজকের তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ব্যাপক কৌতূহল। দীর্ঘ সময় বিদেশে থাকলেও দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং রাজনৈতিক নির্দেশনায় তিনি প্রমাণ করেছেন যে, তিনি মাটির কাছাকাছি থাকা নেতা। দলের কর্মী-সমর্থকরা তাঁর মাঝে খুঁজে পান আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ছায়া।
নেতাকর্মীরা বলছেন, একজন নেতার মূল শক্তি তাঁর সততা, ন্যায়বোধ ও ভিশন। তারেক রহমান দূর থেকেও দেশের মানুষের সবচেয়ে কাছের মানুষে পরিণত হয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং মানবাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে বলে দেশবাসী বিশ্বাস করে।
আজ ২৫ ডিসেম্বর, বাংলাদেশের আকাশ-বাতাস মুখরিত হবে ‘তারেক রহমান স্বাগত’ স্লোগানে। এই প্রত্যাবর্তন দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েনের অবসান ঘটিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা ও সহনশীলতার এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে—এমনটাই প্রত্যাশা সকলের।
সূত্র: /সেবা হট নিউজ: সত্য প্রকাশ্যে আপোষহীন
জাতীয়- নিয়ে আরও পড়ুন

পদত্যাগ করলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী খোদা বকশ চৌধুরী

দিনভর নাটকীয়তা ও তালাবদল: আন্দোলনের মুখে অবশেষে পদত্যাগ করলেন রাবির ৬ ডিন

দেশে পৌঁছেছে শহীদ ওসমান হাদির মরদেহ, জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জানাজা

না ফেরার দেশে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদি

আজ মহান বিজয় দিবস: বিশ্ব মানচিত্রে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর ৫৪ বছর


খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।