বঙ্গবন্ধু টানেল: স্বপ্ন পূরণের পথে আরেক ধাপ

বঙ্গবন্ধু টানেল স্বপ্ন পূরণের পথে আরেক ধাপ


সেবা ডেস্ক: কর্ণফুলী নদীর তলদেশে স্বপ্নের বঙ্গবন্ধু টানেল নির্মাণে এখন রীতিমতো বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বৃহৎ এই প্রকল্পের কাজ শেষ করতে রাত-দিন কাজ চলছে। সুখবর হচ্ছে, টানেলের দুটি টিউবের একটির বোরিং অর্থাৎ খননকাজ ইতোমধ্যেই শেষ হয়েছে। আগামীকাল শুক্রবার কিংবা পরশু শনিবার টানেলের দ্বিতীয় সুড়ঙ্গপথ নির্মাণের কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। চীনের সাংহাইয়ের 'ওয়ান সিটি টু টাউনের' আদলে বন্দরনগরী চট্টগ্রামকে গড়ে তুলতে এতদিন যে স্বপ্নের কথা বলা হচ্ছিল, টানেল নির্মাণ প্রকল্পের অগ্রগতির মাধ্যমে সেই স্বপ্নও এখন পূরণ হতে যাচ্ছে। গর্ব করার মতো টানেলটি নির্মাণের ফলে দেশের দক্ষিণ-পূর্বে গড়ে উঠবে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা।

প্রকল্প-সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পদ্মা সেতুর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অন্যতম একটি অগ্রাধিকার প্রকল্প হচ্ছে 'বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল' নির্মাণ। ১০ হাজার কোটি টাকায় এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশের অন্যতম এই টানেলের ৬০ ভাগ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টানেলের দ্বিতীয় টিউবের বোরিং কাজ দ্রুত শেষ করতে চাইছেন প্রকল্প-সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা। এজন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে। প্রথম টিউবটি থেকে ১২ মিটার দূরত্বে দ্বিতীয় টিউব নির্মাণ করা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম শহরের পতেঙ্গা নেভাল একাডেমি থেকে কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে টানেলের প্রথম টিউব নির্মাণে বোরিং কাজ শুরু হয়ে জেলার আনোয়ারা প্রান্তে গিয়ে শেষ হয়। তবে দ্বিতীয় টিউব নির্মাণে বোরিং কাজ শুরু করা হবে আনোয়ারা প্রান্ত থেকে এবং শেষ হবে পতেঙ্গা প্রান্তে। প্রতিটি টিউব চওড়ায় ৩৫ ফুট এবং উচ্চতায় প্রায় ১৬ ফুট। প্রতিটি টিউবে দুটি করে লেন রাখা হয়েছে।

'টানেল বোরিং মেশিন' (টিবিএম) নামের তিনতলার সমান উচ্চতার ক্যাপসুল আকারের একটি 'যন্ত্রদানব' ব্যবহার করে নদীর তলদেশ খনন করে সুড়ঙ্গপথ নির্মাণ করা হচ্ছে। নদীর এক প্রান্তের স্থলভাগ থেকে সুড়ঙ্গপথ খননের কাজ শুরু হয়ে ধীরে ধীরে তা নদীর গভীরে যায়। এরপর সেটি পুনরায় অপর প্রান্তে গিয়ে ওঠে। নদীর ১৮ মিটার থেকে ৪৩ মিটার পর্যন্ত গভীরে নির্মাণ করা হচ্ছে সুড়ঙ্গপথ। এ কারণে কর্ণফুলী নদীর পানি প্রবাহে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটাবে না এই সুড়ঙ্গপথ। তিন দশমিক চার কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সুড়ঙ্গপথটির এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি অর্থাৎ প্রায় আড়াই কিলোমিটার পথ নদীর নিচে থাকছে। একটি সুড়ঙ্গ দিয়ে চট্টগ্রাম নগরী অংশের পতেঙ্গা নেভাল থেকে আনোয়ারা প্রান্তে এবং আরেকটি পথ দিয়ে জেলার আনোয়ারা থেকে পতেঙ্গা প্রান্তে যানবাহন চলাচল করবে।

বঙ্গবন্ধু টানেল প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হারুনুর রশিদ চৌধুরী  বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলের প্রথম টিউবের বোরিং কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রকল্পের ৬০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। দ্বিতীয় টিউবের বোরিং কাজও ১১ কিংবা ১২ ডিসেম্বর শুরু করা হবে। এজন্য আমরা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়েছি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করতে আমরা দিন-রাত কাজ করছি।

এদিকে টানেল নির্মাণের পাশাপাশি সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজও সমানতালে এগিয়ে চলছে। টানেলের আনোয়ারা প্রান্তে পাঁচ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক এবং ৭২৭ মিটারের একটি ওভারব্রিজ নির্মাণ করা হচ্ছে।

কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ী এলাকায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে গভীর সমুদ্রবন্দর, কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, এলএনজি স্টেশনসহ জ্বালানিভিত্তিক শিল্পকারখানা গড়ে উঠছে। বঙ্গবন্ধু টানেল সেগুলোর সঙ্গে পুরো বাংলাদেশের যোগাযোগ সহজ করবে। আনোয়ারায় নির্মাণাধীন চায়না অর্থনৈতিক অঞ্চল, কোরিয়ান ইপিজেডসহ অন্যান্য শিল্পকারখানার সঙ্গেও যোগাযোগ ব্যবস্থা সুগম হবে। বিশেষ করে সময়-দূরত্ব কমে আসবে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে কক্সবাজারে চলাচলে। টানেলের চারটি লেন দিয়ে ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার গতিতে গাড়ি চলাচল করতে পারবে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে সিটি আউটার রিং রোড দিয়ে কর্ণফুলী নদীর পতেঙ্গা প্রান্ত হয়ে টানেলে প্রবেশ করে আনোয়ারা প্রান্ত হয়ে পটিয়া-আনোয়ারা-বাঁশখালী সড়কের চাতরী চৌমুহনী পয়েন্টে ওঠা যাবে। আবার টানেল ঘিরে নদীর দক্ষিণপাড়ে গড়ে উঠবে চট্টগ্রাম সিটির দ্বিতীয় টাউন। এ নিয়ে দক্ষিণ চট্টগ্রামে তৈরি হয়েছে অমিত সম্ভাবনা।

২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি কর্ণফুলী তলদেশে টানেল নির্মাণে বোরিং অর্থাৎ খননকাজের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই দিনই প্রকল্প সাইট পরিদর্শন করেন তিনি। মূলত এর আগে নানা আনুষঙ্গিক কার্যক্রম চালানো হলেও সেদিন থেকে টানেল নির্মাণে নদীর তলদেশে সুড়ঙ্গপথ তৈরির কাজ শুরু হয়। এরপর থেকে চলতে থাকে বিশাল কর্মযজ্ঞ। চলতি বছরের ৬ আগস্ট পর্যন্ত প্রথম টিউব নির্মাণের কাজ শেষ হয়। এখন দ্বিতীয় টিউব নির্মাণে বোরিং কাজ শুরু করতে নতুন করে কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে।

২০১৭ সালের ১৪ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং বঙ্গবন্ধু টানেল নির্মাণ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। গত বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টানেলের প্রথম টিউবের বোরিং কাজের উদ্বোধন করেন। কিন্তু করোনার কারণে মাঝে কিছুদিন প্রকল্পের কাজ গতি হারায়। তবে চলতি বছরের ৬ আগস্ট প্রথম টিউবের কাজ শেষে দ্বিতীয় টিউব নির্মাণে তোড়জোড় শুরু হয়। ২০২২ সালের মধ্যে টানেলের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

শেয়ার করুন

-সেবা হট নিউজ: সত্য প্রকাশে আপোষহীন

0 comments

মন্তব্য করুন

খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।