খাজা এনায়েতপুরীর ১০৪ তম বাৎসরিক ওরশ শুরু

খাজা এনায়েতপুরীর ১০৪ তম বাৎসরিক ওরশ শুরু
জহুরুল ইসলাম, বেলকুচি প্রতিনিধি: উপমহাদেশের প্রখ্যাত ধর্মীয় নেতা, ওলিয়ে-কামেল সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরে হযরত শাহ্ সুফি খাজা বাবা ইউনুছ আলী এনায়েতপুরী (রঃ) ওরস শরিফ আজ শুক্রবার বাদ জুম্মা নামাজের পর থেকে শুরু হয়েছে। তিনি ইসলাম প্রচার ও মানবতাবাদে এক অবিসংবাদিত নেতা। শিশু বেলায় পিতা হারিয়ে টুপি বিক্রিতা থেকে তিনি কর্মময় জীবনের মাধ্যমে সুফীবাদকে সমগ্র বাংলা এবং ভারতের আসামে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। পাশাপাশি মানবিক কল্যাণকর নানা কাজে মানুষের প্রতি অঘাত ভালবাসার দর্শন রেখে যাওয়ায় প্রয়াত হলেও প্রায় ২ কোটি ভক্তের হৃদয়ে তিনি বেঁচে রয়েছেন। তার দেখানো মানবতার দর্শন ও ইসলাম প্রচারে সাড়া দেশ তথা ভারতের আসামে ১২শ পীর আওলীয়া তাদের খানকা তথা দরবারে ভূমিকা রাখছেন। প্রচার করছেন রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর সত্য তরিকা ও শান্তির বাণী।

পিরানে পীর দস্তগীর খাজা এনায়েতপুরী (রঃ) দরবার শরীফে আজ শুক্রবার বাদ জুম্মা থেকে ১০৪ তম বাৎসরিক ওরশে এবার দেশের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় মহাসমাবেশের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শুরু হয়েছে।

জানা যায়, আধ্যাত্বিক সুফী সাধক হযরত খাজা বাবা ইউনুছ আলী (রঃ) মুলত ছিলেন ইয়েমেনের বংশধর। তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশের ইসলাম প্রচারের জন্যই তাদের আগমন ঘঠে। তার পঞ্চম পুর্ব পুরুষ হযরত শাহ দায়েম (রঃ) ইয়েমেন থেকে ইসলাম প্রচারের জন্য ভারতবর্ষে আসেন। খাজা এনায়েতপুরী (রঃ) এর বাবা শাহ আব্দুল করিম (রঃ), মাতা-তামান্না বেগম (রঃ) এর ২ ছেলে ১ মেয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। তিনি ১৮৮৬ সালের ৭ নভেম্বর জন্মগ্রহন করেন। ছোট বেলা থেকেই ইসলাম প্রচার ও প্রসারের সাথে জড়িত থেকে সুফীবাদের দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন। এ কারণে অবিভক্ত ভারত-বাংলার অন্যতম ধর্ম প্রচারক তৎকালীন কোলকাতার মেহেদীবাগ দরবার শরীফের পীর আওলাদে রসুল খাজা সৈয়দ ওয়াজেদ আলী (রঃ) এর সংস্পর্শে চলে আসেন। তার আদর্শিক কর্মকান্ড এবং মানুষের প্রতি অঘাত ভালবাসা, নির্লোভ নানা গুণের কারনে খুব স্বল্প সময়ে খাজা ইউনুছ আলী এনায়েতপুরী (রঃ) গুরু খাজা ওয়াজেদ আলী (রঃ) এর তরিকা লাভ করেন। খাজা এনায়েতপুরী (রঃ) এর পুত্র খাজা মোজাম্মেল হকের লেখা “খাজা বাবার সাধনা জীবন” বইটি থেকে জানা যায়, খাজা ইউনুছ আলী যখন ছোট তখনই বাবা মারা গেলে সংসারে অনটন দেখা দেয়। তার মা আরবী, ফারসি ও উর্ধতে পারদর্শী হওয়ায় স্বামীর প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসায় এলাকার নারীদের পড়াতেন। পাশাপাশি সংসার চালাতে ছেলেকে দিয়ে বাজার থেকে কাপড় কিনে এনে তা দিয়ে টুপি তৈরী করতেন। পরে খাজা এনায়েতপুরী (রঃ) হাটে-হাটে গিয়ে এসব টুপি বিক্রি করতেন। আর এভাবেই চলতো তাদের কষ্টের সংসার ও তার লেখা-পড়া। খাজা এনায়েতপুরী (রঃ) মা তামান্না বেগম (রঃ) হঠাৎ এক রাতে স্বপ্ন দেখেন দক্ষিন-পশ্চিম আকাশে সুর্য্য উদিত হচ্ছে। সবাই ঐদিকে সেজদা করছে। পরদিন সকালে শুনতে পান ভারতের প্রখ্যাত পীর খাজা ওয়াজেদ আলী (রঃ) শাহজাদপুর উপজেলার চিনা ধুকুরিয়া এনায়েতপুর মাজারের দক্ষিন-পশ্চিম এলাকায় ইসলাম প্রচারের জন্য এসেছেন। এলাকার মুরুব্বীদের সাথে ১৭ বছর বয়স্ক খাজা ইউনুছ আলী (রঃ) কে সেখানে পাঠান তিনি। অনুসারীদের নিয়ে ইসলামী আলোকপাত করা কালে সন্ধ্যার দিকে মাগরিবের নামাজ অতিবাহিত হচ্ছিল। তখন তিনি সম্মানের সাথে দাঁড়িয়ে “নামাজকা ওয়াক্ত যা রাহা” বললে তখন ওয়াজেদ আলী (রঃ) আলোচনা রেখে সবাইকে নিয়ে নামাজ আদায় করেন। এরপর হুজুর তাকে ডেকে নিয়ে কথা বলে সন্তুষ্ট হন। এক পর্যায়ে তাকে কোলকাতার মেহেদীবাগ দরবারে নিয়ে যাবার প্রন্তাব দেন। তার মায়ের অনুমতি নিয়ে হুজুরের সাথে চলে গিয়ে হুগলীর দারুল উলুম মাদ্রাসায় টাইটেল পাশ করেন। এরপর খাজা সৈয়দ ওয়াজেদ আলী (রঃ) এর শান্তি ও আদর্শের পথে ইসলাম প্রচারে ভোগ বিলাসী জীবনের বিরোধী এই মহামানব ইসলাম ও সুফীবাদের দর্শন ভারতের আসাম সহ সাড়া বাংলায় প্রচারে খেলাফত প্রাপ্ত হন। কিছুদিন অতিবাহিত হলে নিজ ভুম সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরে খানকা স্থাপন করে শুরু করেন ইসলামী মুল্যবোধের মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর শান্তির তরিকা প্রচার এবং আদর্শের সুফী বাদের বিস্তার কাজ। পাশাপাশি এনায়েতপুরেই তিনি বিয়ে করে শুরু করেন সংসার জীবন। জনক হন ৮ কন্যা এবং ৫ ছেলে সস্তানের। পরবর্তীতে সমগ্র বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতের আসামে সফর করে ইসলাম ও সুফীবাদ প্রচার কাজ তরান্বিত করেন। প্রথমে লজ্জাবোধ করে কিছুদিন বাড়িতে বসে থাকেন। এরপর মেহেদীবাগ দরবার থেকে সুফীবাদের বানী প্রচারে অলস না হয়ে কাজ করার নির্দেশনা আসে। তখন অসুস্থ্যবস্থায় সহযোগীদের নিয়ে ময়মনসিংহ গিয়ে ইসলামের মর্মবানী প্রচার করলে ১৭ জন আকৃষ্ট হন। আর এভাবেই তিনি ভারত-বাংলা ইসলামের সত্য তরিকা প্রচারে মেহেদীবাগ পীরের চব্বিশ লাখ মুরিদের মধ্যে শীর্ষস্থান অধিকার করে তরীকতের সর্বোচ্চ খিলাফত প্রাপ্তহন। এই তরিকা নক্সাবন্দ-মুজাদ্দেদী তরিকা নামে পরিচিত। তিনি ইসলামের মর্মবাণী-তরিকত দর্শন প্রচারের পাশাপাশি সমাজসেবা মুলক কাজেও রেখেছিলেন অনন্য অবদান। শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান সহ যেকোন প্রয়োজনে অসহায় বিপর্যৗল্প মানুষের সেবায় নিবেদিত থাকায় খাজা এনায়েতপুরীকে ভক্তবৃন্দ সুলতানুল আউলিয়া এবং চিরস্থায়ী সংস্কারের জন্য ”আখেরী মুজাদ্দেদ” বলে অভিহত করেন। ১৯১৬ সালে তার আত্বীয় ও অনুসারীদের পরামর্শ ও সহযোগীতায় এনায়েতপুর দরবারে থেকে শুরু করেন ওরশ শরীফ। এতে সাড়া দেশ থেকেই তার ভক্ত মুরিদরা এখানে সমবেত হতে থাকেন। যা ধীরে-ধীরে অগনিত ভক্তদের আগমনে মহাসমাবেশে রুপ নেয়। এরই এক পর্যায়ে তার সংস্পর্শে এসে আদর্শিক আলোর পথের দিশারী হিসেবে ১২শ পীর আওলীয়া খেলাফত প্রাপ্ত হন। এর মধ্যে ফরিদপুরের সদরপুরের প্রখ্যাত আটরশি পীর, চন্দ্রপাড়া পীর, ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জ পীর, টাঙ্গাইল প্যারাডাইস পাড়া, কুমিল্লার ইসলামাবাদ, ঢাকার শ্যামলী বাগী, মাতুয়াইল, জামালপুরের সাধুরপাড়া মোসলেম নগর, যশোরের ঘুনী দরবার শরীফ, ভারতের আসামের গণি খলিফার দরবার শরীফ অন্যতম। তারা একই ভাবে খাজা ইউনুছ আলী এনায়েতপুরী (রঃ) সুফী বাদের আদর্শ ও ইসলাম প্রচার করছেন। এদের মধ্যে বিশ্ব জাকের মঞ্জিল ফরিদপুরের আটরশির পীর হযরত খাজা শাহ সুফী মোঃ হাসমতুল্লাহ ১৯৩৮ সালে জামালপুরের নান্দিনা হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে খেদমতের জন্য এনায়েতপুর পাক দরবার শরীফে আসেন। এখানে খাজা এনায়েতপুরী (রঃ) দিক দর্শন তাকে মোহিত করায় টানা ৪০ বছর নানা দিকে দীক্ষা লাভ করেন। পরে খাজা ইউনুছ আলী এনায়েতপুরী (রঃ) প্রিয় এই খাদেমকে তরিকা প্রচারের জন্য ফরিদপুরে পাঠান। সেখানে যথাযথ ভাবে শান্তির ধর্ম ইসলামের মর্মবাণী এবং সুফী বাদের তরিকা প্রচারে দায়িত্বশীল ভুমিকা পালন করায় খাজা এনায়েতপুরী (রঃ) তার খানকাকে বিশ্ব জাকের মঞ্জিল ঘোষনা করেন। আর এভাবেই আটরশির পীর দেশবরেণ্য পীরে কামেল হয়ে উঠেন। ১৯১৬ সাল থেকে শুরু বাৎসরিক ওরশ এবার ১০৪ তম বছর পার করছে। আগামী ১১ জানুয়ারী হতে শুরু ৩ দিন ব্যাপী এই ঐতিহাসিক ওরশে দেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন এবং ভারতের আসাম থেকে অন্তত ১৫ লক্ষাধিক জাকেরের সমাবেশ ঘঠবে। ১৩ জানুয়ারী রোববার সকালে দরবারের বর্তমান গদ্দিনশীন পীর হযরত খাজা কামাল উদ্দিন (নুহু মিয়া) এর মোনাজাত পরিচালনায় বিশ্বমানবতার মঙ্গল কামনা করে বাৎসরিক ওরশ শরীফের সমাপ্ত হবে।
⇘সংবাদদাতা: জহুরুল ইসলাম

,

0 comments

Comments Please