বাঁশখালীতে উচ্ছসিত অভিভাবকেরা, ১৮ মাস পর খুলছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

বাঁশখালীতে উচ্ছসিত অভিভাবকেরা, ১৮ মাস পর খুলছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

ক্যাপশনঃ ধোয়া-মোছা ও আঙ্গিনা পরিস্কারের কাজে ব্যস্থ মধ্যম শিলকূপ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা



শিব্বির আহমদ রানা, বাঁশখালী প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: বিশ্ব মহামারি কোভিড-১৯ পরিস্থিতে দীর্ঘ ১৮ মাস ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রয়েছে। জীবনের অতীব প্রয়োজনের তাগিদে অন্যান্য কর্মক্ষেত্র ও প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সময়ে খোলার ব্যবস্থা থাকলেও বন্ধ ছিল শিক্ষাপ্রতিষ্টানগুলো। 

আগামী ১২ সেপ্টেম্বর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তাই শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরাতে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে চলছে জোর প্রস্তুতি। 

দীর্ঘসময় ধরে বই ও খাতা কলমের সাথে দূরত্ব বজায় থাকা শিক্ষার্থীরা গোছাচ্ছেন তাদের পাঠ্য বই ও ব্যাগ। 

সরকারের শিক্ষাপ্রতিষ্টান খোলার ঘোষণার পরপরই যেন ইদ উৎসবের মতো অানন্দ উপভোগ করছে শিক্ষার্থীরা। 

অনেকের কাছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফেরার বিষয়টাকে নতুন অভিজ্ঞতা মনে করেছে। আবার ফের শিক্ষার্থীরা মিলিত হবে তাদের বিদ্যাপীঠে। 

এ দু'বছরের কাছাকাছি সময়ে অনেক শিক্ষার্থী তাদের পড়ালেখা ছেড়ে দিয়েছে। শিক্ষার্থী আগের চেয়ে বহুগুণ কমে যাওয়ার শংকা প্রকাশ করেছে শিক্ষক ও অভিভাবকেরা।

আজ বুধবার সরেজমিনে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানগুলোতে চলছে ধোয়া-মোছার কাজ। দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্টান বন্ধ থাকায় জানালার ফাঁকা জায়গা দিয়ে ডুকেছে পরগাছা লতাপাতা। 

মরিচা ধরেছে লোহার দরোজা, জানালায়। শ্রেনীকক্ষের প্রতিটি কোণায় ও ছাদে বেঁধেছে মাকড়শারজাল। ধুলোর আবরণ পড়া বেঞ্চগুলো এরই মধ্যে পরিষ্কার করা হয়েছে। 

দূরত্ব বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় বেঞ্চ সংযোজন করা হচ্ছে। প্রবেশ গেটে 'নো মাস্ক, নো স্কুল' সহ বিভিন্ন সচেতনতা ও নির্দেশনামূলক লেখা টানানো হয়েছে। 

এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের জটলা ভিড় এড়াতে নির্দিষ্ট দূরত্বে বৃত্ত অঙ্কন করে দেওয়া হয়েছে কোন কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। 

পরিপাটি স্কুল-কলেজের আঙিনা যেন শিক্ষার্থীদের অপেক্ষার প্রহর গুনছে। বিদ্যালয় পাড়াগুলোতে যেন সাজ সাজ রব উঠেছে। 

একই সাথে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলোতে বাচ্চাদের জ্বর মাপার জন্য থার্মোমিটার, হ্যান্ড স্যানিটাইজারসহ প্রয়োজনীয় উপকরণও রাখা হয়েছে। তবে প্রস্তুতির কাজে শহরের চেয়ে গ্রামের প্রতিষ্ঠানগুলো কিছুটা পিছিয়ে আছে। 

অনেকেই সাধ্যের মধ্যে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও করোনা মহামারি এড়াতে নিয়েছে নানা সচেতনতামূলক প্রস্তুতি।

উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে জানা যায়, বাঁশখালীতে সরকারি-বেসরকারি ২ শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে ১৬০টি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৫৩ টি ইবতেদায়ী মাদরাসা, ৩১ টি উচ্চ বিদ্যালয়, ২০টি দাখিল মাদরাসা, ৭টি আলিম মাদরাসা, ৪টি ফাজিল মাদরাসা, ২টি কামিল মাদরাসা, কলেজ (সহপাঠ) ৪টি, কলেজ (বালিকা) ১টি। এসব প্রতিষ্ঠানে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৭৫ হাজার। 

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানেরা বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে প্রতিষ্ঠান খোলার জন্য সার্বিক প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি নির্দেশনা মেনে পাঠদান অব্যাহত রাখতে সক্ষম হবে বলে আশা করছেন তারা। 

তবে, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার শংকাও প্রকাশ করছে তাঁরা।

পশ্চিম চাম্বল ডেপুটিঘোনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জোবায়ের জসিম প্রতিবেদককে বলেন, 'দীর্ঘ ১৮ মাস পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার সিদ্ধান্তে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। 

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ আবার মুখরিত হবে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পদভারে। আমার বিদ্যালয়ে ইতোমধ্যে নিরাপদ পানির উৎস স্থাপন করা হয়েছে। 

বেসিনে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পর্যাপ্ত সাবান, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, মাস্ক মজুদ রাখা হয়েছে। বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় এ বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি উপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। 

যে কোনো গুজব সম্পর্কে  সবাইকে সজাগ থাকার আহবান জানানো হয়। প্রতি বেঞ্চে ২ জন শিক্ষার্থী বসানো এবং তিন ফুট দূরত্ব বজায় রেখে শ্রেণি বিন্যাস ঠিক করা হচ্ছে। 

ইতোমধ্যে আমার বিদ্যালয় খোলার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।'

বাঁশখালী উপজেলার স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বঙ্গবন্ধু উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুহাম্মদ ওমর ফারুখ প্রতিবেদককে বলেন, 'শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। 

প্রতিষ্ঠানে ২৮শত শিক্ষার্থীদের জন্য ৩৮টি শ্রেণিকক্ষ রয়েছে। সরকারি নির্দেশনার আলোকে এরই মধ্যে বেসিন স্থাপন করা হয়েছে। 

কোনোভাবেই গাদাগাদি করে শিক্ষার্থীদের ক্লাস করার সুযোগ নেই। আমরা প্রতি বেঞ্চে একজন করে শিক্ষার্থী বসানোর পরিকল্পনা করছি। 

প্রতিনিয়ত শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।'

বাঁশখালী পৌরসভাস্থ রঙ্গিয়াঘোনা মনছুরিয়া ফাযিল মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ ইসমাইল প্রতিবেদককে বলেন, 'এবারের প্রস্তুতিটা বেশ ভিন্নরকম। কেননা শুধু অবকাঠামো পরিষ্কারই নয়, করোনা সংক্রমণের শঙ্কা বিবেচনায় রেখে স্বাস্থ্যবিধি মানার ওপর গুরুত্ব দিতে হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। 

করোনার মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জে আমাদের জয়ী হতে হবে। আমার প্রতিষ্ঠানে ১২ শত শিক্ষার্থী আছে। 

সবার জন্য বিধিসম্মতভাবে ক্লাস করার জন্য শ্রেনীকক্ষ যথেষ্ট রয়েছে।'

বাঁশখালী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. নূরুল ইসলাম প্রতিবেদককে বলেন, 'উপজেলার ১৬০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে বিদ্যালয় খোলার প্রাকপ্রস্তুতি গ্রহণের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। 

সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার সৈয়দ আবু সুফিয়ান ও অপর সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার আবু বকর মোহাম্মদ ছিদ্দিকী বিভিন্ন বিদ্যালয়ের প্রাকপ্রস্তুতি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন। 

১২ সেপ্টেম্বর স্কুল খোলার কথা থাকলেও শিক্ষকেরা নিয়মিত স্কুলে গিয়ে ক্লাসরুম, টুল-বেঞ্চ, আঙিনা ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজে সহযোগিতা করছেন।'

বাঁশখালী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মুহাম্মদ মামুন প্রতিবেদককে বলেন, 'বাঁশখালীর ৩১ টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের নিয়ে মতবিনিময় করা হয়েছে। বিদ্যালয় খোলার পূর্বে মাঠ পর্যায়ে শতভাগ প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশনা এসংক্রান্ত একটি গাইড লাইনও প্রদান করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, মহামারি করোনার কারণে গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। 



শেয়ার করুন

-সেবা হট নিউজ: সত্য প্রকাশে আপোষহীন

0 comments

মন্তব্য করুন

খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।