পানি নাপাক হলে পবিত্র করবেন যেভাবে!

পানি নাপাক হলে পবিত্র করবেন যেভাবে!



: সকল কিছুর জীবনের মূল উৎস হলো পানি। তাই 'পানির অপর নাম জীবন' বলে আখ্যায়িত করা হয়। যদি কুয়া, ঝরনা প্রভৃতি পানির উৎস শুকিয়ে ভূগর্ভে মানুষের সাধ্যের বাইরে চলে যায়, তাহলে কারো সাধ্য নেই যে সেই পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন পানির ব্যবস্থা করে দেবে। অথচ একদিকে আমরা বিভিন্নভাবে পানির আধারগুলোকে দূষিত করছি; অন্যদিকে মানুষের ব্যবহার যোগ্য পানির অপচয় করছি।


এক হাদিসে এসেছে, ‘একবার রাসূল (সা.) হজরত সাদ (রা.) এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। হজরত সাদ (রা.) এ সময় ওজু করছিলেন। তার ওজুতে পানি বেশি খরচ হচ্ছিল। রাসূল (সা.) দেখে বললেন, কেন এই অপচয়? সাদ (রা.) আরজ করলেন, ওজুতেও কি অপচয় হয়? রাসূল (সা.) বললেন, হ্যাঁ, এমনকি বহমান নদীতে ওজু করলেও। (সুনানে ইবনে মাজাহ)



 

অতএব পানি ও পানির আধারগুলোর হেফাজত আমাদের সকলের দ্বীনি কর্তব্য। এখানে আলোচনা হবে বিভিন্ন পানির আধার পাক-নাপাক হওয়া ও এর সঙ্গে সম্পৃক্ত মাসআলা নিয়ে-


পানির ট্যাংকি পবিত্র করার পদ্ধতি


বর্তমানে শহর বন্দরে, ঘরের ভিতরেই টয়লেট, গোসলখানা থাকে। পাইপের সাহায্যে এগুলোতে ট্যাংকি থেকে পানি সরবরাহ করা হয়। কোথাও নিচের ট্যাংকিতে ওয়াসার পানি জমা হয়; তারপর সেখান থেকে ছাদের ট্যাংকিতে উঠানো হয়। কোথাও নিজস্ব পাম্পের সাহায্যে সরাসরি পানি উপরের ট্যাংকিতে উঠানো হয়। প্রশ্ন হলো, এ রকম ট্যাংকি, যা সাধারণত একশ বর্গহাত থেকে ছোট হয়, তাতে অপবিত্র বস্তু পড়লে নাপাক হবে কিনা। আর যদি নাপাক হয় তাহলে পবিত্র করবো কিভাবে?


নাপাক পড়ার সময় ট্যাংকির পানির কয়েকটা অবস্থা হতে পারে; নিম্নে প্রত্যেক অবস্থার হুকুম ভিন্ন ভিন্নভাবে উল্লেখ করা হলো-


(১) ট্যাংকিতে পানি আসা-যাওয়া অবস্থায় নাপাক পড়া


নিচের হাউজ অথবা উপরের ট্যাংকিতে নাপাক পড়লো এমন অবস্থায়, যখন একদিক দিয়ে পানি আসছে আর অপর পাশ দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে। যেমন ওয়াসার পাইপ দিয়ে নিচের হাউজে পানি এসে জমা হচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে পাম্পের সাহায্যে সেই পানি উপরের ট্যাংকিতে উঠানো হচ্ছে। গোসলখানা ও টয়লেটের কল দিয়ে সেই পানি বেরও হয়ে যাচ্ছে। তাহলে অধিকাংশ ফকীহের মতে এই পানি বহমান পানির হুকুমে। তাই নাপাক পড়া দ্বারা পানি নাপাক হবে না। তবে নাপাক পড়ে যদি পানির গুণাগুণ তথা-স্বাদ, রঙ ও গন্ধের কোনো একটি পরিবর্তন হয়ে যায় তাহলে নাপাক হয়ে যাবে। ফিকহের প্রসিদ্ধ কিতাব ‘খুলাসাতুল ফতোয়া’ এ আছে, ‘আল্লামা তাহের আলবুখারি (রাহ.) বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি নাপাক হাত দিয়ে সরাসরি হাউজ থেকে পানি নিলে, হাউজ হলো এমন যার একদিক দিয়ে পানি আসছে আর বহু মানুষ হাত দিয়ে তা থেকে পানি নিচ্ছে তাহলে হাউজের পানি নাপাক হবে না। (খুলাসাতুল ফতোয়া, খন্ড-১, পৃষ্ঠা-৫) ট্যাংকির উল্লেখিত সূরতেও যেহেতু একদিক দিয়ে পানি আসছে আর সঙ্গে সঙ্গে অন্যদিক দিয়ে খরচ হয়ে যাচ্ছে, তাই সমকালিন ফকীহগণ হাউজের উক্ত মাসআলার ওপর কিয়াস করে, ট্যাংকির ব্যাপারে এই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।


এখন রইলো ট্যাংকির পানির রঙ, স্বাদ ও গন্ধ পরিবর্তন হলে নাপাক হওয়ার দলিল। ফতোয়ার প্রসিদ্ধ কিতাব ‘ফতোয়ায়ে উসমানি’-তে বলা হয়েছে, ‘পানি যদি অধিক হয় তাহলে নাপাক পড়া দ্বারা তা নাপাক হবে না। তবে যদি পানির রঙ, গন্ধ ও স্বাদ পরিবর্তন হয়ে যায়। (ফতোয়ায়ে উসমানি, খন্ড-১, পৃষ্ঠা-৩৫৮) ট্যাংকির উল্লেখিত সূরত যেহেতু অধিক পানির হুকুমে তাই তারও একই বিধান।


(২) ট্যাংকিতে পানি আসা যাওয়া বন্ধ হয়ে স্থির অবস্থায় নাপাক পড়া


হাউজে পানি আসা যাওয়া বন্ধের বিভিন্ন অবস্থা হতে পারে, যেমন- পানি আসা ও বের হওয়ার উভয় রাস্তা বন্ধ কিংবা আসা বা বের হওয়ার কোনো একটি রাস্তা বন্ধ। উভয় অবস্থায়, অধিকাংশ ফকীহগণের মতে ট্যাংকির পানি নাপাক হয়ে যাবে। কারণ, ফকিহগণ বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তি নাপাক হাত দিয়ে সরাসরি হাউজ থেকে পানি নিলে, হাউজ হলো এমন, যার পানি স্থির; কোনো দিক দিয়ে পানি আসছে না এবং মানুষও কলস ইত্যাদি দিয়ে পানি নিচ্ছে না তাহলে হাউজের পানি নাপাক হয়ে যাবে। আর যদি পাইপ দিয়ে পানি আসে কিন্তু মানুষ না নেয় বা তার উল্টোটা হয় তাহলে পাক নাপাকের ব্যাপারে মতবিরোধ আছে। তবে অধিকাংশের মতে এই হাউজের পানি নাপাক। (শরহে মুনিয়া, পৃষ্ঠা-৯৯)


ট্যাংকি পাক করার পদ্ধতি


নাপাক দু,ধরনের; দেহ বিশিষ্ট ও দেহ ছাড়া। দেহ বিশিষ্ট নাপাক ট্যাংকিতে পড়লে পাক করার পদ্ধতি হলো, প্রথমে ঐ নাপাক বস্তুটা উঠিয়ে ফেলে দিতে হবে। তারপর একদিক দিয়ে পানি ছেড়ে, অন্যদিক দিয়ে বের করে ফেললেই পাইপ সহ ট্যাংকি পাক হয়ে যাবে। তবে এক্ষেত্রে সতর্কতা হলো, মটর ছেড়ে ঐ পরিমাণ পানি ফেলবে, যতটুকু পানি নাপাক পড়ার সময় ছিলো। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত মূফতী হজরত শফী (রাহ.) এর মত নিচে তুলে ধরা হলো। তিনি লেখেন, ‘ট্যাংকি নাপাক হলে পাক করার পদ্ধতি হলো, দেহ বিশিষ্ট নাপাক পতিত হলে প্রথমে তা উঠিয়ে ফেলে দিতে হবে। তারপর উভয় দিক থেকে পানি বইয়ে দিতে হবে। অপর দিক দিয়ে পানি বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাইপসহ ট্যাংকি পাক হয়ে যাবে। নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি বের করা জরুরি নয়। তবে কোনো কোনো ফকিহের মতে তিনবার আর কারো কারো মতে একবার ট্যাংকির সমপরিমাণ পানি ফেলে দিলে পাক হবে। তাই সতর্কতা হলো, একদিক দিয়ে ট্যাংকিতে পানি দিয়ে, অন্যদিক দিয়ে ঐ পরিমাণ পানি বের করে ফেলবে, যতটুকু নাপাক পড়ার সময় ট্যাংকিতে ছিলো। (জাওয়াহিরুল ফিকহ, খন্ড-৭, পৃষ্ঠা-৪৭৩)


ট্যাংকির পানি দ্বারা ধৌতকৃত কাপড় ও আদায়কৃত নামাজের হুকুম

 

(১) ট্যাংকিতে যদি নাপাক বস্তু পাওয়া যায় এবং জানা না থাকে তা কখন পড়েছে, এমতাবস্থায় যদি তা না ফুলে বা না ফাটে তাহলে পূর্বের একদিনের নামাজ পুনরায় আদায় করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে ঐ সময়ে ধৌত করা কাপড়- বাসন ইত্যাদিও পুনরায় ধৌত করতে হবে।


(২) ট্যাংকিতে পড়ে যদি ফুলে বা ফেটে যায় তাহলে পূর্বের তিন দিনের নামাজ পুনরায় আদায় করতে হবে এবং ঐ সময়ে উক্ত ট্যাংকির পানি দ্বারা ধৌতকৃত সকল বস্তু আবার ধৌত করতে হবে। এ প্রসঙ্গে ফিকহের প্রসিদ্ধ কিতাব ‘গুনিয়াতুল মুতামাল্লি শরহে মুনয়াতিল মুসল্লি’ এর বক্তব্য তুলে ধরা হলো। তাতে বলা হয়েছে, ‘যদি তাতে (কূপে-বর্তমানের ট্যাংকিও এর হুকুমে) মৃত ইদুর পাওয়া যায় এবং জানা না যায় তা কখন পড়েছে আর ইদুর এখনো ফুলে উঠেনি তাহলে তার পানি থেকে ওজু করে আদায়কৃত পূর্বের একদিন একরাতের নামাজ পুনরায় আদায় করবে। এর পানি দিয়ে ধৌত করা প্রত্যেকটি বস্তুকে ধৌত করতে হবে। আর যদি ফুলে উঠে বা ফেটে যায় তাহলে পূর্বের তিনদিন তিনরাতের নামাজ পুনরায় আদায় করতে হবে।’ (খন্ড-১, পৃষ্ঠা-১৬০)


নলকূপ নাপাক হলে পাক করার পদ্ধতি

নলকূপে কোনো ছোট শিশু প্রস্রাব করে দিলে বা কোনো নাপাক বস্তু পতিত হলে, পানি নাপাক হয়ে যাবে। এখন প্রশ্ন হলো, তাহলে এর পানি পাক করার পদ্ধতি?


নলকূপ পাক করার পদ্ধতি হলো, পাইপ, নলকূপ ও পাইপের নিচে কতটুতু পরিমাণ পানি থাকতে পারে, তা, এ বিষয়ে অভিজ্ঞ একজন লোক দিয়ে অনুমান করাবে। তারপর ঐ পরিমাণ পানি চেপে বের করে ফেলে দেয়া দ্বারা নলকূপ পাক হয়ে যাবে।


উল্লেখ্য, নলকূপের ভেতরে কখনো এমন নাপাক পড়তে পারে যা বের করা যাচ্ছে না। এ রকম নাপাক দু’ধরনের হতে পারে। (এক) নাপাকযুক্ত কনো বস্তু পড়তে পারে, যেমন- নাপাক কাপড়। লক্ষণীয় বিষয় হলো, সত্তাগতভাবে কাপড় কিন্তু পাক। নাপাক হয়েছে অন্য কারণে। (দুই) এমন বস্তু যার সত্তাটাই নাপাক যেমন- মৃতপ্রাণীর নাপাক কনো অংশ। প্রথম প্রকারের ক্ষেত্রে পূর্ববর্ণিত পদ্ধতিতে পানি বের করে ফেলে দিলেই নলকূপ পাক হয়ে যাবে। আর দ্বিতীয় প্রকারের ক্ষেত্রে অপেক্ষা করতে হবে, যে যাবত না ঐ বস্তটা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। (জাওয়াহিরুল ফিকহ, খন্ড-৭, পৃষ্ঠা-৪৮০)


পানিতে কোনো প্রাণী মারা গেলে


(এক) মশা, মাছি, বোলতা, ভীমরুল, বিচ্ছু, মৌমাছি বা এরূপ যে সব প্রাণীর মধ্যে প্রবাহমান রক্ত নেই, সেসব প্রাণী পানিতে পড়ে মরলে বা বাইরে মরে পানিতে পড়লে পানি নাপাক হবে না।


(দুই) মাছ, ব্যাঙ, কচ্ছপ, কাঁকড়া ইত্যাদি প্রাণী, যেগুলোর জন্ম পানিতে এবং সব সময় পানিতেই বসবাস করে সেগুলো পানিতে মারা গেলে পানি নাপাক হয় না। এবং এসব প্রাণী পানি ব্যতিত অন্য কোনো তরল পদার্থ, যেমন- শিরা, দুধ ইত্যাদিতে পরে মারা গেলে তাও নাপাক হয় না।


(তিন) যে প্রাণী পানিতে জন্মায় না, কিন্তু পানিতে বসবাস করে, যেমন- হাঁস ও পানকৌড়ি, তা পানিতে মারা গেলে পানি নাপাক হয়ে যাবে। এমনিভাবে অন্য জায়গায় মরে পানিতে পড়লেও পানি নাপাক হয়ে যাবে।


সূত্র: (বেহেস্তি জেওর: ওজু ও গোসলের পানির বিবরণ)


শেয়ার করুন

সেবা হট নিউজ: সত্য প্রকাশে আপোষহীন

,

0comments

মন্তব্য করুন

খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।