সিন্ডিকেট দালালের দৌরাত্ম্যে হারিয়ে যেতে বসেছে দেশীয় লবণশিল্প

সিন্ডিকেট দালালের দৌরাত্ম্যে হারিয়ে যেতে বসেছে দেশীয় লবণশিল্প


হুমকীর মুখে লবণ খাত: ন্যায্যমূল্য না পেয়ে হতাশ বাঁশখালীর চাষীরা

বাঁশখালীতে শতশত মেট্রিকটন লবণের মজুদ,ন্যায্য মুল্য না পাওয়ায় হতাশায় ভূগছে উপকূলের লবণচাষিরা।

শিব্বির আহমদ রানা, বাঁশখালী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি: লবণ বাংলাদেশের একটি স্বনির্ভর খাত। দেশের দক্ষিণপূর্ব অঞ্চল কক্সবাজার জেলা ও চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালীতেই শুধু লবণ উৎপাদন হয়ে থাকে। বছরের নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময় লবণ উৎপাদনের মৌসুম। প্রতিবছর এই সময়ের মধ্যে চাষিরা হাঁড়ভাঙা পরিশ্রম করে লাখ লাখ মে.টন লবণ উৎপাদন করে দেশকে লবণে স্বনির্ভর করে তোলে। লবণ সংশ্লিষ্টদের মতে দেশের উৎপাদিত লবণ বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব হলেও নীতিমালার অভাবে তা হচ্ছে না। স্বতন্ত্র লবণ নীতিমালা না থাকার কারণে দেশের অন্যতম স্বনির্ভর লবণ খাতটি এখন হুমকির মুখে পড়েছে। বাঁশখালীতে পুইছড়ি, ছনুয়া, শেখেরখীল, গন্ডামারা, চাম্বলের ডিপুটিঘোনা, শীলকুপের পশ্চিম মনকিচর, সরল, মিনজির তলা, কাথরিয়া, খানখানাবাদ (আংশিক) এলাকায় লবণের ব্যাপক উৎপাদন হয়ে থাকে। চলতি বছরের লবণ উৎপাদনের ভরা মৌসুমেও মাঠে নেই সহস্রাধিক লবণ চাষী। লবণের ন্যায্য মুল্য না পেয়ে হতাশ প্রান্তিক ও বর্গাচাষীরা মাঠ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। উচিত মুল্য না পাওয়াতে গত মৌসুমের শতশত মেট্রিকটন লবণ এখনো চাষীদের নিয়ন্ত্রণে মজুদ রয়েছে।

বাঁশখালী উপকূলীয় অঞ্চলে অপরিশোধিত লবণের ব্যাপক উৎপাদন এখন ব্যাহত। লবণ চাষাবাদে আড়াই মাস অতিবাহিত হয়েছে। লবণের সন্তোষজনক দাম না পেয়ে হতাশ চাষিরা। বর্তমান লবণের দাম আরো কমে গেলে বড় ধরণের ক্ষতির সম্মুখীন হবে বলে প্রান্তিক চাষীদের অভিযোগ। জানা যায়, গত বছর লবণ চাষীরা মণপ্রতি পাইকারী আড়াইশ থেকে ৩শ টাকা পর্যন্ত লবণের দাম পেয়েছিল। লাভবান হয়েছিল জমির মালিক, প্রান্তিক চাষী, খুচরা ও পাইকারী লবণ ব্যবসায়ীরা। এদিকে
বর্তমানে লবণের দাম মণপ্রতি দেড়শত টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১শত ৯০ টাকা। গত বছর প্রান্তিক চাষীরা প্রতিকানি মাঠ বর্গা নিয়েছেন সর্বনিম্ন ১৩ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। মৌসুমের প্রথমে কানিপ্রতি ১০ হাজার জমির লাগিয়ত পেলেও বর্তমানে কানি প্রতি বর্গা নিয়েছেন সর্বনিম্ন আড়াই হাজার থেকে সর্ব্বোচ্চ ৪ হাজার টাকা। তার পাশা পাশি রয়েছে শ্রমিক, পলিথিন ক্রয়সহ আনুসাঙ্গিক খরচ। প্রতি কানিতে লবণ উত্তোলণ হয় ছয় মাসে ২শত মণ থেকে শুরু করে আড়াই শত মণ পর্যন্ত। যার কারণে বর্তমান লবণের দাম আর খরচ প্রায় সমান পর্যায়ে। দাম আরো কিছু কমলে ক্ষতির সম্মুক্ষীন হবে চাষীরা। বর্তমান দামে আশঙ্কা করছে লবণ চাষী-ব্যবসায়ীরা।

উপকূলীয় অঞ্চলের অধিকাংশ লোকের জীবন ও জীবিকা নির্বাহ লবণচাষের সাথে জড়িত। উপকূলের চাষিরা জানায়, গত মৌসুমের উৎপাদিত লবণ অবিক্রিত রয়ে গেছে, হাজার হাজার মেট্রিকটন। উৎপাদিত লবণের অস্বাভাবিক দর পতন হলেও পেটের তাগিদে চাষিরা বাধ্য হয়ে কম দামে লবণ বিক্রি করে চালাচ্ছে সংসার। জমির মালিক ন্যায্য দামে পাচ্ছেনা লাগিয়ত, অনেক বর্গাচাষী ও প্রান্তিক চাষীরা লবণ মাঠ থেকে বিমূখ হয়ে পড়েছে।

জানা গেছে, দেশের বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী চট্টগ্রামের বাশঁখালীতে কয়েকটি ইউনিয়ন জুড়েই লবণ উৎপাদন হয়ে আসছে। সরকারি হিসাবে প্রতিবছর নভেম্বরের ১৫ থেকে পরবর্তী বছরের মে মাসের ১৫ তারিখ পর্যন্ত লবণ উৎপাদন মৌসুম ধরা হয়। এই সাত মাসের মধ্যে সম্পূর্ণ আবহাওয়ার উপর নির্ভরশীল হয়েই বছরের পর বছর ধরে হাজার হাজার চাষি তাদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দেশের লবণ উৎপাদন করে আসলেও সেই চাষিদের কোনো খবর কেউ রাখে না। এদের জীবন জীবীকার একমাত্র উৎস যখন লবণের মাঠ, বাপ দাদার আমল থেকে যাদের লবণচাষ করে চলে সংসার তারা বার বার প্রতারিত হয়। পায় না ন্যায্য মুল্য। কুচক্রি পাইকারের কাছে মণপ্রতি লবণে ৭ থেকে ১০ কেজী বেশী গুণতে হয়। শ্রমিকের মজুরী, জমির লাগিয়তসহ সব মিলে লোকসানের মাশুল গুনতে হয় লবণচাষীদের। 

প্রান্তিক লবণচাষিরা প্রতিবেদককে জানায়, 'পাইকারি লবণের দাম একেবারে কমে গেলেও পাইকাররা করছে আরো জুলুম। তারা লবণের ঘাটতির নাম করে প্রতিমণে ৭ থেকে ১০ কেজি লবণ বেশি নিচ্ছেন। তারা বলেন, একে তো লবণের দাম কম তার উপর প্রতিমণে ফড়িয়া বা দালালরা লবণের ঘাটতির নামে অতিরিক্ত লবণ নিয়ে চাষিদের আরো ঠকাচ্ছেন।

গন্ডামারার বড়ঘোনার লবণ চাষী ও ব্যবসায়ী মু. আনোয়ার বলেন, 'তিনি দীর্ঘ বছর ধরে ১০/১৫ কানি লবন চাষাবাদ করে যাচ্ছেন। বিগত বছরের তুলনায় চলতি মৌসুমে লবনের দাম কমে যাওয়ায় বর্তমানে হতাশায় ভোগছেন চাষী ও ব্যবসায়ীরা।'

গন্ডামারা লবণ উৎপাদনকারী সমবায় সমীতির সাধারণ সম্পাদক আমির হোসাইন বলেন, 'লবণ চাষীরা এমনিতেই বর্গা নিয়ে লবণ চাষ করে। তার মাঝে দাম কমে যাওয়ায় চাষীরা হতাশ হচ্ছেন। বর্তমানে লবণের অন্যায্যমুল্যে ক্ষতির সম্মুখীন চাষী ও জমির মালিকেরা। গন্ডামারা একটি উপকূলীয় এলাকা। এখানকার লোকদের জীবন ও জীবিকার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে লবণ চাষ। এখানে এস.আলমের বৃহত্তম কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ চলমান। প্রায় ১হাজার কানি লবণ উৎপাদনের উপযুক্ত জমি অধিকৃত হয়েছে। আরো প্রায় ১হাজার কানি লবণচাষের মাঠ রয়েছে। বতর্মানে লবণের মুল্য কমে যাওয়ায় মাঠের লাগিত গত বছরের তুলনায় খুবই কম। প্রান্তিক চাষীদের অনেকেই মাঠ ছেড়ে দিয়েছে। দিন দিন লবণ শিল্প থেকে বিমূখ হচ্ছে চাষীরা। এভাবে অন্যায্যমূল্যের কারণে একসময় হারিয়ে যাবে লবণ শিল্প এমনটাই ধারনা করেন তিনি।' তিনি আরো জানান, 'কিছু কতিপয় ব্যবসায়ীরা বিদেশ থেকে লবণ আমদানী করে এনে দেশীয় লবণের দাম কমিয়ে ফেলছে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে চাষী ও ব্যবসায়ীদের আশা হবে গুড়েবালি।

শেয়ার করুন

-সেবা হট নিউজ: সত্য প্রকাশে আপোষহীন

1 comments

মন্তব্য করুন

খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।

Dara Computer Laptops