৪৫৩ বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্যের নিদর্শন বাঁশখালীর বখশি হামিদ জামে মসজিদ

৪৫৩ বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্যের নিদর্শন বাঁশখালীর বখশি হামিদ জামে মসজিদ
চট্টগ্রামের ইতিহাস ঐতিহ্যের নিদর্শন ৪৫৩ বছরের পুরানো বখশি হামিদ জামে মসজিদ। ছবি: শিব্বির আহমেদ রানা



শিব্বির আহমদ রানা, বাঁশখালী, চট্টগ্রাম: বাংলার প্রাচীন ইতিহাস থেকে জানা যায় মোগল শাসনামলে এদেশে ইসলামের শাশ্বত বাণী প্রচারের লক্ষ্যে আরব সাগর পাড়ি দিয়ে ধর্ম প্রচারকগণ এসেছেন। 

চট্টগ্রামের উপকূলীয় অঞ্চলে তারা প্রথমে বসতি স্থাপন করেছেন সে সময়ে। সেজন্য এসব এলাকায় রয়েছে বহু প্রাচীণ মসজিদ, মাদরাসা ও বুজুর্গের কবরস্থান সহ নানা নিদর্শন। 

বাঁশখালীর মধ্য ইলশা বখশী হামিদ জামে মসজিদও তেমনি একটি ঐতিহ্যবাহী মসজিদ এবং প্রাচীন নিদর্শন। এই মসজিদটি নির্মিত হয়েছে ইট, পাথর ও সুরকি ব্যবহার করে। 

ইসলাম ধর্মের প্রচার-প্রসারের ক্ষেত্রে এটি একটি মাইলফলক হিসেবে সমাদৃত। ইসলামী সভ্যতা-সংস্কৃতির বিকাশে তৎকালীন সময়ে এই মসজিদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। 

মুসলিম শিক্ষা-সংস্কৃতির ভিত রচনা করে এ মসজিদ। 

মসজিদে রক্ষিত ফলকে আরবিতে লেখা আছে: 

‘‘বনাল মাসজিদুল মোকারেম ফি আহমিদ-মূলক, ইসনাদুল মিল্লাত ওয়াদ্দিন সুলতানুল মুয়াজ্জাম সুলাইমান (করবানী) সালামালাহু আনিল ওয়াফাত ওয়াল বলিয়্যাতি মুরেখাত তিসযু রমজান, খামছুন ও সাবয়িনা ওয়া তিসআতু মিআত হিজরী আলাইহিস সালাম।’’ 

অর্থাৎ, এই মসজিদ নির্মিত হয়েছে সেই বাদশাহর যুগে যাকে উপাধি দেয়া হয়েছে দ্বীন এবং মিল্লাতের সুলতানুল মুয়াজ্জম তথা-মহান সম্রাট আর তিনি হলেন সুলাইমান কররানী, (আল্লাহ তাকে বিপদাপদ থেকে মুক্ত রাখুন) তারিখ-৯৭৫ হিজরী সালের ৯ রমজান। যার ইংরেজি সন ১৫৬৮ সালের ৯ মার্চের সাথে মিলে যায়।

খোদাইকৃত শিলালিপির মতে, এটি সুলাইমান কররানী কর্তৃক প্রতিষ্ঠা করার কথা থাকলেও লোকমুখে বখশী হামিদের নির্মিত মসজিদ বলে পরিচিত। 

স্থানীয় মুরববীরা বলেন, বখশী হামিদের পুরো নাম মুহাম্মদ আবদুল হামিদ, বখশী তার উপাধি। বখশী ফার্সি শব্দ। এর অর্থ কালেক্টর বা করগ্রহীতা। 

তৎকালীন সময়ে বখশী হামিদ এতদাঞ্চলের কালেক্টর তথা প্রশাসক ছিলেন। তিনি এলাকার শিক্ষা, সভ্যতা, সংস্কৃতির ব্যাপক উন্নতি সাধন করেন। 

জনশ্রুতি অনুসারে তৎকালীন সময়ে এ এলাকায় প্যারাবন ছিল। ঝোঁপঝাড়ে জনবসতি ছিল না। ইউসুফ ও কুতুব নামে গৌড়ের দুজন আমির শাহ আবদুল করিম নামক জনৈক সুফীর সঙ্গে গৌড় ছেলে উপযুক্ত বাসস্থানের সন্ধানে বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে বাঁশখালী এ জায়গায় অবতরণ করেন। 

তারা উপকরণ নিয়ে বাঁশখালীর ইলশার দরগাহ বাড়ির স্থানে পৌঁছলে শাহ সাহেব ইল্লাল্লাহ শব্দ উচ্চারণ করে তার ছড়ি পুঁতে রাখেন এবং সেখানে বসবাসের ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। 

এ সময় থেকে স্থানটি ইল্লাল্লাহ শাহের স্থান এবং পরে ইলশায় রূপান্তরিত হয়। বখশী আবদুল হামিদ উক্ত শাহ্ শাহের অধস্তন বংশধর। 

কেউ কেউ মনে করেন গৌড় থেকে আগত সুফী দরবেশের মধ্যে একজন ছিলেন সুলাইমান। তিনি নেতৃস্থানীয়ও সাধক ছিলেন। জ্ঞানেগুণে অসাধারণ বিচক্ষণ ও প্রভাবশালী ছিলেন। সবাই তাকে সুলতান বলে ডাকত। 

তিনি এ মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেন এবং পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের পর মুরববীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনার্থে একমাত্র কন্যাটি উপজেলার জলদী গ্রামে বিয়ে দেয়া হয়। তার দুই ভাই ছিল। অলি বুজুর্গের আবাদকৃত এ গ্রামে বহু দ্বীনদার পীর মাশায়েখের আবির্ভাব হয়েছিল। 

তম্মধ্যে শাহ চান মোল্লা অন্যতম। তিনি এ মসজিদের নির্মাণের সমসাময়িক যুগের বলে অনেকের ধারণা।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৫ সালে এটি প্রটেকটেড মনুমেন্ট এন্ড মৌন্ডস ইন বাংলাদেশ এর তালিকায় স্থান পাওয়ায় কিছু সংস্কার হয়েছে। 

মোঘল স্থাপত্য কৌশলে নির্মিত এ মসজিদটি তিন গম্বুজবিশিষ্ট, মাঝেরটি অপেক্ষাকৃত বড় এবং ছোট গম্বুজ দুটি ধনুকের মতো করে ছাদের সঙ্গে যুক্ত।

মসজিদের পূর্ব পার্শ্বে প্রাচীন কালের সান বাঁধানো একটি সু-বিশাল পুকুর রয়েছে, পুকুরে মাছ চাষ করা হয় এবং পানি ব্যবহার করে মুসল্লিরা অজু করে। 

মসজিদের পশ্চিমে কবরস্হান পূর্বে উত্তরে গড়ে উঠেছে সু বিশাল মাদ্রাসা ও এতিমখানা সহ ইসলামী কমপ্লেক্স। এ কমপ্লেক্সের নাম রাখা হয় দারুল কোরআন মুহাম্মদিয়া শাহ আব্দুল হামিদ মাদ্রাসা ও এতিমখানা। সাথে গড়ে উঠেছে শাহ্ মজিদিয়া আদর্শ দাখিল মাদরাসা। 

শিক্ষাবঞ্চিত জনপদে বখশি হামিদ জামে মসজিদকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আলো ছড়াচ্ছে। রাতে গুনগুন করে হেফজখানায় কোরআনের তেলাওয়াৎ, দিনভর মাদরাসা মাতিয়ে তুলছে শিক্ষার্থীরা। 

বখশি হামিদ (রহ:) এর দ্বীন প্রচার ও প্রসারের যে স্বপ্ন তিনি দেখেছেন তা আরো পরিপূর্ণতা পেল মসজিদকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। 

এখানে মনকাড়ানোর মতো দৃশ্যের অন্যতম মসজিদ, মসজিদের বিশাল পুকুর ও সজ্জিত পুকুরঘাট, পাশে পুরো বটবৃক্ষসমেত বখশি হামিদের কবর।

এই পুরানো ঐতিহ্যের মসজিদে প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজ আদায় করার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে ধর্মপ্রান মুসল্লি সমাবেত হয় এই। বর্তমানে মসজিদ টি খুব সুন্দর করে নতুন সাজে সজ্জিত করে গড়ে তুলেছেন মসজিদ পরিচালনার পরিষদ।

ইতিহাস সূত্রে পাওয়া এই মসজিদটি পরিদর্শনে অনেক গবেষকসহ অনেকে আগমন করে। বিশেষ করে প্রতি জুমাবার নামায আদায় করতে ঐতিহাসিক নিদর্শন মসজিদটি পরিদর্শনে আসেন সারা দেশের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার লোক মন্ত্রী, এমপি, ভাবুক থেকে শুরু করে সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন পেশার মানুষ। 

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের রাস্ট্রদূত এ ঐতিহাসিক মসজিদ পরিদর্শনে এসে অভিভূত হয়েছেন। এই ঐতিহাসিক স্থাপনায় প্রবেশের রাস্তাটি খুবই সংকীর্ণ যার দরুণ বহিরাগতদের যাতায়াতে অসুবিধা হয়। যাতায়াতের এ সড়কটির আস্তর উঠে গিয়ে এখন খানাখন্দে রুপ নিয়েছে। 

সাধারণ যানবাহন ত দূরের কথা স্বাভাবিকভাবে লোকজনের হাঁটাচলাও কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। বড় কোন গাড়ী প্রবেশ করতে পারেনা। এই রাস্তাটি আরো প্রশস্ত ও সংস্কার করার প্রয়োজন।

অবস্থান: 

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের মধ্য ইলশায় অবস্থিত ৪৫০ বছরের ঐতিহ্যবাহী বখশি হামিদ মসজিদটি।

যে ভাবে যাবেন: 

চট্টগ্রাম শহর বহদ্দারহাট টার্মিনাল থেকে সোজা আনোয়ারা-বাঁশখালী অাঞ্চলিক সড়কে (বাঁশখালী স্পেশাল সার্ভিস, সুপার সার্ভিস, সিনেমাপ্যালেস থেকে এস.আলম সার্ভিস) বাসে করে গুনাগরী খাসমহাল বাজারে নামতে হবে। বাজার থেকে সোজা পশ্চিমে ইলশা মোশাররফ আলী সড়ক হয়ে সিএনজি যোগে যাওয়া যায় এ মসজিদে। ঢাকা থেকে আসতে চাইলে সৌদিয়া সার্ভিসে করে সোজা গুনাগারি স্টেশনে নেমে যাওয়া যায়।


শেয়ার করুন

-সেবা হট নিউজ: সত্য প্রকাশে আপোষহীন

,

0comments

মন্তব্য করুন

খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।