
সেবা ডেস্ক: জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার হাড়িয়াবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। তার পিতা এ টি এম মনজুরুল হক ও মা আমেনা খাতুনের একটি নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার, অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল নয়। তার শিক্ষা জীবন শুরু হয় জামালপুর হারিয়াবাড়ি প্রাইমারি স্কুলে।
পঞ্চম শ্রেণি উত্তীর্ণ হয়ে সিক্সে ভর্তি হন ইসলামপুর নেকজাহান হাইস্কুলে। ১৯৬৯ সালে বেশ কয়েকটা সাবজেক্টে লেটার মার্কসসহ প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করেন।
তার স্বপ্ন ছিল ঢাকার কোনো বিখ্যাত কলেজে এইচএসসি পড়বেন। কিন্তু সে সামর্থ্য ছিল না। বেশ ঝুঁকি নিয়ে ঢাকা কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু ওই সময় পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল। এর মধ্যে পড়াশোনা করতেন। থাকতেন ঢাকা কলেজের নর্থ হোস্টেলে।
১৯৭২ সালে প্রথম বিভাগে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। ডাক্তার হলে মানুষের সাহায্য করা যায়, জনগণের কাছাকাছি যাওয়া যায়। একেবারে নিম্ন থেকে উচ্চ পর্যায়ের মানুষকে সেবা দেওয়া যায়। এই ভাবনা থেকেই ডাক্তারি পড়া। তখন মেডিকেল কলেজ ছিল আটটি, প্রতিযোগিতা ছিল অনেক। তিনি সরাসরি ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেলেন। স্বাধীনতার পর তারাই ছিলাম প্রথম ব্যাচ। মেডিকেলে পড়লে কঠিন পরিশ্রমের মধ্যে সময় কাটাতে হয়। প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়েছে। ১৯৭৮ সালে এমবিবিএস পাস করেন।
ঢাকা মেডিকেল থেকে পাস করার পর এক বছর ইন সার্ভিস ট্রেনি করতে হতো। সেটা আসলে চাকরি। ওই প্রশিক্ষণ শেষ করে ১৯৭৯ সালে তার গ্রামে পোস্টিং হয়। জামালপুরের একটি গ্রাম। সেখানে থাকার জায়গা তেমন ছিল না। প্রচুর রোগী আসত কিন্তু ওষুধপত্র নেই। পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি নেই। ৭/৮ মাস থাকার পর ঢাকা মেডিকেলে সহকারী রেজিস্ট্রার হিসেবে পোস্টিং হয়।
তিনি ঢাকা মেডিকেলের কার্ডিওলজি বিভাগে কাজ করেছেন। দক্ষতাও বাড়তে থাকল। তখন তার মাথায় চিন্তা এলো কীভাবে উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়া যায়? তৎকালীন আইপিজিএম-এ এফসিপিএসে ভর্তি হলেন। এক পর্যায়ে পার্ট ওয়ান পাস করলেন। পার্ট-টু পড়ার সময় মধ্যপ্রাচ্যের একটি টিম এলো। তারা চিকিৎসক নেবে। বেতন খুব ভালো। তিনি সামান্য বেতন পান। তাতে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতে পারেন না। এই লোভনীয় চাকরিটা ছাড়া কঠিন হয়ে গেল। তিনি দরখাস্ত করলাম, চান্সও পেলেন। ১৯৮৪ সালের দিকে চলে গেলেন সৌদি আরব । সেখানেও অজপাড়া-গাঁয়ে চাকরি করতে হয়। পড়াশোনা যা করেছিলেন তা ভুলে যাওয়ার অবস্থা। তখন রিয়াদে ব্রিটেনের এমআরসিপি পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ ছিল। তিনি রিয়াদে পরীক্ষা দিয়ে পার্ট-ওয়ান পাস করলেন। স্বাভাবিকভাবে পার্ট-টু পাস করতে হবে। পাঁচ বছর সৌদি আরব থেকে দেশে এসে কিছুদিন থাকলেন। তারপর কিছু পয়সা সংগ্রহ করে ১৯৮৯ সালে লন্ডন চলে গেলেন।
তিনি ট্রেনিংয়ে গিয়ে স্কটল্যান্ডের এডিনবরার একটি হাসপাতালে কাজের সুযোগ পেলেন। সেখানে কাজের পাশাপাশি পড়াশোনা করতেন ও প্রশিক্ষণ নিতেন। তারপর লন্ডনের রয়েল কলেজ অব ফিজিশিয়ান থেকে এমআরসিপি ডিগ্রি অর্জন করেন। তখন দেশে (১৯৯২) ফিরে হলি ফ্যামিলির চেয়ারম্যান অধ্যাপক শহীদুল হক জামাল সাহেবের সঙ্গে দেখা করলেন। অধ্যাপক শহীদুল সাহেব, অধ্যাপক এস বি ডানা, মিহির কুমার দাশ আমার মৌখিক পরীক্ষা নিলেন। তারা বললেন, আপনি দ্রুত জয়েন করেন। কনসালটেন্ট মেডিসিন হিসেবে যোগ দেওয়ার কিছু দিনের মধ্যে চেয়ারম্যান, পরিচালক, স্টাফ, রোগীদের মধ্যে তার একটু গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হলো। সেখানে তার ভালোই দিন কাটছিল। অনুশীলন, রোগী দেখা সব কিছুতেই নতুন ছন্দ ফিরে এলো। এরই মধ্যে পিএসসি (পাবলিক সার্ভিস কমিশন) তাকে কল করল। সেখানে অনেক প্রতিযোগিতা। অনেক প্রার্থী দরখাস্ত করেছে। মাত্র দুটো পোস্ট। তারা পরীক্ষা নিল এবং তিনি চান্স পেয়ে গেলেন। পিএসসি তাকে পিজি হাসপাতালে নিয়োগ দিল।
পিএসসি থেকে উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৯৫ সালের জুন মাসে পিজি হাসপাতালে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করলেন। পরে তো পিজি হাসপাতাল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে গেল। তিনি সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক হয়ে গেলেন। বর্তমানে মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। এরই মধ্যে ২০০৩ সালে লন্ডনের রয়েল কলেজ অব ফিজিশিয়ান থেকে এফআরসিপি ডিগ্রি করেছেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের পরপর তিনবার ডিন নির্বাচিত হয়েছেন। বর্তমানে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন।
দেশের খ্যাতিমান চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ। তিনি লন্ডনের রয়েল কলেজ অব ফিজিশিয়ান থেকে মেডিসিনে এমআরসিপি ও এফআরসিপি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি একুশে পদক, ইউজিসি অ্যাওয়ার্ড লাভ করেছেন।
তার লেখা বই পাঠ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে উপমহাদেশসহ, ব্রিটেন ও মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাংলাদেশে চিকিৎসাবিষয়ক বই অপ্রতুল। আপনাকে পাইওনিয়র বলা যেতে পারে। চিকিৎসকদের মধ্যেও আগ্রহ কম। ছাত্রদের পড়াতে গিয়ে উপলব্ধি হলো এই জ্ঞান তো ধরে রাখা দরকার। তখন বই লেখার পরিকল্পনা করেন। মেডিকেল বিষয়ে তার ছয়টি বই প্রকাশিত হয়েছে—
১. Short case in Medical Practice.,
২. Long case in Medical Practice.
৩. ECG in Medical Practice.
৪. Case history and data interpretation in Medical Practice.
৫. Radiology in Medical Practice.
৬. স্বাস্থ্যবিষয়ক নির্বাচিত কলাম।
বইগুলো প্রকাশ করেছে দিল্লির আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা ELSIRBR.
‘Short cases in clinical medicine’ বইটি ইউজিসি ইউনিভার্সিটি গ্র্যান্ড কমিশনে ২০১৩ সালে পুরস্কৃত হয়েছে। মৌলিক ও উদ্ভাবনীমূলক গবেষণাকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ এই সম্মাননা তারা দিয়েছেন। সম্প্রতি স্বাস্থ্য বিষয়ে জনগণের সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে বিভিন্ন পত্রিকায় লেখা তার কলামগুলোর একটি সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। এটি প্রকাশ করেছে ঢাকার অনন্যা প্রকাশনী। সম্প্রতি তিনি একটি টেক্স বুকস লিখছেন।
-সেবা হট নিউজ: সত্য প্রকাশে আপোষহীন

খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।