রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে জাতিসংঘে শেখ হাসিনার পাঁচ দফা দাবি

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে জাতিসংঘে শেখ হাসিনার পাঁচ দফা দাবি





নূরুজ্জামান খান: রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট ধীরে ধীরে বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে হুমকি হয়ে উঠছে। আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা সমগ্র বিশ্বের শরণার্থী, সেই সঙ্গে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের জন্য যে মানবিকতা দেখিয়েছেন তা বিশ্ববাসীর কাছে একটি উদাহরণ হয়ে থাকবে।


আজ বিশ্বদরবারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ বা ‘মানবতার মা’ হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছেন।


প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা সংকট নিরসনসহ স্থায়ী সমাধানে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭২তম অধিবেশনে পাঁচ দফা প্রস্তাব রাখেন।


জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭২তম অধিবেশনে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনসহ স্থায়ী সমাধানে পাঁচ দফা প্রস্তাব হলো: 


১. অনতিবিলম্বে এবং চিরতরে মিয়ানমারে সহিংসতা ও ‘জাতিগত নিধন’ নিঃশর্তে বন্ধ করা;

২. অনতিবিলম্বে মিয়ানমারে জাতিসংঘের মহাসচিবের নিজস্ব একটি অনুসন্ধানী দল (Fact Finding Mission) প্রেরণ করা;

৩. জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকল সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা বিধান করা এবং এ লক্ষ্যে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে সুরক্ষা বলয় (safe zones) গড়ে তোলা; 

৪. রাখাইন রাজ্য হতে জোরপূর্বক বিতাড়িত সকল রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে তাদের নিজ ঘরবাড়িতে প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা;  

৫. কফি আনান কমিশনের সুপারিশমালার নিঃশর্ত, পূর্ণ এবং দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।’


এছাড়াও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৩তম অধিবেশনে বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বিশ্বব্যাপী বিপুলসংখ্যক নিপীড়িত ও রোহিঙ্গাদের মতো নিজ গৃহ থেকে বিতাড়িত মানুষের দুঃখ-দুর্দশা আমার হৃদয়কে ব্যথিত করে। এ জাতীয় ঘটনাকে অগ্রাহ্য করে শান্তিপূর্ণ, ন্যায্য ও টেকসই সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমাদের দেশের মানুষের ওপর পাকিস্তানী সেনাবাহিনী যে গণহত্যা চালিয়েছিল মিয়ানমারের ঘটনা সে কথাই বার বার মনে করিয়ে দেয়। ১৯৭১ সালে ৯ মাসের যুদ্ধে পাকিস্তানীরা ৩০ লাখ নিরীহ বাঙালিকে হত্যা করেছিল। ২ লাখ নারী পাশবিক নির্যাতনের শিকার হন। এক কোটি মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। আমার বাবাকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তানে নিয়ে যায়। আমার মা, ছোট দুই ভাই, বোনসহ আমিও বন্দি হই। সে সময় আমি সন্তান-সম্ভবা ছিলাম। আমার প্রথম সন্তানের জন্ম হয় বন্দি অবস্থায়। নোংরা ও স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশে আমাদের থাকতে হত।


বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের যে বিবরণ জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে তাতে আমরা হতভম্ব। আমরা আশা করি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষ করে জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের উপর ঘটে যাওয়া অত্যাচার ও অবিচারের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখবে।


জনাব সভাপতি, একজন মানুষ হিসেবে রোহিঙ্গাদের দুঃখ-দুর্দশাকে আমরা যেমন অগ্রাহ্য করতে পারি না, তেমনি পারি না নিশ্চুপ থাকতে। আমার পিতা-মাতাসহ পরিবারের সদস্যদের হত্যার পর আমাকেও দীর্ঘ ছয় বছর দেশে ফিরতে দেওয়া হয়নি। আমরা দুই বোন শরণার্থী হিসেবে বিদেশে অবস্থান করতে বাধ্য হয়েছিলাম। তাই আপনজন হারানো এবং শরণার্থী হিসেবে পরদেশে থাকার কষ্ট আমি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পারি।


মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তচ্যূত ও অসহায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর দুর্দশার স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধানে গত বছর সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে আমি পাঁচ-দফা প্রস্তাব পেশ করেছিলাম। আমরা আশাহত হয়েছি, কেন না আমাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের স্থায়ী ও টেকসই প্রত্যাবাসন শুরু করা সম্ভব হয়নি।


মিয়ানমার আমাদের প্রতিবেশী দেশ। প্রথম থেকেই আমরা তাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সমস্যার একটা শান্তিপূর্ণ সমাধানের চেষ্টা করে যাচ্ছি। ইতোমধ্যে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার-এর মধ্যে একাধিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। তবে, মিয়ানমার মৌখিকভাবে সব সময়ই রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবে বলে অঙ্গীকার করলেও বাস্তবে তারা কোনও কার্যকর ভূমিকা নিচ্ছে না।


বাংলাদেশে অবস্থানরত এগার লক্ষাধিক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী মানবেতর জীবনযাপন করছে। আমরা সাধ্যমত তাদের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, নিরাপত্তা, শিশুদের যত্নের ব্যবস্থা করেছি। এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘ, কমনওয়েলথ, ওআইসিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা সহানুভূতি দেখিয়েছেন এবং সাহায্য ও সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। এ জন্য আমি তাদের সকলের প্রতি জানাই কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ।


রোহিঙ্গারা যতদিন তাদের নিজ দেশে ফেরত যেতে না পারবেন, ততদিন সাময়িকভাবে তারা যাতে মানসম্মত ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে বসবাস করতে পারেন, সে জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সকল ধরনের সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা রেখে আমরা নতুন আবাসন নির্মাণের কাজ শুরু করেছি। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে এ কাজে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। একইসঙ্গে রোহিঙ্গারা যাতে সেখানে যেতে পারেন তার জন্যও আমি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতা চাচ্ছি।


যেহেতু রোহিঙ্গা সমস্যার উদ্ভব হয়েছে মিয়ানমারে তাই এর সমাধানও হতে হবে মিয়ানমারে। জাতিসংঘের সঙ্গে মিয়ানমারের যে চুক্তি হয়েছে আমরা তারও আশু বাস্তবায়ন ও কার্যকারিতা দেখতে চাই। আমরা দ্রুত রোহিঙ্গা সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান চাই।


মানবতার দৃষ্টান্ত দেখিয়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়ায় সংবাদ সংস্থা ইন্টার প্রেস সার্ভিস থেকে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর আগে জাতিসংঘের সাবেক দুই মহাসচিব কফি আনান ও বুট্রোস ঘালি এবং ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট মার্তি আহতিসারি এই সম্মাননা পেয়েছিলেন।


মানবতার দৃষ্টান্ত দেখিয়ে লাখো রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়া এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে দূরদর্শী ও বিচক্ষণ নেতৃত্বের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মানেও ভূষিত হয়েছেন। 


শেয়ার করুন

-সেবা হট নিউজ: সত্য প্রকাশে আপোষহীন

,

0comments

মন্তব্য করুন

খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।