২০০৫ সালের দুর্ভিক্ষ; অনাহারে মৃত হয়েছিল হাজার হাজার মানুষের

২০০৫ সালের দুর্ভিক্ষ; অনাহারে মৃত হয়েছিল হাজার হাজার মানুষের
সেবা ডেস্ক: এমন এক সময় ছিল যখন দুর্ভিক্ষ নিয়ে কথা বলা, তথ্য প্রকাশ করা এবং আলোচনা করা সম্পূর্ণ নিষেধ ছিল। তাই সাধারন জনগন কিছুই জানতে পারেনি এবং প্রকৃত সত্য কখনও তাদেরকে জানতে দেওয়া হয়নি। তবে ইতিহাস কি কখনো ধামা চাপা দিয়ে রাখা যায়?

বাংলাদেশে শেষ দুর্ভিক্ষ কবে? অনেকে বলবেন ১৯৭৪ সালে। তবে যারা উত্তরাঞ্চলের খোঁজখবর রাখেন তারা সবাই একবাক্যে ২০০৫ সালের কথা বলবেন। ২০০৫ সালে প্রথম আলো ‘মঙ্গাপীড়িত মানুষ খাদ্য চায়’ বাক্যে তাদের প্রধান শিরোনাম ছাপায়। সেই সময়ের শাসক জোট সরকার সমর্থিত ইনকিলাব পত্রিকা ‘মঙ্গায় মৃত হাজার হাজার’ শিরোনাম করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এসব খবর প্রকাশের দায়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকদের তারেক জিয়ার রোষাণলে পড়তে হয়। বিএনপি-জামায়াত নেতা কর্মীরা জেলা প্রতিনিধি সাংবাদিকদের হামলা করে আহত করে। অনাহারে মৃত মানুষের ছবি তোলায় ফটো সাংবাদিকদের ক্যামেরাও ভাঙচুর করা হয়।

২০০৫ সালের দুর্ভিক্ষকে কেন্দ্র করে ‘বালিকা তোমার প্রেমের পদ্ম’ খ্যাত গায়ক প্রীতমের সাথে আসিফের মনোমালিন্যের খবরও প্রকাশ পায়। মঙ্গা নিয়ে গান করায় তখন বিএনপি পন্থী গায়ক আসিফের সাথে প্রীতমের মনোমালিন্য হয়েছিল। তৎকালীন জোট সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হওয়ায় তারেক জিয়ার নির্দেশে আসিফ প্রীতমের সাথে দুর্ব্যবহার করেছিলেন বলে জানা যায়।

মৃতের সংখ্যা ১৯৭৪ এর চেয়ে কয়েকগুণ বেশী: ২০১৬ সালে ঢাকার কয়েকজন প্রতিথজশা সাংবাদিক রংপুরের মঙ্গাপীড়িত অঞ্চলে যান। গজঘন্টা, মর্ণেয়া, লক্ষীটারী, আলমবিদিতর ও কোলকোন্দ ইউনিয়ন ঘুরে বেশ কিছু কবরস্থানের গোরখোদকের সাথে তারা কথা বলে জানতে পারেন, ২০০৫ সালে কবরস্থানে প্রকৃত মৃতদেহের সংখ্যা প্রকাশ করার ব্যাপারে সরকারের কঠোর নিষেধাজ্ঞা ছিল। শুধুমাত্র দুর্ভিক্ষের কারণেই রংপুরে মৃতের সংখ্যা বারো হাজারের বেশী বলে ধারণা করা যায়। গোটা উত্তরাঞ্চলে এই সংখ্যা প্রায় অর্ধলক্ষ। ২০০৫ সালের দুর্ভিক্ষে মৃতের সংখ্যা ১৯৭৪ সালের চেয়েও কয়েকগুণ বেশী। ১৯৭৪ এর দুর্ভিক্ষে মৃতের সংখ্যা সর্বসাকুল্যে অনধিক পঞ্চাশ । ২০০৫ সালের দুর্ভিক্ষে মৃতের সংখ্যা প্রায় পঞ্চাশ হাজারের বেশী।

দেশবাসী জানেনি যে কারণে: ১. ২০০৫ সালের দুর্ভিক্ষ সম্পর্কে সারা দেশের মানুষজনের না জানার প্রধান কারণ হল দুর্ভিক্ষের আঞ্চলিকতা। এই দুর্ভিক্ষ শুধুমাত্র উত্তরাঞ্চলের মঙ্গাপীড়িত কয়েকটি জেলার ভেতর সীমাবদ্ধ ছিল। বাংলাদেশের মঙ্গা প্রভাবিত জেলাগুলো হচ্ছে নীলফামারী, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম এবং গাইবান্ধা। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে এই দুর্ভিক্ষ সম্পর্কে জানতেও দেওয়া হয়নি। দেশের অন্যান্য জেলার মানুষজনের তিনবেলা খাবার নিশ্চিত থাকায় তারা দুর্ভিক্ষপীড়িত অঞ্চলের খোঁজখবরও রাখেননি।

২. প্রচার মাধ্যমের উপর কঠোর বিধি-নিষেধের কারণে ২০০৫ সালের দুর্ভিক্ষ সম্পর্কে অনেকে জানতে পারেনি। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার এই দুর্ভিক্ষের সংবাদ প্রচারের ব্যপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। সেই সাথে শর্ত ছিল একে ‘দুর্ভিক্ষ’ না বলে ‘মঙ্গা’ বলতে হবে এবং কোনভাবেই মৃতের সংখ্যা প্রকাশ করা যাবে না।

জোট সরকারের দুর্নীতি দুর্ভিক্ষেও: ২০০৫ সালে শুধু লালমনিরহাট উপজেলাতেই দুর্ভিক্ষে না খেতে পরে মারা যায় প্রায় ১৭ হাজার মানুষ। ডান তীর বাঁধ, ভাসানীর চর, ঝাড়সিংহেশ্বর, কিসামতের চর, দোহলপাড়া চরখড়িবাড়ী, পূর্বখড়িবাড়ি, ছোটখাতা, বাইশপুকুর, পূর্বছাতনাই ও ডালিয়া এলাকায় লাশের পর লাশ দেখা গিয়েছিল। খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা উপমন্ত্রী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু এবং তারেক রহমান এখানেও কোন ছাড় দেননি। দুর্ভিক্ষের চাল লুট করেছেন। ৮৭ হাজার ৫শ’ পরিবারকে ৩ কিস্তিতে ৩০ কেজি করে চাল বিতরণের কথা থাকলেও সেখানে চাল পেয়েছেন বিএনপি সমর্থক এক হাজার ১০০ পরিবার। আবার দুর্ভিক্ষপীড়িত লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য মাত্র ১৮৭ কোটি টাকা বরাদ্দের ১৬৬ কোটি টাকাই গায়েব। মৃত্যপথযাত্রীরাও রেহাই পাননি হাওয়া ভবনের দুর্নীতির কালো হাতের থাবা থেকে।

⇘সংবাদদাতা: সেবা ডেস্ক

,

0 comments

Comments Please

themeforestthemeforest

ছবি কথা বলে