ইরানের ভয়ংকর হামলার বর্ণনা দিলো মার্কিন সেনারা

ইরানের ভয়ংকর হামলার বর্ণনা দিলো মার্কিন সেনারা
সেবা ডেস্ক: ইরাকে অবস্থিত দু'টি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে গত ৮ জানুয়ারী রাতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বর্ণনা দিয়েছেন সেখানে অবস্থানরত সেনারা। পূর্বপ্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও সেদিন একটি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতও ঠেকাতে পারেনি তারা। ৩ জানুয়ারি ইরাকের বাগদাদে ইরানি জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার প্রতিশোধে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান।

বুধবার ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি’র একটি প্রতিবেদনে সেই হামলা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন মার্কিন সেনারা। 

ইরাকের আইন আল আসাদ ঘাঁটিতে যৌথ বাহিনী আয়োজিত গণমাধ্যমের পরিদর্শন অনুষ্ঠানে সেদিন ঘটনাস্থলে থাকা মার্কিন সেনাদের সঙ্গে কথা বলে এএফপি। মার্কিন সেনাদের বক্তব্যে সেদিনের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের অসহায়ত্বের চিত্রই ফুটে ওঠে। আকাশে নজরদারি থাকা সত্ত্বেও সেদিনের হামলা ঠেকাতে পারেনি তারা। হামলার কয়েক ঘণ্টা পুরো বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিল ঘাঁটি। এমনকি তাদের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন যোগাযোগব্যবস্থাও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় সেদিন, ফলে আকাশের শক্তিশালী নজরদারির নিয়ন্ত্রণও হারায় সেনারা।

এএফপি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৮ জানুয়ারি স্থানীয় সময় দিবাগত রাত ১টা ৩৫ মিনিটে বিমান ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ে ইরান। সেদিন ঘাঁটিতে মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনী মোতায়েন ছিল। ঘাঁটিতে নজরদারি রাখার জন্য সে সময় মার্কিন সেনাদের সাতটি ড্রোন, মানবশূন্য যান আনম্যান্ড এরিয়াল ভেহিকেলস (ইউএভিএস) ইরাকের আকাশজুড়ে উড়ছিল। এতে যুক্ত ছিল এমকিউ-১ সি গ্রে ঈগলস নামের অত্যাধুনিক নজরদারি ড্রোন যেগুলো ২৭ ঘণ্টা পর্যন্ত উড়তে পারে এবং একই সময়ে সর্বাধিক চারটি ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতে পারে।

ঘাঁটির এক পাইলট স্টাফ সার্জেন্ট কসটিন হেরউইগ (২৬) বলেন, ইরানের পক্ষ থেকে হামলা হতে পারে এমনটা ধারণা ছিল আমাদের। তাই আমরা ড্রোনগুলো চালু রেখেছিলাম।

মার্কিন ঘাঁটিতে যখন প্রথম ক্ষেপণাস্ত্রটি ছোঁড়া হয়, তখন গ্রে ঈগল চালাচ্ছিলেন হেরউইগ। হামলার আগাম সতর্কতার নির্দেশ পেয়ে ঘাঁটির প্রায় দেড় হাজার সেনার বেশির ভাগই দুই ঘণ্টা ধরে বাঙ্কারে অবস্থান নিয়েছিল। তবে কালো ভার্চ্যুয়াল ককপিটে বসে যানগুলোকে রিমোট কন্ট্রোল দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করছিল ১৪ জন পাইলট। উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ক্যামেরায় চোখ রেখে চারপাশের পরিস্থিতি দেখছিলেন তারা।

হেরউইগ বলেন, প্রথম ক্ষেপণাস্ত্রটি তাদের শেল্টারে আঘাত হানে। তবে পাইলটরা আগের অবস্থান থেকে সরতে পারেনি আগের অবস্থানেই থাকতে হয়েছিল তাদের। এরপর ঘাঁটির ওপর একের পর এক আঘাত চলতে থাকে। সেসময়ে প্রাণে বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়ে ভাগ্যকে বরণ করতে তৈরী ছিলেন তিনি।

ফার্স্ট সার্জেন্ট ওয়েসলে কিলপ্যাট্রিক বলেন, শেষ ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার প্রায় এক মিনিট আগে আমি পেছন দিক দিয়ে বাঙ্কারের দিকে যাচ্ছিলাম, কিন্তু তখন দেখলাম আমাদের ফাইবার লাইনগুলো জ্বলছে। ওই লাইনগুলো ভার্চ্যুয়াল ককপিট থেকে এন্টেনা এবং স্যাটেলাইটের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। এর মাধ্যমে গ্রে ঈগলসে সিগনাল পাঠানো হতো এবং ক্যামেরা থেকে পাওয়া ফিডব্যাক আইন আল-আসাদ ঘাঁটির স্ক্রিনে চলত।



কিলপ্যাট্রিক আরো বলেন, ফাইবার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় সেখানে আর কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না আমাদের। ফলে সেনারা ড্রোনগুলোর অবস্থান শনাক্ত করতে পারছিল না। এছাড়া আকাশে-মাটিতে কোথায় কী ঘটছে সে সম্পর্কেও কিছুই জানতে পারছিল না তারা। সেই সময়ে পরিস্থিতি সম্পর্কে পুরো অন্ধকারে চলে যায় তারা।

তখন এমন একটা সময় ছিল যে, কোনো ড্রোনকে যদি ভূপাতিত করাও হত তবু আইন আল-আসাদে অবরুদ্ধ থাকা সেনারা জানতে পারত না। হেরউইগ বলেন, ড্রোন ভূপাতিত হওয়া অনেক বড় একটা ব্যাপার। প্রথমত এটি অনেক ব্যয়বহুল এছাড়া এতে এমন কিছু জিনিস রয়েছে যা অন্যের হাতে পড়ুক বা শত্রুপক্ষের হাতে পড়ুক সেটি আমরা চাই না।

২০১৯ সালের মার্কিন সামরিক বাজেট অনুযায়ী, একটি গ্রে ঈগলের দাম ৭০ লাখ মার্কিন ডলার (৫৯ কোটি ২৯ লাখ টাকার বেশি)। ইরাকে মোতায়েনরত মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনী ২০১৭ সাল থেকে এটি ব্যবহার করছে।

ইরাকের আকাশে ড্রোন ও উড়োজাহাজ ওড়ানোর জন্য যৌথ বাহিনী ইরাকি সরকারের কাছে সবুজ সংকেত পায়। তবে ইরান হামলা চালানোর কয়েক দিন আগে ওই অনুমোদনের সময়সীমা পেরিয়ে গেছে। তবুও ইরাকের আকাশে ড্রোন চালানো অব্যাহত রেখেছে মার্কিন বাহিনী।

৮ জানুয়ারি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার একপর্যায়ে পাইলটরাও বাঙ্কারে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। তবে হামলা বন্ধ হওয়া মাত্রই তারা দ্রুতভাবে গ্রে ঈগলসের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করে। ভোর হলে সেনারা পুড়ে যাওয়া ফাইবারের ৫০০ মিটার পর্যন্ত প্রতিস্থাপন করতে সক্ষম হন। ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে আইন আল-আসাদ ঘাঁটিতে গর্ত তৈরি হয়ে যায়। এছাড়া সেখানকার নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার ফাঁকা পড়ে থাকে।

হেরউইগ বলেন, এয়ারক্র্যাফট অবতরণের জায়গাও বন্ধ করে দেয়া হয়, ফলে কারো সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই সেগুলোকে অন্যত্র অবতরণ করাতে হয়। বাকি এয়ারক্রাফট কোথায় আছে আমরা সেটি জানতামও না। ওই সময়টা আমাদের জন্য অনেক বেশী উদ্বেগজনক ছিল।

ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর মার্কিন সেনাদের জন্য বেশী প্রয়োজনীয় ছিল গ্রে ঈগলকে অবতরণ করানো। উদ্বেগজনক পর্যায়ে জ্বালানি কমে যাওয়া পর্যন্ত সেগুলোকে আকাশে উড়তে হয়েছিল। পৃথকভাবে ড্রোন অবতরণ করাতে পাইলটদের কয়েক ঘণ্টা লাগে। শেষ ড্রোনটিকে সকাল নয়টায় অবতরণ করানো হয় বলে জানা গেছে।

 -সেবা হট নিউজ: সত্য প্রকাশে আপোষহীন

0 comments

Comments Please

আপনার মূল্যবান মতামতের জন্য সেবা হট নিউজ পরিবারের পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

সেবা হট নিউজ : সত্য প্রকাশে আপোষহীন