বকশীগঞ্জে টিআর কাবিখা কাবিটার ৫ কোটি টাকার প্রকল্পে লুটপাট: কাগজে আছে, বাস্তবে নেই

Seba Hot News : সেবা হট নিউজ
0

নিজস্ব প্রতিবেদক, জামালপুর: জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলায় গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের নামে আসা সরকারি বরাদ্দের কোটি কোটি টাকা হরিলুটের অভিযোগ উঠেছে।

Looting at TR Kabikha Kabita's Tk 5 crore project in Bakshiganj: It's on paper, not in reality
বকশীগঞ্জে টিআর কাবিখা কাবিটার ৫ কোটি টাকার প্রকল্পে লুটপাট: কাগজে আছে, বাস্তবে নেই।। ছবি: আমার দেশ




২০২৪-২৫ অর্থবছরে উপজেলার গ্রামীণ জনপদ উন্নয়নের লক্ষ্যে টিআর কাবিখা কাবিটা (টেস্ট রিলিপ, কাজের বিনিময়ে খাদ্য ও কাজের বিনিময়ে টাকা) কর্মসূচির আওতায় ৫ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সরেজমিনে দেখা গেছে, কাগজ-কলমে প্রকল্পের শতভাগ কাজ সম্পন্ন দেখানো হলেও বাস্তবে অধিকাংশ প্রকল্পের কোনো অস্তিত্বই নেই। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশে এই বিশাল অঙ্কের প্রকল্পে লুটপাট চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের।

গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান এবং অবহেলিত এলাকার রাস্তাঘাট মেরামতের উদ্দেশ্যে সরকার এই বিপুল অর্থ বরাদ্দ দিলেও বকশীগঞ্জে তা সাধারণ মানুষের কোনো উপকারে আসেনি। উল্টো শ্রমিকের বদলে অবৈধভাবে ভেকু ও ড্রেজার মেশিন ব্যবহার, নামমাত্র কাজ করে বিল উত্তোলন এবং প্রকল্প এলাকায় বাধ্যতামূলক সাইনবোর্ড না টাঙিয়ে গোপনীয়তা রক্ষার মাধ্যমে সরকারি অর্থের ভয়াবহ অপচয় করা হয়েছে।

 
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বকশীগঞ্জ উপজেলায় টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ে মোট বরাদ্দ ছিল ৫ কোটি ১২ লাখ ১ হাজার ৭৯৮ টাকা। এর মধ্যে গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নগদ অর্থ এবং চাল-গম বরাদ্দ ছিল প্রায় ৫ কোটি ৬ লাখ ১ হাজার ৭৯৮ টাকা। এছাড়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে শুকনো খাবার বিতরণের জন্য ৩ লাখ টাকা এবং বিভিন্ন দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় পরিবারকে গৃহনির্মাণ সহায়তার জন্য ঢেউটিন ক্রয়ের জন্য আরও ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের আওতায় প্রায় ২০৩টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, এসব প্রকল্পের কাজ স্থানীয় দরিদ্র শ্রমিকদের দিয়ে করানোর কথা, যাতে তাদের কর্মসংস্থান হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। শ্রমিকদের বঞ্চিত করে ঠিকাদার ও প্রকল্প সভাপতিরা ভেকু (এক্সকাভেটর), ড্রেজার মেশিন, ছোট ট্রাক ও মাহিন্দ্র ট্রলি ব্যবহার করে মাটি কাটার কাজ করেছেন। কোথাও কোথাও নামমাত্র মাটি ফেলে পুরো বিল তুলে নেওয়া হয়েছে। আবার অনেক জায়গায় কাজ শুরু করার আগেই বা আংশিক কাজ করেই বিল ভাউচার জমা দিয়ে টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো, প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য কাজের বিবরণ, বরাদ্দের পরিমাণ এবং প্রকল্প কমিটির নাম সম্বলিত সাইনবোর্ড দৃশ্যমান স্থানে টাঙানোর নিয়ম থাকলেও উপজেলার ২০৩টি প্রকল্পের অধিকাংশ স্থানেই কোনো সাইনবোর্ড খুঁজে পাওয়া যায়নি। ফলে সাধারণ মানুষ জানতেই পারেননি তাদের এলাকায় উন্নয়নের জন্য কত টাকা বরাদ্দ এসেছে।

 
অনিয়ম ও দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে বকশীগঞ্জের ধানুয়া কামালপুর ইউনিয়নে। এই ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের খামার গেদরা গ্রামের একটি প্রকল্প প্রকল্পে লুটপাট-এর জ্বলন্ত উদাহরণ। নথিপত্র অনুযায়ী, জাহিদের দোকান থেকে মোতালেবের বাড়ির পাশে কালভার্ট পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারকাজের জন্য ৯ দশমিক ৯ টন গম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান বাজারমূল্যে যার দাম কয়েক লাখ টাকা। কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ওই রাস্তায় এক টাকারও মাটির কাজ করা হয়নি। রাস্তাটি খানাখন্দে ভরা এবং চলাচলের অনুপযুক্ত।

স্থানীয় দোকানদার জাহিদ মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ভাঙা রাস্তাটি কয়েক বছর যাবৎ একই অবস্থায় আছে। সরকারি কোনো কাজ এখানে হয়নি। ৮-৯ মাস আগে দুইজন লোক এসে ফিতা দিয়ে শুধু মাপজোক করে চলে গেছে। এরপর আর কাউকে দেখিনি। অথচ শুনছি এখানে নাকি লাখ লাখ টাকার গম বরাদ্দ ছিল।”

সরকারি বরাদ্দের অপেক্ষায় না থেকে নিজেদের দুর্ভোগ কমাতে স্থানীয় ভ্যানচালকরাই শেষ পর্যন্ত এগিয়ে এসেছেন। ভ্যানচালক আমজাদ হোসেন ও স্থানীয় বাসিন্দা গোলাপ হোসেন জানান, “রাস্তার বেহাল দশার কারণে আমাদের ভ্যান চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। পেটের তাগিদে আমরা ১০ জন ভ্যানচালক নিজেরা ৫০০ টাকা করে চাঁদা দিয়ে ৫ হাজার টাকা তুলেছি। স্থানীয় ইউপি মেম্বার ব্যক্তিগতভাবে ২ হাজার টাকা দিয়েছেন। মোট ৭ হাজার টাকা খরচ করে আমরা নিজেরাই ইটের সুরকি ও মাটি ফেলে রাস্তাটি চলাচলের উপযোগী করেছি। সরকারি গমের এক ছটাকও এই রাস্তায় পড়েনি।”

 
এমন সুস্পষ্ট দুর্নীতির বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ধানুয়া কামালপুর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান গোলাপ জামাল বরাবরের মতোই দায়সারা বক্তব্য দেন। তিনি দাবি করেন, “প্রকল্পের কাজ সঠিকভাবেই করা হয়েছিল। কিন্তু বৃষ্টির কারণে রাস্তাগুলো আবার ভেঙে গেছে।” তবে স্থানীয়রা বলছেন, গত এক বছরে ওই রাস্তায় এমন কোনো কাজ হয়নি যা বৃষ্টিতে ধুয়ে যেতে পারে। বৃষ্টিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে দুর্নীতির বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ তাদের।

অন্যদিকে, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) হাবিবুর রহমান সুমনের বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তিনি বলেন, “বেশির ভাগ প্রকল্প আমি নিজে পরিদর্শন করেছি। কিছু প্রকল্প আমার স্টাফরা পরিদর্শন করেছেন। যেসব প্রকল্পের বিরুদ্ধে একেবারে কাজ না হওয়ার অভিযোগ উঠেছে, তা আমি পুনরায় পরিদর্শন করে দেখব।” তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, পিআইও অফিস যদি সত্যিই পরিদর্শন করে থাকে, তবে কাজ না হওয়া প্রকল্পগুলোর বিল কীভাবে পাস হলো? আর যদি পরিদর্শন না করেই বিল দেওয়া হয়ে থাকে, তবে সেটাও বড় ধরনের অপরাধ।

বকশীগঞ্জ উপজেলায় সদ্য যোগদান করা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল হাইয়ের সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তাঁর এই নীরবতা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে জনমনে সন্দেহের সৃষ্টি করেছে।


গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে টিআর কাবিখা কাবিটা প্রকল্পগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বকশীগঞ্জে যেভাবে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে, তাতে মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়েছে। মেশিনের ব্যবহারের ফলে স্থানীয় শত শত দিনমজুর কাজ হারিয়েছেন। মাটি কাটার নিয়ম না মেনে কাজ করায় সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তাগুলো ধুয়ে যাচ্ছে। কাজ না করে টাকা তুলে নেওয়ায় গ্রামীণ রাস্তাঘাটের কোনো উন্নয়ন হয়নি, ফলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমেনি।

 
অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা, ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বার এবং উপজেলা প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এই লুটপাটের সঙ্গে জড়িত। প্রকল্পের তালিকা তৈরি থেকে শুরু করে বিল উত্তোলন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নির্দিষ্ট হারে কমিশনের লেনদেন হয়। ফলে কাজ না করেও বিল পাওয়াটা এখানে অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।

 
বকশীগঞ্জের সচেতন মহল মনে করছেন, ৫ কোটি ১২ লাখ টাকার এই বিশাল বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার হলে উপজেলার গ্রামীণ অবকাঠামোর চেহারা বদলে যেত। কিন্তু প্রকল্পে লুটপাট ও দুর্নীতির কারণে তা সম্ভব হয়নি। তারা অবিলম্বে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

স্থানীয়দের দাবি, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ২০৩টি প্রকল্পের প্রতিটির সরেজমিন তদন্ত করতে হবে। যেসব রাস্তায় কাজ হয়নি, সেখানকার বরাদ্দকৃত অর্থ ফেরত আনতে হবে। জড়িত ঠিকাদার, প্রকল্প সভাপতি এবং তদারকি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নিতে হবে।

ভবিষ্যতে সব প্রকল্পে সাইনবোর্ড টাঙানো এবং স্থানীয় নাগরিকদের নিয়ে তদারকি কমিটি গঠন নিশ্চিত করতে হবে।

সরকারি অর্থ জনগণের আমানত। সেই আমানত রক্ষায় বকশীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এই লুটপাটের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করে। উন্নয়ন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবে রূপ দিতে হলে এই দুর্নীতির চক্র ভাঙা জরুরি।


সূত্র: আমার দেশ/সেবা হট নিউজ: সত্য প্রকাশ্যে আপোষহীন


বকশীগঞ্জ- নিয়ে আরও পড়ুন
বকশীগঞ্জে ৫৪তম শীতকালীন ক্রীড়া প্রতিযোগিতার উদ্বোধন
বকশীগঞ্জে ৫৪তম শীতকালীন ক্রীড়া প্রতিযোগিতার উদ্বোধন
বকশীগঞ্জে অবৈধ ইটভাটায় অভিযান চালিয়ে ৫ লাখ ৮০ হাজার টাকা জরিমানা
বকশীগঞ্জে অবৈধ ইটভাটায় অভিযান চালিয়ে ৫ লাখ ৮০ হাজার টাকা জরিমানা
বকশীগঞ্জে শীতের দাপটে পাহাড়ি জনপদের মানুষ দুর্ভোগে
বকশীগঞ্জে শীতের দাপটে পাহাড়ি জনপদের মানুষ দুর্ভোগে
বকশীগঞ্জ সীমান্ত থেকে ১৮ হাজার ভারতীয় রুপি সহ একজন আটক
বকশীগঞ্জ সীমান্ত থেকে ১৮ হাজার ভারতীয় রুপি সহ একজন আটক
ওসমান হাদিকে হত্যার প্রতিবাদে বকশীগঞ্জে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত
ওসমান হাদিকে হত্যার প্রতিবাদে বকশীগঞ্জে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Know about Cookies
Ok, Go it!
To Top