বন্যা আতংঙ্কে কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের ৫ লক্ষের বেশি মানুষ

বন্যা আতংঙ্কে কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের ৫ লক্ষাধিক মানুষ
 ডাঃ জি এম ক্যাপ্টেন, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি : ০৩.০৭.১৮

বন্যা আতংঙ্কে দিন পার করছে কুড়িগ্রাম জেলার ৯ উপজেলার ৪ শতাধিক চর ও দ্বীপ চরের প্রায় ৫ লক্ষাধিক মানুষ। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমের শুরুতে নদ-নদীগুলোতে পানি বৃদ্ধি পেতে থাকলে তাদের মনে এ আতংঙ্কের সৃষ্টি হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা, দুধকুমার, ফুলকুমার, কালিহাতি, জিঞ্জিরাম, শংকোসসহ ১৬ টি নদ-নদী প্রবাহিত। আর এসব নদ-নদীর অববাহিকায় ছোট-বড় প্রায় ৪ শতাধিক চর ও দ্বীপচর রয়েছে। এসব চরে বাস করছে প্রায় ৫ লক্ষাধিক মানুষ। ফলে এ জেলার উপর দিয়ে বেশি সংখ্যক ছোট বড় নদী প্রবাহিত হওয়ায় প্রতিবছর দেশের অন্যান্য জেলার চেয়ে এই জেলায় বন্যার ভয়াবহতা একটু বেশি হয়।

এ অবস্থায় চলতি বর্ষা মৌসুমে নদ-নদীর পানি সামান্য বৃদ্ধি পেতেই চরাঞ্চলের মানুষজন আতংঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়েছে। কেন না বন্যার পানি নদ-নদীর বিপদসীমা অতিক্রম করলেই তা প্রবেশ করবে চরাঞ্চলের ঘর-বাড়িতে। ভারত থেকে নেমে আসা পানিতে ঘর-বাড়ি তলিয়ে গেলে আর সেখানে থাকার কোন উপায় থাকবে না। তখন ঘর-বাড়ি ছেড়ে আশ্রয় নিতে হবে কোন বিদ্যালয়ে অথবা উঁচু সড়কে। নদ-নদীর অতিরিক্ত পানির ¯্রােতে ভেসে যেতে পারে অনেকেরই ঘর-বাড়িও। সাথে গবাদি পশু-পাখিও।

কুড়িগ্রামের সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের খেয়ার আলগার চরের বাসিন্দা মোজাম্মেল হক, এরশাদুল, তৈয়ব আলী, আইয়ুব আলী, আনছার আলী জানান, প্রতিবছর বন্যার সময়টা আমাদের চরাঞ্চলের মানুষের জন্য কষ্টের সময়। কেন না এসময়টায় বড় বন্যা হলে আমাদের এ চর সম্পুর্ণরুপে বন্যার পানিতে তলিয়ে থাকে। ঘর-বাড়িতে ছেলে-মেয়ে, গবাদি পশু নিয়ে থাকার কোন উপায় থাকে না। ফলে আমাদেরকে বউ-বাচ্চা নিয়ে উঁচু জায়গায় তাবুর নীচে আশ্রয় নিতে হয়। বন্যার সময়টা এভাবেই কাটাতে হয় আমাদেরকে।

উলিপুর উপজেলার সাহেবের আলগা ইউনিয়নের দইখাওয়ার চরের বাসিন্দা কালু মিয়া, আব্দুস ছালাম, মোহম্মদ আলী, শমসের আলী, শুক্কুর মিয়া জানান, আমাদের এই দই খাওয়ার চরে প্রায় ২ হাজার মানুষের বসবাস। এই চরটি ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকায় হওয়ায় প্রতিবছর বড় আকারের বন্যার সময় এই চরের সকল মানুষকে ঘর-বাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে হয়। নদীর কিনার ঘেষা ঘর-বাড়ি গুলো পানির প্রবল স্রোতে ভেসে যায়। ফলে বন্যার সময়টা আমাদের অবর্ননীয় কষ্টে কাটে। এবারও নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। যে কোন মুহুর্তে নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে ঘর-বাড়িতে প্রবেশ করতে পারে। এনিয়ে খুবই দুঃচিন্তায় আছি।

সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মোঃ আইয়ুব আলী সরকার জানান, যাত্রাপুর ইউনিয়নের একটি ওয়ার্ড ছাড়া বাকী আটটি ওয়ার্ডই চরাঞ্চল নিয়ে গঠিত। প্রতিবছর বন্যার সময় চরাঞ্চলের সকল মানুষকে ঘর-বাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে হয়। এসময় অতিকষ্টে তাদের দিন পার করতে হয়। এজন্য বন্যার সময়টায় আমার ইউনিয়নের মানুষেরা চিন্তাগুস্থ হয়ে পড়ে।   

এদিকে গত ২৬ জুন বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় আগাম প্রস্তুতি মূলক সভা করেছে জেলা প্রশাসন। বন্যার সময় ঘর-বাড়ি তলিয়ে থাকা বন্যা কবলিত মানুষদের আশ্রয়, খাদ্য, চিকিৎসাসহ তাদের জন্য করনীয় বিষয়ে পরিকল্পনা তৈরি করতে মঙ্গলবার দুপুরে জেলা প্রশাসক মোছা: সুলতানা পারভীন এর সভাপতিত্বে জেলা প্রশাসক কনফারেন্স রুমে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এসময় কুড়িগ্রাম সিভিল সার্জন ডাঃ এসএম আমিনুল ইসলাম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো: হাফিজুর রহমান, জেলা ত্রান ও পুর্ণবাসন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইয়াছির আরাফাতসহ জেলার সকল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, এনজিও প্রতিনিধি ও গণমাধ্যমের সাংবাদিকগণ উপস্থিত ছিলেন।

সভায় বন্যার সময় দুর্গত মানুষদের চিকিৎসা সেবা, স্যানিটেশন, বিশুদ্ধ খাবার পানি, ত্রানসহ সকল সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট সকল বিভাগের কর্মকর্তা ও এনজিও প্রতিনিধিদের অবহিত করা হয়। পাশাপাশি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে প্রশাসনের সাথে সকল বিভাগকে কাজ করার আহবান জানানো হয়।

কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন ডাঃ এসএম আমিনুল ইসলাম জানান, বন্যার সময় বন্যা কবলিতদের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে গত বছর ৩৬টি মেডিকেল টিম কাজ করেছিল। এবছর বন্যা শুরু হবে মেডিকেল টিমের সংখ্যা আরো বাড়ানো হবে। যাতে করে বন্যা কবলিত মানুষের চিকিৎসা সেবায় কোন সমস্যা না হয়। পাশাপাশি বন্যা এলাকায় যাতে করে সাপের কামড় ও পানিতে ডুবে কোন শিশু বা বৃদ্ধের মৃত্যু না হয় সেজন্য মেডিকেল টিম সর্তক করবে।

এব্যাপারে কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক মোছাঃ সুলতানা পারভীন জানান, অন্যান্য বছরের মতো জেলায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে তা মোকাবেলায় প্রস্তুতি মূলক সভা করা হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় জেলায় সকল বিভাগ ও শ্রেনী পেশার মানুষকে নিয়ে দুর্যোগ মোবাবেলা কমিটি করা হয়েছে। উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটি করা হবে। যাতে বন্যার সময় মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে এনে তাদের খাদ্য, চিকিৎসা, স্যানিটেশন নিশ্চিত করা যায়।

,
themeforestthemeforest

ছবি কথা বলে