মেলান্দহে ৮টি ইটভাটার দুষনে বিপর্যয়ের মুখে ১২টি গ্রামের কৃষি ও প্রকৃতি

ইটভাটা
জামালপুর প্রতিনিধি ঃ একই এলাকায় ফসলি জমিতে পাশাপাশি ৮টি ইটভাটা স্থ্াপন হওয়ায় ইটভাটার বিষাক্ত কালো ধুয়ার দুষনে পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে চারপাশের ১২টি গ্রাম। 


ক্ষতিগ্রস্থ এসব গ্রামে ধানের ফলন কমে গেছে, আমগাছ,কাঠাঁলগাছ,নারিকেলগাছ ও সুপারিগাছসহ গাছগাছালিতে ফল ধরছেনা। শ্বাসকষ্ট জনিত রোগসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে গ্রামের মানুষজন। এদিকে কৃষককে ফাঁদে ফেলে ভাটা মালিকরা ফসলি জমির টপ সয়েল মাটি কেটে নেয়ায় নষ্ট হচ্ছে মাটির উর্বরতা। বৃক্ষ নিধন করে ভাটার চুল্লিতে কাঠ পুরানো হচ্ছে দেদারছে। প্রভাবশালীরা ইটভাটার মালিক হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্থের মুখে পড়লেও টুশব্দটি করতে পারছেনা কৃষকেরা।

জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার নয়ানগর ইউনিয়নে বজরদ্দি পাড়ায় ৪টি ও পাশর্^বর্তী বুরুঙ্গা গ্রামে ৪টি মিলে ৮টি ইটভাটা স্থাপিত হয়েছে পাশাপাশি। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র বিহীন এসব ইটভাটার কালোধুয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গ্রাম ৮টিতে কৃষি ও পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়লেও স্থানীয় প্রশাসন নিশ্চুপ।

বজরদ্দি পাড়ায় নবাব ব্রিক্সের ২টি ইটভাটা ও এস এস এস ব্রিক্সের ২টি ইটভাটা এবং বুরঙ্গা গ্রামে বাদশা ব্রিক্সের ২টি ইটভাট ও কে এম এম ব্রিক্সের ২টি ইটভাটার বিষাক্ত ধোয়ায় পরিবেশ বিপর্যয়ে আক্রান্ত গ্রামগুলো হচ্ছে, বজরদ্দি পাড়া, নয়াপাড়া, উদনা পাড়া, বানি পাকুরিয়া, বুরঙ্গা, গাঙপাড়া, মালঞ্চ, ছেন্না,ফুলছেন্না, লক্ষিপুর, মামা ভাগিনা ও বেতমারী।ইটভাটা1
 
সরেজমিনে বজরদ্দিপাড়া,উদনা পাড়া ও বুরুঙ্গা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বসতি ও ফসলি জমিতে ইটভাটা স্থাপনের নিয়ম না থাকলেও নিয়মনীতির তোয়াক্কা করে ৮টি ইটভাটায় ফসলি জমির মাঝখানে স্থাপন করেছে প্রভাবশালী ইটভাটা মালিকরা। ইটভাটার চারপাশে থাকা ক্ষেতের ফসল ধুসর বর্ণের হয়ে গেছে। মড়ক ধরেছে গাছ-গাছালিতে। ইটভাটা স্থাপনের পর থেকে টপ সয়েল মাটি কেটে নেয়া এবং কালো ধুয়ার প্রভাবে কমে গেছে ক্ষেতের ফসল । আম গাছে আম ধরছেনা। যৎসামান্য যাও ধরে ছোট থাকতেই বোটা পচেঁ পড়ে যায়। গাছে ধরা সুপারির ভিতর কালো দাগ হয়ে অজানা রোগে আক্রান্ত। আগের মতো গাছগুলোতে নারকেল ধরছেনা, যাও ধরছে নারিকেলে পানি থাকেনা বললেন বজরদ্দি পাড়া গ্রামের কৃষক বাবুল মন্ডল।

ইটভাটা স্থাপনের দুই গ্রামের মধ্যবর্তী গ্রামের নাম উদনা পাড়া। ১২টি গ্রামের মধ্যে এই গ্রামটি সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ। উদনা পাড়া গ্রামের ক্ষতিগ্রস্থ কৃষক আব্দুর রহিম(৫৫) বলেন আমার বাড়ী থেকে ৮টি ইটভাটায় খুব কাছাকাছি। বাড়ী ও ক্ষেতের জায়গা পড়ছে মাঝখানে। আগের চেয়ে ধান উৎপাদন কমে গেছে। অনেক নারিকেল গাছই খালি পড়ে আছে,নারিকেল ধরছেনা। দু’একটি গাছে যাও ধরছে, নারিকেল পারার পর দেখা যায় ভিতরে পানি নাই। ভাটার কালো ধুয়ায় আমরা চরম ক্ষতির মুখে পড়েছি। এই ক্ষতির কথা কাকে বলমো,বলার জায়গা নাই। উদনা পাড়ার সেলিনা বেগমসহ একাধিক কৃষকের সাথে কথা বলে একই অভিযোগ পাওয়া গেছে।
উদনা পাড়া ঢুকতেই চোখে পড়লো কৃষককে ফাঁদে ফেলে ফসলি জমির টপ সয়েল মাটি কেটে নেয়ার ভয়াবহ চিত্র। উদনা পাড়ার দুই পাশে বজরদ্দি পাড়া ও বুরুঙ্গা পাড়ায় স্থাপিত ইটভাটার মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে উদনা পাড়া থেকে। মাটি কাটার জন্য বসিয়েছে বৃহৎ কাটার মেশিন। দিনরাত কাটার মেশিন দিয়ে কাটছে ফসলি জমির টপ সয়েল মাটি। স্তুপকৃত মাটি সারিবদ্ধ ট্রাকটারে মাটি ভর্তি করে নিয়ে যাচ্ছে ইটভাটা গুলোতে।
ইটভাটা2
কথা হয় উদনা গ্রামের ৪৯ বছর বয়সি কৃষক গুনু মিয়ার সাথে। তিনি বলেন, টপ সয়েল মাটি কেটে ফেললে ফসল উৎপাদন কম হবে জেনেও মাটি বিক্রি করা ছাড়া আমার উপায় ছিলনা। ফাঁদে পড়ে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছি। পাশের ক্ষেতের মালিক মাটি দেওয়ায় আমার ক্ষেতে পানি উঠেনা। ক্ষেত থেকে বোরো ধানের ক্ষেতের পানি নেমে যায়। ক্ষেতের আইল ভেঙ্গে সীমানা হেরফের হয়ে যায়। এখন আমার ক্ষেত বাচাঁতে টপসয়েল মাটি বিক্রি করেছি। প্রথম ফাঁদে পড়েন একই গ্রামের কৃষক জহুরুল হক(৪৬) তারপর একে একে ফাঁদে পড়ে ওয়াদুদ (৪৫) ও আব্দুল্লাহ (৬০)সহ অনেকেই। আব্দুল্লাহ(৬০) বলেন, ইটভাটা মালিক ১ হাজার সেপটি মাটির দাম দিয়েছে ১৫ হাজার টাকা। এই ধরে সকলেই বিক্রি করায় আমিও বিক্রি করেছি। ফাঁদে পড়ে মাটি বিক্রির অভিযোগ অন্যন্য গ্রামের জমির মালিকদেরও।

এ ব্যাপারে জামালপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক( সার্বিক) রাসেল সাবরিন পরিবর্তন ডটকমকে বলেন,, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র বিহীন এবং আইন না মেনে ফসলিজমি ও বসতিতে স্থাপনকৃত বেশক’টি ইটভাটায় ইতিমধ্যে অভিযান চালিয়ে বন্ধ করেছি। মেলান্দহের নয়ানগর ইউনিয়নে ফসলি ও বসতি জমিতে ইটভাটা স্থাপনের অনুমতি দেয়া হয়নি। খোঁজ খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় আইনী পদক্ষেপ নেয়া হবে।

, , , , , , ,
themeforestthemeforest