SebaBanner

হোম
তাহলে কি বাংলাদেশকে আদর্শ মানছে পাকিস্তান?

তাহলে কি বাংলাদেশকে আদর্শ মানছে পাকিস্তান?

সেবা ডেস্ক: ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে পশ্চিম পাকিস্তানের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিল তখনকার পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশ। তবে সেই অগ্রযাত্রা থমকে যেতে সময় লাগেনি পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের শোষণ আর বৈষম্যের নীতির কারণে। ১৯৭১ সালে পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্তির সময় শুধু অর্থনীতি কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্যেই নয়, আর্থসামাজিক নানা সূচকে পশ্চিম পাকিস্তানের চেয়ে অনেক পিছিয়ে ছিল বাংলাদেশ। তবে স্বাধীনতার পর থেকে ধীরে ধীরে পাল্টে যেতে থাকে চিত্র। অগ্রগতি আর উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলে বাংলাদেশ। বিদেশিদের শোষণ বঞ্চনার নাগপাশ থেকে মুক্তি পেয়ে গত চার দশকে বেশ পুষ্ট হয়ে ওঠে এই দেশ। অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়নে অনেক এগিয়ে থাকা পাকিস্তানকে অনেক ক্ষেত্রেই পেছনে ফেলে দিয়েছে আজকের বাংলাদেশ। এতে বিস্মিত পাকিস্তানও।

১৯৭১ সালে বিশ্বের মানচিত্রে নতুন একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে স্থান করে নেয় বাংলাদেশ। পাকিস্তানের আগ্রাসী থাবা থেকে বেরিয়ে উন্নয়নের পথে এগোতে থাকে দেশটি। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির প্রধান লক্ষ্য ছিল অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানো। এর মধ্যে দেশটি ঘুরে দাঁড়িয়েছেও। দুই দেশের তুলনামূলক অবস্থা বিচারে প্রথমেই আলোচনা করতে হয় স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব প্রসঙ্গ নিয়ে। আজ এমন কোনো ব্যক্তি-গোষ্ঠী-মহলই বলতে পারবেন না যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিপদের মধ্যে রয়েছে। বরং স্বীকার করতেই হবে দেশটির স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব এখন অতীতের যে কোনো সময়ের চাইতে সুরক্ষিত এবং মর্যাদার আসনে রয়েছে বাংলাদেশ। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, সীমান্ত চিহ্নিতকরণ ও নদী বিশেষত তিস্তার পানি বণ্টন প্রভৃতি ক্ষেত্রে পার্শ্ববর্তী বৃহৎ ও শক্তিধর রাষ্ট্র ভারত এখন রয়েছে রক্ষণাত্মক অবস্থায়।

সম্প্রতি দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি তুলনা তুলে ধরা হয়। এতে দেখা যায়, বাংলাদেশকে শোষণ-নিপীড়নে নিষ্পেষিত করতে চেয়েছিল যে দেশটি, এখন অনেক কিছুতে তার চেয়ে এগিয়ে আছে সে। গত ৪৬ বছরের অগ্রগতিতে বাংলাদেশের মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) পরিমাণ এখন পাকিস্তানের চেয়ে বেশি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশে মাথাপিছু জিডিপির পরিমাণ ১ হাজার ৫৩৮ ডলার। সেখানে পাকিস্তানের তা ১ হাজার ৪৭০ ডলার।

বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ৭২ বছর, পাকিস্তানে ৬৬ ও ভারতে ৬৮ বছর। অর্থনীতির আকার ছোট হওয়া সত্বেও বাংলাদেশের এ উন্নয়ন চোখে পড়ার মত। এছাড়া তিনটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের নারীদের গড় আয় সর্বোচ্চ। নারীর ক্রয়ক্ষমতা বাংলাদেশে বৃদ্ধির অন্যতম কারণ গার্মেন্টস খাত। দারিদ্রসীমার দিক থেকে বাংলাদেশ ভারতের কাছাকাছি অবস্থান করছে। বাংলাদেশে যখন দারিদ্রসীমা ৫৬ দশমিক ৮ ভাগ, সেখানে ভারতে তা ৫৮ ভাগ। পাকিস্তানে দারিদ্রসীমার হার ৩৬ দশমিক ৯ ভাগ । ক্ষুধার্ত শিশুর হার বাংলাদেশে কম। প্রয়োজনীয় পুষ্টি ৩৬ দশমিক ১ ভাগ শিশু পাচ্ছে যা পাকিস্তানের তুলনায় ভাল ও ভারতের চেয়ে কিছুটা ভালা অবস্থানে রেখেছে বাংলাদেশকে। শিশু মৃত্যুর হার বাংলাদেশে প্রতি হাজারে ৩৭ দশমিক ৬ ভাগ। যা ভারতের চেয়ে এক চতুর্থাংশ ও পাকিস্তানের চেয়ে অর্ধেকেরও কম।

কিছুদিন আগেও প্রাপ্ত পরিসংখ্যান ও খবরাখবর থেকে জানা গেছে, পাকিস্তান বৈদেশিক দেনা মেটানোর জন্য সরকারি সম্পত্তি বিক্রি করে দিচ্ছে। আমেরিকার আর্থিক সাহায্য না পেলে পাকিস্তান যে অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে যেত, তা আজ অস্বীকার করার উপায় নেই। এর বিপরীতে বাংলাদেশ আজ নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মাণ করতে যাচ্ছে। খাদ্যে ও বিদ্যুতে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ। চার দশকে অর্থনৈতিক সব সূচকেই বাংলাদেশ রয়েছে এগিয়ে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার বাংলাদেশের যখন ৬.২ শতাংশ তখন পাকিস্তানের ৩.৬ শতাংশ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাংলাদেশের ৩৩ বিলিয়ন এবং পাকিস্তানের ১০ বিলিয়ন ডলার। রপ্তানি ২৭ বিলিয়ন ডলারের বিপরীতে ২৪.৫ বিলিয়ন ডলার। রেমিটেন্স প্রাপ্তিতেও বাংলাদেশ রয়েছে এগিয়ে। বাংলাদেশের ১৪ বিলিয়ন ডলার এবং পাকিস্তানের ৯ বিলিয়ন ডলার। বাণিজ্য ঘাটতির দিকে থেকে পাকিস্তান রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশ থেকে পিছিয়ে। পাকিস্তানের ২০ মিলিয়ন ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশের মাত্র ৭ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশে মাথাপিছু সঞ্চয়ের হার ২৮ শতাংশ আর সে ক্ষেত্রে পাকিস্তানের মাত্র ১৫ শতাংশ।

স্বাধীনতার পর যেখানে মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার লড়াইয়ে নেমেছিল বাংলাদেশ। সেই বাংলাদেশই এখন গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সে (বিশ্ব ক্ষুধাসূচক) পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে। ২০১৭ সালের গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৮; যেখানে পাকিস্তানের ১০৬। জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান মধ্যসারির দেশগুলোর তালিকায় আছে ১৫২ নম্বরে। সেখানে পাকিস্তানের অবস্থান ১৫৭ নম্বরে। ইউএনডিপির লিঙ্গ সমতার ২০১৪ সালের তালিকায় বাংলাদেশ আছে ১৪২ নম্বরে, পাকিস্তান ১৪৬ নম্বরে। পাকিস্তান আর্মির ওয়েবসাইটে ‘দুই অর্থনীতির গল্প ১৯৭১-বর্তমান বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের তুলনা’ শিরোনামে ১৯৮০ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

এতসব তথ্য বা পরিসংখ্যানের ভিড়ে মূল কথা হল, বাংলাদেশ সামগ্রিক ভাবে পাকিস্তানের চেয়ে যোজন যোজন ধাপ উন্নত। আরেকটি বিষয় লক্ষ্যণীয়, পাকিস্তানের প্রশংসা করা কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে বলেছিল তলাবিহীন ঝুড়ি। অথচ আজ বাস্তবতা জানান দিচ্ছে আমাদের উৎকর্ষতা। আজ বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ খোদ পাকিস্তান বাংলাদেশের প্রশংসা করে। সময় এসেছে ভেবে দেখার যারা বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে। আসুন, দেশের এই অগ্রযাত্রায়, প্রগতির ধারায় সবাই অংশ নেই. গড়ে তুলি সোনার বাংলাদেশ।



, , ,

Home-About Us-Contact Us-Sitemap-Privacy Policy-Google Search