আজান ও ইকামতের জবাব দিলেই মিলবে বেহেসত

আজান ও ইকামতের জবাব দিলেই মিলবে বেহেসত
সেবা ডেস্ক: পৃথিবীর সবচেয়ে মধুরতম শব্দ-সুর হচ্ছে আজানের। মুয়াজ্জিনের আজানের ধ্বনিতে জেগে ওঠে পৃথিবী, জেগে ওঠে মানবহৃদয়। পাপ-পঙ্কিলতার জীবন ছেড়ে আল্লাহর আনুগত্যের পথে ধাবিত হয় মানুষ আজানের শব্দ শুনে।

তাই তো মহাকবি কায়কোবাদ লিখেছেন,
‘কে ওই শোনালো মোরে আজানের ধ্বনি,/মর্মে মর্মে সেই সুর,/বাজিলো কী সুমধুর,/আকুল হইলো প্রাণ, নাচিলো ধমনি।/কী মধুর আজানের ধ্বনি।’

মুয়াজ্জিন কর্তৃক প্রার্থনার উদ্দেশ্য দিনের নির্ধারিত সময়ে ৫ বার আহ্বান করাকে আজান বলা হয়। পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের জন্য আজান দেয়া সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ। আজান মানে ঘোষণা বা আহ্বান।

আযান আরবি: أَذَان‎‎ (অথবা আজান হিসেবে উচ্চারণ করা হয় যেমন: আফগানিস্তান, আজারবাইজান, বাংলাদেশ, ভারত, ইরান, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, তাজিকিস্তান, এবং তুর্কমেনিস্তান, ইজান হিসেবে উচ্চারণ করা হয় তুরস্ক, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা), আজন হিসেবে উচ্চারণ করা হয় উজবেকিস্তানে।
ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় নামাজ আদায়ের জন্য আরবি নির্দিষ্ট শব্দমালা দ্বারা উচ্চ স্বরে ঘোষণা দেয়াকে আজান বলে। নামাজের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার আগে আজান দেয়া যাবে না। কখনো কেউ দিয়ে ফেললে ওয়াক্ত হলে আবার আজান দিতে হবে। নারীদের আজান ও ইকামাত দেয়া জায়েজ নয়। আজান ও ইকামাত জামাতের নামাজের জন্য সুন্নত, একার জন্যও দেয়া উত্তম।

আজানের পর নামাজ শুরুর ঠিক আগ মুহূর্তেই দেয়া হয় ইক্বামত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আজানের পর মুমিন মুসলমানের জন্য কিছু করণীয় পালনের দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন।

প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিক-নির্দেশনা পালনে রয়েছে অনেক উপকারিতা। আর সবচেয়ে বড় উপকারিতা হলো বান্দা এ সময়টিতে যা চাইবে তা-ই পাবে। একাধিক হাদিসে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ রকম অনেক ঘোষণা দিয়েছেন।

> আজান ও ইকামতের মধ্যকার সময়টি দোয়া কবুলের অন্যতম সময়। এ সময়ের কোনো চাওয়াই আল্লাহ তায়ালা ফেরত দেন না।

হজরত আনাস ইবনে মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আজান ও ইকামতের মাঝে যে দোয়া করা হয়, তা ফেরত দেয়া হয় না।’ (মুসনাদে আহমদ, আবু দাউদ)।

> মুয়াজ্জিনের সঙ্গে আজানের শব্দগুলো বলার নির্দেশ দিয়েছেন স্বয়ং বিশ্বনবী। অতঃপর তিনি দোয়া করতে বলেছেন। হাদিসে এসেছে-

হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, এক ব্যক্তি বললো, হে আল্লাহর রাসূল! মুয়াজ্জিনদের মর্যাদা যে আমাদের চেয়ে বেশি হয়ে যাবে, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমিও তা-ই বলো, মুয়াজ্জিন যা বলে। তারপর আজান শেষ হলে (আল্লাহর কাছে) চাও। (তখন) যা চাইবে তা-ই দেয়া হবে।’ (আবু দাউদ, মেশকাত)।

> আজান ও ইকামতের উত্তর দেয়ায় রয়েছে জান্নাত লাভের ঘোষণা। অপর একটি বর্ণনায় এসেছে- ‘মুয়াজ্জিনের সঙ্গে সঙ্গে যে ব্যক্তি আজানের শব্দগুলো বলবে, সে জান্নাতে যাবে।’ (আবু দাউদ, মেশকাত)।

> মুয়াজ্জিনের আজানের জবাব দেয়ার পর তাওহিদ ও রেসালাতের সাক্ষ্য দেয়ার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা বান্দার সব গোনাহ ক্ষমা করে দেবেন বলেও ঘোষণা দেন বিশ্বনবী। হাদিসের এক বর্ণনায় বলা হয়েছে- ‘যে ব্যক্তি আজান শোনার পর বলবে,

أشْهَدُ أَنْ لَّا إلَهَ إلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيْكَ لَهُ وَ أشْهَدُ أنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَ رَسُوْلُهُ رَضِيْتُ بِاللهِ رَبًا وَّبِمُحَمَّدٍ رَّسُوْلاً وَبِالإسْلَامِ دِيْنًا


উচ্চারণ : ‘আশহাদু আললা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু; রাদিতু বিল্লাহি রাব্বাও ওয়া বিমুহাম্মাদির রাসূলাও ওয়া বিল ইসলামে দ্বীনা।’

অর্থ : আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, এক আল্লাহ ব্যতিত কোনো উপাস্য নেই, তার অংশীদার নেই। আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল। আমি আল্লাহকে রব হিসেবে এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রাসূল হিসেবে এবং ইসলামকে দ্বীন হিসেবে মেনে নিয়েছি। তাহলে তার গোনাহসমূহ ক্ষমা করে দেয়া হবে।’ (মুসলিম, আবু দাউদ, মিশকাত)।

মনে রাখা জরুরি:

অল্প আমলের মাধ্যমেই মানুষ অনেক সাওয়াব লাভ করবে। প্রতিদিনই মানুষ আজান ও ইকামত শুনে থাকে। আজান ও ইকামতের উত্তর দেয়ার মাধ্যমেই মানুষ গোনাহ মাফ, নিশ্চিত জান্নাত লাভ এবং মনের একান্ত চাওয়াগুলোর পরিপূর্ণতা নিশ্চয়তা রয়েছে।

ফজরের নামাজের আজান:

ফজরের নামাজের আজানে একটু ব্যতিক্রম আছে। আর তা হলো এই যে আজানের শেষভাগে ‘হাইয়া আলাল ফালাহ’ দুই বার বলার পরে ‘আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম’ বাক্যটি দুই বার বলতে হবে। এর পর যথারীতি ‘আল্লাহু আকবার’, ‘আল্লাহু আকবার’, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলে আজান শেষ করতে হবে।

জুমার নামাজের আজান:

জুমার নামাজের আজান দুইবার দিতে হয়। প্রথমত নামাজের ওয়াক্ত হলে মুয়াজ্জিন প্রথমবার আজান দেবেন। আবার মূল খুৎবা শুরুর আগে, ইমাম তথা খতীব মিম্বরে আসীন হলে ঠিক তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ‌‌‌মুয়াজ্জিন দ্বিতীয়বার আজান দেবেন, একে বলা হয় সা-নী আজান। খুৎবা শেষে নামাজ শুরুর প্রাক্কালে ‌‌‌মুয়াজ্জিন যথারীতি ইকামত দেবেন।

আজানের দোয়া:

মুয়াজ্জিন যখন আজানের এক-একটি বাক্য বলা শেষ করবেন তখন শ্রোতা তার উত্তরে একই বাক্য পাঠ করবেন। আজান মনোযোগ দিয়ে শুনতে হয়। এ সময় কোনো কাজ করা বা কথা বলাও নিষেধ। এমনকি এসময় কোরআন শরিফ পাঠ করা স্থগিত রাখতে হয়। আজান শেষে দোয়া করতে হয়।

আজানের দোয়া হলো:

আরবিঃ اللَّهُمَّ رَبَّ هَذِهِ الدَّعْوَةِ التَّامَّةِ وَالصَّلَاةِ الْقَائِمَةِ آتِ سَيّدِنَا مُحَمَّدَاً الْوَسِيلَةَ وَالْفَضِيلَةَ وَابْعَثْهُ مَقَامَاً مَحْمُودَاً الَّذِي وَعَدْتَهُ وَارْزُقْنَا شَفَا عَتَهُ يَوْمَ الْقِيَامَتِه إِنَّكَ لَا تُخْلِفُ الْمِيعَادَ

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা রাব্বাহাযিহিদ দাওয়াতিত্তাম্মাহ ওয়া সালাতি ক্বায়িমা, আতি সায়্যিদিনা মুহাম্মাদানিল ওয়াসিলাতা ওয়াল ফাদিলা ওয়াদ্দারাজাতার রাফিয়াহ, ওয়াব আসহু মাক্কামাম্মাহমুদানিল্লাযি ওয়া আত্তাহ, ওয়ার যুক্বনা শাফা'আতাহু ইয়াওমাল ক্বিয়া-মাহ ইন্নাকা লা তুখলিফুল মিয়াদ।

সুতরাং মুমিন মুসলমানের উচিত আজান শোনার সঙ্গে সঙ্গে আজানের শব্দগুলো যথাযথ উচ্চারণ করা এবং আল্লাহর কাছে একান্ত চাওয়াগুলো লাভে রোনাজারি করা। কেননা তাতে এক দিকে যেমন হাদিসের ওপর যথাযথ আমল হবে অন্যদিকে প্রিয় নবী ঘোষিত উপকারিতাগুলো অর্জিত হবে।

মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা মুসলিম উম্মাহকে দুনিয়া ও পরকালে সফলতা লাভে মনের একান্ত চাওয়াগুলোর পূরণে নিয়মিত আজান ও ইকামতের উত্তর দেয়ার তাওফিক দান করুন। আল্লাহুম্মা আমিন।

 -সেবা হট নিউজ: সত্য প্রকাশে আপোষহীন

,

0 comments

Comments Please