
বকশীগঞ্জ প্রতিনিধি: জামালপুরের বকশীগঞ্জে ভয়াবহ বন্যার ছোবলে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে গ্রামীণ জনপদ। বন্যার স্রোতের তোড়ে রাস্তা-ঘাট,শিক্ষা প্রতিষ্ঠান,ব্রিজ-কালভার্ট বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। দেখা গেছে গ্রামে গ্রামে বন্যার ক্ষত ও ধ্বংসস্তূপ। এখানো নৌকায় করে প্রয়োজন মেটাতে হচ্ছে কয়েকটি গ্রামের মানুষের। অসহনীয় দুর্ভোগে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে গ্রামের সকল মানুষের।
বকশীগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১৪ জুলাই থেকে বকশীগঞ্জ উপজেলায় ভয়াবহ বন্যা শুরু হয়। এই বন্যা ১৮ দিন স্থায়ী হয়। বন্যার পানিতে উপজেলার ১৯৯ টি গ্রামের মধ্যে ১৮০ টি গ্রাম প্লাবিত হয়। এরমধ্যে সাধুরপাড়া , মেরুরচর, বগারচর ও নিলক্ষিয়া ইউনিয়ন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়।
এবারের ভয়াবহ বন্যায় কৃষি, যোগাযোগ, গ্রামীণ অবকাঠামো, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্যানিটেশন ব্যবস্থায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। বন্যায় সরকারি হিসাবে এক লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হয়।
বন্যার পানির স্রোতে রাস্তা-ঘাট লন্ডভন্ড হয়ে যায়। বন্যায় ৭ টি ইউনিয়নে ৩১২ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়াও ৪৪০ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শুধু কাঁচা রাস্তায় নয় পাকা রাস্তাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ৩৬ টি পাকা রাস্তার ১১০ কিলোমিটার রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভেঙে গেছে দুটি ব্রিজ। সম্পূর্ণ ক্ষতি হয়েছে ২৭ কিলোমিটার পাকা রাস্তা। আংশিক ক্ষতি হয় ৪২ কিলোমিটার রাস্তা।
বন্যার কবলে পড়ে ৮২ টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ৫০ টি উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের বিদ্যালয় ও মাদ্রাসা আংশিক ক্ষতি হয়। এছাড়াও ২৫ টি বিদ্যালয় সর্ম্পূণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেও বন্যার আঁচর লেগেছে। ৩২ টি প্রতিষ্ঠানে বন্যায় ক্ষতি হয়েছে।
অপরদিকে বন্যায় ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছে স্যানিটেশন ব্যবস্থায়। সব গুলো গ্রামই পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় স্যানিটেশন ব্যবস্থায় হযবরল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এরমধ্যে এক হাজার ৩২০ টি নলকূপ সম্পূর্ণ ক্ষতি হয়েছে। আংশিক ক্ষতি হয়েছে ২৬০ টি নলকূপ। ৯৬৯ টি ল্যাট্রিন সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৫০ টি ল্যাট্রিন আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার সাধুরপাড়া ইউনিয়নে অবস্থিত বিলেরপাড় গ্রাম অন্যান্য গ্রামের চেয়ে অনেকটাই অবহেলিত একটি গ্রাম। এখানো পাঁকা হয় নি গ্রামের প্রধান রাস্তাটি। এরই মধ্যে ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়ে বিলেরপাড় গ্রাম। বন্যার প্রবল স্রোতের তোড়ে বিলেরপাড় গ্রামের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া রাস্তাটি ধ্বংস হয়ে গেছে। এই সড়কটি গাজীরপাড়া বাজার থেকে শুরু করে বিলেরপাড় হয়ে কামালের বার্তী বাজার গিয়ে ঠেকেছে। পুরো রাস্তাটিতে বন্যার ক্ষত চিহ্ন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে পুরো গ্রাম। এই রাস্তাটি পুরোটাই ভেঙে যাওয়ায় হেঁটে যাওয়ার মত আর অবস্থা নেই। নৌকা দিয়ে কোন রকমে পার হচ্ছেন এই গ্রামের মানুষ। রাস্তায় খাল তৈরি হওয়ায় শিশুদের বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে।
বিলেরপাড় গ্রামের শালু মিয়া জানান, এখনো তার ঘরের চারদিকে মাথা সমান পানি রয়েছে। ঘর থেকে বের হলেই নৌকা ছাড়া সম্ভব নয়।
একই গ্রামের তাইরুল হাসান মাস্টার বলেন, গ্রামের প্রধান রাস্তাটি বিধ্বস্ত হয়ে যাওয়ায় মানুষের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। আমরা ইচ্ছা করলেই যেখানে সেখানে যেতে পারছি না। তিনি অবিলম্বে রাস্তাটি পুনঃমেরামতের দাবি জানিয়েছেন।
বন্যার স্রোতের তোড়ে বিলেরপাড় গ্রামের একমাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয়টিও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
একই অবস্থা ডেরুরবিল গ্রাম ঠান্ডারবন গ্রামের। এই ইউনিয়নের গাজীরপাড়া-বাংগাল পাড়া রাস্তার উপর একটি সরু ব্রিজ বন্যার পানিতে ভেসে যাওয়ায় চলাচল বন্ধ রয়েছে। কোন রকমে নৌকা দিয়ে পারাপার হচ্ছে মানুষ।
গাজীরপাড়া- আলীরপাড়া রাস্তাটিও ভেঙে বড় খালে পরিণত হয়েছে। ফলে হুমকির মুখে পড়েছে আচ্চাকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি । মেরুরচর ইউনিয়নের জব্বারগঞ্জ বাজার হতে আইরমারী গ্রামের রাস্তাটি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। বকশীগঞ্জ থেকে মেরুরচর ইউনিয়ন পরিষদের রাস্তাটিও ভেঙে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। এদিকে এখনো এই ইউনিয়নের মদনেরচর , কতুবেরচর , উত্তর আচ্চাকান্দি গ্রামের মানুষ যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হওয়ায় নৌকা দিয়ে পারাপার হচ্ছেন।
এছাড়াও বগারচর ইউনিয়নের সারমারা বাজার থেকে রামরামপুর বাজার পর্যন্ত পাকা রাস্তাটি ভেঙে গেছে।
বগারচর ইউনিয়ন, নিলক্ষিয়া ইউনিয়নেও রাস্তার বেহাল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এসব গ্রামের মানুষ দ্রুত তাদের প্রধান রাস্তা গুলো পুনঃমেরামতের দাবি জানান।
সাধুরপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহমুদুল আলম বাবুর সাথে কথা হলে তিনি বলেন, বন্যায় তার ইউনিয়নের বেশিরভাগ গ্রামের কাঁচা রাস্তা ভেঙে যাওয়ায় মানুষের খুবই দুর্ভোগ শুরু হয়েছে। প্রশাসনের সাথে পরামশ করে এসব যোগাযোগের রাস্তা সংস্কারের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা হাসান মাহবুব খান জানান, সকল বিধ্বস্ত রাস্তার তথ্য নেওয়া হচ্ছে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
-সেবা হট নিউজ: সত্য প্রকাশে আপোষহীন

খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।