SebaBanner

আজ*

হোম
চরম হতাশায় বিনিয়োগকারীরা ইসলামী ব্যাংকে তীব্র সংকট

চরম হতাশায় বিনিয়োগকারীরা ইসলামী ব্যাংকে তীব্র সংকট
সেবা ডেস্ক: -ইসলামী ব্যাংকের বিনিয়োগকারীরা চরম হতাশায় ভুগছেন। হঠাৎ ইসলামী ব্যাংকে তীব্র সংকট সৃষ্টি হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন।
বিনিয়োগকারীদের বরাবরই ভালো মুনাফা দিয়েছে দেশের বেসরকারি সর্ববৃহৎ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক। প্রতিবছরই মুনাফা ঘোষণার সময় তারা ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের বিষয়টি মাথায় নিয়েছে।

 এ কারণে ১৫-৩০ শতাংশ পর্যন্ত লভ্যাংশ দিয়েছে ব্যাংকটি। কিন্তু গত বছর অতীতের সব রীতি লঙ্ঘন করে ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করে। এবারও এ ধারা অক্ষুন্ন রাখায় হতাশা ব্যক্ত করেছেন বিনিয়োগকারীরা। অথচ প্রতিবছরই বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে সর্বোচ্চ মুনাফা করে আসছে এই ব্যাংকটি। সেখানে এমন লভ্যাংশ ঘোষণা বাজারের প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ বিনিয়োগকারীকে এক ধরনের বঞ্চিত করার শামিল বলেও মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে একের পর এক বিদেশি উদ্যোক্তারা শেয়ার ছাড়ার পর এখন ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার ছেড়ে দিচ্ছে ইবনে সিনা ট্রাস্ট। ইসলামী ব্যাংকের এ উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান (কর্পোরেট স্পন্সর) সব শেয়ারই বিক্রির ঘোষণা দিয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এ তথ্য জানিয়েছে।


শাকিল রিজভী স্টক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও ডিএসই’র সাবেক পরিচালক শাকিল রিজভী বলেন, একটি ভালো প্রতিষ্ঠানের আস্থার অন্যতম স্থান নগদ লভ্যাংশ ঘোষণার ধারাবাহিকতা। এটা না থাকলে আস্থার সঙ্কটে ভুগবে বিনিয়োগকারীরা।

তিনি বলেন, ইসলামি ব্যাংক একটি বড় ব্যাংক, দীর্ঘদিন থেকে শেয়ারবাজারে ভালো কোম্পানি হিসেবে পরিচিত ছিল। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে বিনিয়োগকারীরা সবসময়ই ভালো লভ্যাংশ প্রত্যাশা করে। একই সঙ্গে একটি ভালো কোম্পানি হিসেবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে লভ্যাংশ ঘোষণায় সামঞ্জস্য থাকা উচিত ছিল। বড় ব্যাংক সত্তে¡ও এ ধরনের সিদ্ধান্তে পুঁজিবাজারে অন্যান্য ব্যাংকের উপর প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন শাকিল রিজভী। তবে আগামীতে যাতে ভালো লভ্যাংশ দেয় সে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।

জানা গেছে, সক্ষমতার অভাবেই ইসলামী ব্যাংক নগদ লভ্যাংশ বাড়াতে পারেনি। ১০ শতাংশ লভ্যাংশ দিতেও ইসলামী ব্যাংকের বেশ বেগ পেতে হয়েছে। তবে মাত্র ১৬ মাসে ইসলামী ব্যাংকের এ অবনতিতে হতাশ বিনিয়োগকারীরা।

গত বুধবার অনুষ্ঠিত বোর্ড সভায় ২০১৭ সালের জন্য বিনিয়োগকারীদের নগদ ১০ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। আগামী ২৫ জুন বার্ষিক সাধারণ সভার (এজিএম) জন্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। ওই সভায় তা বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অনুমোদন করা হবে।

এদিকে ইসলামী ব্যাংকের লভ্যাংশ ঘোষণা নিয়ে বিনিয়োগকারীরা হতাশা প্রকাশ করেছেন। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারের দর আরও কমিয়ে আনতে ব্যাংক ব্যবস্থাপনা কমিটি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে কিনা। তারা ইসলামী ব্যাংকের সক্ষমতা কমে যাওয়ায় সংশয় প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ বলছেন, মাত্র ১৬ মাসে ইসলামী ব্যাংকের এমন অবস্থা হওয়ার কথা নয়।

মহসীন আলী নামে এক বিনিয়োগকারী জানান, গত বছর ১০ শতাংশ লভ্যাংশ দেয়ার পর ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার ১৫ টাকা কমেছিল। এ বছর দর সেভাবে কমলে বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। এ বিষয়টি মাথায় রেখে ইসলামী ব্যাংকের লভ্যাংশ দেয়া উচিত ছিল। নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক এক বিনিয়োগকারী বলেন, ঘোষিত লভ্যাংশ ব্যাপকভাবে হতাশ করেছে পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্টদের।

 তাদের মতে, যেখানে বরাবরই ব্যাংকটি বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে সর্বোচ্চ মুনাফা করে আসছে, সেখানে এমন লভ্যাংশ ঘোষণা বাজারের প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ বিনিয়োগকারীকে এক ধরনের বঞ্চিত করার শামিল।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মালিকানা পরিবর্তনসহ বেশকিছু কারণে ইসলামী ব্যাংকের ওপর গ্রাহক ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমছে। এ পরিস্থিতিতে প্রত্যাশিত লভ্যাংশ না দেয়ার কারণে ব্যাংকটি আরও পিছিয়ে পড়বে। পুঁজিবাজারের ওপরও এর বড় প্রভাব পড়বে। বেসরকারি খাতের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকটির লভ্যাংশের হার না বাড়া দুঃখজনক বলেও মনে করছেন তারা।

তবে লভ্যাংশের হার না বাড়ার কারণ সম্পর্কে ইসলামী ব্যাংকের সদ্য পদত্যাগী চেয়ারম্যান আরাস্তু খান কথা বলতে রাজি হননি। একইভাবে ব্যাংকটির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে সেল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।


সূত্র মতে, ১৯৮৫ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির পর ১০ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করলেও পরের বছরগুলোয় কমবেশি বেড়েছে কোম্পানিটির লভ্যাংশ। ২০০০ সালের পর কখনও তা ২০ শতাংশের নিচে নামেনি। ২০১০ সালে তা সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশে পৌঁছায়। এছাড়া ডিএসই থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ২০০৩ থেকে ২০১৩ সালের অন্য বছরগুলোয় ইসলামী ব্যাংক ঘোষিত লভ্যাংশ ছিল ২০ থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যে।

 এর মধ্যে বেশির ভাগ অর্থবছরে ২৫ শতাংশের বেশি লভ্যাংশ ঘোষণা করে ব্যাংকটি। সর্বশেষ ২০১৫ অর্থবছরে কোম্পানিটির লভ্যাংশের হার ছিল ২০ শতাংশ নগদ।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রফেসর আবু আহমেদ বলেন, ‘পুঁজিবাজারের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলোর দিকে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা অনেক বেশি থাকে। প্রত্যাশা পূরণ না হলে তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়। যার প্রভাব বাজারের লেনদেনের ওপরও পড়ে। তাই কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ ঘোষণার সময় এ দিকগুলো বিবেচনায় নিতে হয় বলে উল্লেখ করেন এই বিশ্লেষক।
ব্যাংকের দেয়া তথ্যমতে, ২০১৬ সালে ব্যাংকটি কর-পরবর্তী মুনাফা করেছিল ১৫১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। ওই হিসাব বছরের জন্য বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দিয়েছিল ১০ শতাংশ। এ ঘোষণার পরই ৪৬ টাকায় থাকা ব্যাংকের শেয়ার দর একপর্যায়ে ২৬ টাকায় নেমে যায়। এর প্রভাবে পুরো ব্যাংক খাতসহ পুঁজিবাজারে ধস নেমে আসে।

সূত্রমতে, সর্বশেষ হিসাবে ইসলামী ব্যাংকের কাছে বর্তমান মোট আমানত রয়েছে ৭৬ হাজার ৪৯৫ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৬৭ হাজার ৫৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা মুদারাবা হিসাবে ও অবশিষ্ট প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকার আমানত কোনো প্রকার খরচ ছাড়া সংগ্রহ করেছে। এর বিপরীতে ব্যাংকটি ঋণ দিয়েছে ৭৭ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকা। যার মধ্যে সাধারণ বিনিয়োগ হয়েছে ৭৪ হাজার ৮৬ কোটি ৫৩ লাখ টাকার। অন্যদিকে শেয়ারে বিনিয়োগ করেছে বাকি প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার।

এদিকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পদত্যাগে কয়েকদিন থেকে ব্যাংকের মধ্যে অস্থিরতা বিরাজ করছে। আর তাই আস্থা সঙ্কটে পড়েছে উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীরা। একের পর এক বিদেশি উদ্যোক্তারা শেয়ার ছাড়ার পর এখন নতুন করে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার ছেড়ে দিচ্ছে ইবনে সিনা ট্রাস্ট বলে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
ডিএসই জানিয়েছে, ইবনে সিনা ট্রাস্ট ইসলামী ব্যাংকের তিন কোটি ৬০ লাখ ৭৭ হাজার ৩৯১টি শেয়ার বিক্রি করবে। আগামী ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে ইবনে সিনা ট্রাস্ট ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে বিদ্যমান বাজার দরে এসব শেয়ার বিক্রি করবে। যা লেনদেন হবে স্টক মার্কেটে।

ইবনে সিনা ট্রাস্ট ইসলামী ব্যাংকের যে শেয়ার বিক্রির ঘোষণা দিয়েছে, তা ব্যাংকটির মোট শেয়ারের দুই শতাংশের ওপরে। এর আগে গত অক্টোবরে কোম্পানির উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান (কর্পোরেট স্পন্সর) বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার শেয়ার বিক্রি করে দেয়। বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টারের কাছে থাকা ইসলামী ব্যাংকের ৩৭ লাখ শেয়ারের মধ্যে উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানটি এক লাখ শেয়ার বিক্রি করে। তার আগে সেপ্টেম্বর কুয়েত ফাইন্যান্স হাউস ইসলামী ব্যাংকের সব শেয়ার বিক্রি করে। প্রতিষ্ঠানটির কাছে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার ছিল আট কোটি ৪৫ লাখ ৬৩ হাজার ৭৮২টি, যা ব্যাংকের মোট শেয়ারের সোয়া পাঁচ শতাংশ।

শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার উদ্দেশে ১৯৮৩ সালে বেসরকারি উদ্যোগে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড প্রতিষ্ঠা হয়। সে সময় ব্যাংকটির মোট শেয়ারের প্রায় ৭০ শতাংশই ছিল বিদেশিদের হাতে। বর্তমানে বিদেশিদের কাছে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার আছে ২৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ।

গত বছরের ৫ জানুয়ারি ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আসে। নতুন মালিকানায় আসে চট্টগ্রাম ভিত্তিক শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ। পরিবর্তনের পর গত মে মাসে ইসলামী ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালক আইডিবি (ইসলামিক ডেভলপমেন্ট ব্যাংক) আট কোটি ৬৯ লাখ শেয়ার বিক্রি করে। ইসলামী ব্যাংকের এ পরিবর্তনের ধারা এখনও অব্যাহত আছে।

, , ,