
জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার চর আমখাওয়া ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী সানন্দবাড়ী বাজার এলাকায় আগুন লাগা যেন একটি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজকে এই আগুন নিয়েই সাংবাদিক জাকিউল ইসলামের কিছু কথা পড়বো।
আমি স্মৃতিচারণ করছি মূলত সাংবাদিক হিসেবে। আমি যে সত্যবাদী সাংবাদিক সেটা হয়তো বলবো না কারণ আমি মানুষ, আর মানুষই ভুল করে। অনেক ঘটনা বা তথ্য সরাসরি না দেখলেও সোর্সের চোখের মাধ্যমে দেখতে বা শুনতে হয়।
আরও পড়ুন>> সানন্দবাড়ী বাজারে ভয়াবহ আগুন, ক্ষয়ক্ষতি প্রায় ৫ কোটি
আগুন লাগার উল্লেখযোগ্য সাল ১৯৮৩, ২০০৭, ২০১০, ২০১২ এবং ২০১৬। এ ছাড়াও গেলো বছরের ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯। একটি কথা প্রথমেই পরিষ্কার করে বলে নেই। কতবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে সানন্দবাড়ীতে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপন করা হবে আমার তা জানা নেই। এক, দুই কিংবা তিন বছর অন্তর অন্তর একটা ঘটনার সময় আমার গলাটা একদম শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। রাতের খাবার, পরে সারাদিনের দৌঁড় ঝাঁপের ক্লান্ত শরীর নিয়ে যখন বালিশে মাথা দেই। হয় তখনই, না হয় একটু পরই সানন্দবাড়ী বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ থেকে মাইকিং হয়। বাজারে আগুন ধরেছে আপনারা বালতি জগ নিয়ে তাড়াতাড়ি চলে আসেন।
বড় ভাই জিয়াউল মোটরসাইকেল স্টার্ট দিয়ে চলে গেলেন এবং মাকে বলে গেলেন আমি যেন তাড়াতাড়ি যাই। আমার বৃদ্ধ জননীও বাজারে আগুন ধরেছে বলতে বলতে ক্লান্ত। তাড়াহুড়ো করে প্যান্টটা পরলেও মোটরসাইকেলের চাবিটা চোখের সামনে থেকেও খুঁজে পাই না। গত ৬ সেপ্টেম্বর শুক্রবার সকাল দশটার সময় আজিজ ব্যাপারীর পাট গুদামে আগুন লেগে ক্ষয়ক্ষতি হয়। দেড়টার দিকে জুম্মার ফরজ নামাজে দাঁড়িয়েছি মাত্র মহল্লার মসজিদে। আমি শুনতে না চাইলেও আগুনের কথা মাইকিং হচ্ছে। অনাকাংক্ষিতভাবে শব্দ কানে চলে আসে।
নামাজ শেষ করে যতদ্রুত সম্ভব রওনা হলাম। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বেশির ভাগ সময় রাতেই দেখেছি। এবার একটু ব্যতিক্রম ঘটলো। গিয়ে দেখি ওই গলিতে মানুষ আর মানুষ। অনেক কষ্টে মানুষকে বিলি দিয়ে অযুখানা পর্যন্ত পৌঁছালাম। স্কুল, কলেজ পড়ুয়া এবং বড় ভাই ও ব্যবসায়ীরা প্রাণপণে চেষ্টা করছে আগুন নেভানোর। ওখানে আমি যাওয়া মানে ওদের কাজে ব্যাঘাত ঘটানো, এমনটাই মনে হলো আমার। আমি অবস্থান নিলাম পানির ট্যাংকের ওপরে। ওইখান থেকেই ফায়ারস্টেশনের ভাইদের সাথে যোগাযোগ করছি মোবাইলে এবং তাড়া দিচ্ছিলাম ভাই তাড়াতাড়ি আসতে হবে। ওপাশ থেকে বলছে ভাই রাস্তা খুবই খারাপ।
অতঃপর মোবাইলে লাইভ দিয়ে এক হাফেজ পড়ুয়া ছাত্রের হাতে দিয়ে রাখি। ওকে যেভাবে বলেছি সেভাবেই চেষ্টা করেছে দেখানোর। অনেক পরে আমার হুস হয়েছিলো জায়গার নাম বলা হয়নি। কিছুটা চেষ্টাও করেছি। যারা আগুন নেভানোর চেষ্টা করছে তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবো এটা হতে পারে না। যাতায়াতের পথে বাঁধা সৃষ্টি করার কারণে অনেকের সাথে ঝগড়া করতেও দেখা গেছে।
আগুনে যার পুড়লো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সেই বুঝে তপ্ত যন্ত্রণা। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ভালো করেই জানেন ওই অঞ্চলের মানুষগুলো ৭২ ঘন্টা পরে বেমালুম সব ভুলে যাবে। তাৎক্ষণিক পুড়ে যাওয়া ঘটনাস্থল জামালপুর ফায়ার সার্ভিসের (এডি) কুব্বাত আলী ছাড়া কেউ দেখতে আসেনি। পরবর্তীতে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সোলায়মান হোসেন ও ভাইস চেয়ারম্যান দেওয়ান ইমরান পুড়ে যাওয়া দোকান পরিদর্শন ও ব্যবসায়ীবৃন্দের সাথে কথা বলেন।
আমাদের সচেতনতা বৃদ্ধি হচ্ছে না। সচেতনতার অভাব আর সমন্বয়হীনতার ফলে ঠেকানো যাচ্ছে না এসব আগুন লাগা। বৈদ্যুতিক স্থাপনায় অধিক মজবুত ও টেকসই যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করা। অপরিকল্পিত সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করা। আগুন এমন একটি বিপদ সংকেত, আগামীকাল আবার দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকে বা ঘটবে। আমি আগুন ধরা হয়তো আটকাতে পারবো না কিন্তু ফায়ার সার্ভিস স্টেশন থাকলে ১২টা দোকান হয়তো পুড়তো না। আর আশপাশের দোকানগুলো তড়িঘড়ি করে ভাঙা হতো না। একটা দোকানের কিছু কাপড় হয়তো পুড়তো। চর্তুদিক থেকে ক্ষতি হয় শুধু মাত্র ফায়ার সার্ভিস স্টেশন না থাকার কারণে।
আরও পড়ুন>> সানন্দবাড়িতে একই বাড়িতে দফায় দফায় অগ্নোৎপাত
অন্য কোনো বাজারে এতবার অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে বলে আমার মনে হয় না। এই এলাকার যারা বড় সুধীজন আছেন। আমার মতো হয়তো আরও অনেকেই আছেন যারা আগুনের এই ভয়াবহতার মুক্তির পথ খোঁজেন কিন্তু এ বিষয়ে সচেতন মহলের সমন্বয়ে একটি সু-চিন্তিত মতামতের ভিত্তিতে এমন একটি উপায় বের করতে হবে যাতে অগ্নিকাণ্ড রোধ করা না গেলেও তাতে ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা যায়।
আমি দেখতে চাই না অগ্নিকাণ্ডে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পুড়ে যাওয়া মানুষের আর্তনাদ। এও দেখতে চাই না, ফায়ার সার্ভিসের টিম এসে আগুন নিভে যাওয়া ছাঁইয়ের মধ্যে পানি নিক্ষেপ করে তাদের ৩৫ কিলোমিটার দূর থেকে আসা সার্থক করা। একজন মানুষের শেষ সম্বলটুকু দিয়ে বাজারে একটি দোকান নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। ব্যবসার মাধ্যমেই ওখানে বসেই স্বপ্ন দেখেন পরবর্তী প্রজন্মকে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে দেওয়ার কিন্তু হঠাৎ অগ্নিকাণ্ডে দোকান পুড়ে যাওয়ার সাথে সাথে শেষ হয়ে যায় তার সব স্বপ্ন। তাই বলতে ইচ্ছে হচ্ছে যে, সানন্দবাড়ীতে একটি ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপন করা খুবই জরুরি বিষয়। জানি না কবে স্থাপন করা হবে সানন্দবাড়ী ফায়ার সার্ভিস স্টেশন?
লেখক
জাকিউল ইসলাম
লেখক ও সাংবাদিক,
সানন্দবাড়ি, দেওয়ানগঞ্জ
তথ্য: বাংলারচিঠিডটকম -সেবা হট নিউজ: সত্য প্রকাশে আপোষহীন

খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।