তারেক রহমান যেভাবে বিএনপি দ্বিখণ্ডিত করবে?

তারেক রহমান যেভাবে বিএনপি দ্বিখণ্ডিত করবে?

সেবা ডেস্ক: ২০১৪ সালের ১৪ই জুন তারেক রহমানকে ‘বেয়াদব ছেলে’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন রেলপথমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক। জাতির জনকের বিরুদ্ধে তারেক রহমানের মন্তব্যের প্রেক্ষিতে তিনি বলেন, তারেক রহমান জাতির বিরুদ্ধেই কথা বলেছেন। তাই তারেক রহমানকে ত্যাজ্য করা উচিত।

একই বছরের ১৮ই ডিসেম্বর তারেক রহমানকে ‘বিশ্ব বেয়াদব’ বলে আখ্যা দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম।

২০১৮ সালের ১৯ মার্চ তারেক রহমানকে ‘বেয়াদব ছেলে’ হিসেবে আখ্যায়িত করে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেছিলেন, তারেকের জন্মই বোধহয় বিদেশে হয়েছে। এজন্যই সে সব সময় বিদেশে বসে কথা বলে, দেশে আসতে সাহস পায় না। সে চরম বেয়াদব একটা ছেলে। সে তার বাবাকেই শ্রদ্ধা করতে জানে না। তাহলে অন্যকে শ্রদ্ধা করবে কিভাবে।

শুধু সরকার দলের নেতারাই নয়, বরং বিএনপি থেকেও একাধিক নেতা বিভিন্ন সময়ে তারেক রহমানকে ‘বেয়াদব’ বলে সম্বোধন করেছেন।

বঙ্গবন্ধুকে নাম ধরে সম্বোধন করায় তারেক রহমানকে ‘বিশ্ব বেয়াদব’ বলেছিলেন বিএনপি নেতা প্রয়াত কে এম ওবায়দুর রহমানের স্ত্রী শাহেদা ওবায়েদ।

বিএনপির সাবেক এমপি মেজর (অব.) আক্তারুজ্জামান বেসরকারি টেলিভিশন এটিএন নিউজের এক টকশো’তে বলেছিলেন, তারেক রহমানের মতো ছেলের মুখে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে, মুজিবুর রহমান বলা মানায় না। বেয়াদবি করে তারেক বিএনপিকে ডুবিয়েছে। এই বেয়াদব ছেলে যদি আমাদের রাজনীতিতে আগামীতে আসে আমি জানি না, বাংলাদেশের কী অবস্থা হবে। আজকে আমার দুঃখ লাগে এই দলটাকে (বিএনপি) সে ধ্বংস করে দিয়ে গিয়েছে।

তারেক রহমানের বেয়াদবি এতোটাই বৃদ্ধি পায় যে, শুধু মাত্র জিয়াউর রহমানের মাজারে ফুল না দেয়াকে কেন্দ্র করে তারেক রহমান বি. চৌধুরী ও মাহী বি. চৌধুরীকে মারতে তার সন্ত্রাসী বাহিনীকে লেলিয়ে দেন। শেষমেশ পিতা পুত্র কোন কুল কিনারা না পেয়ে রেল লাইন দিয়ে দৌঁড়ে পালিয়ে যান।
অথচ বি. চৌধুরীকে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়া পর্যাপ্ত সম্মান দিতেন। এতো বড় সম্মানী ব্যক্তির সঙ্গে বেয়াদবি করতেও তারেকের বুক কাঁপানি।

এছাড়াও দলের প্রতিষ্ঠাতা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর কর্নেল অলিকেও দল থেকে বের করে দিতে কয়েকবার ষড়যন্ত্র করেন তারেক রহমান। তার বেয়াদবিতে অতিষ্ট হয়ে এক পর্যায়ে তিনি দল থেকে বেরিয়ে গিয়ে এলডিপি গঠন করেন।
এ প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুলপন্থী এক সিনিয়র নেতা বলেন, ২০০২ সালের ১২ই ডিসেম্বর শুধু মাত্র তারেক রহমানকে ‘তুমি’ করে সম্বোধন করার কারণে অলি আহমেদের মা-বোন নিয়ে বাজে ব্যবহার করেন তারেক রহমান।

এ প্রসঙ্গে এটিএন নিউজ চ্যানেলের হেড অব নিউজ, সাংবাদিক প্রভাষ আমিন বলেন, যখন ঘরের লোকই তারেক রহমানকে বেয়াদব বলছেন, তখন সাধারণ মানুষের মন্তব্য বুঝতে খুব একটা সমস্যা হয় না। বলতে দ্বিধা নেই, তারেক রহমানের কারণেই বিএনপির আজ এ বেহাল দশা। তারেক রহমানের সিদ্ধান্তহীনতা, অহংকার, গঠনতন্ত্রে সমন্বয়হীনতা এবং সিনিয়র নেতাকর্মীদের সঙ্গে বেয়াদবির কারণেই বিএনপি আজ অন্তঃকোন্দলে জর্জরিত।

এদিকে খালেদা জিয়া কারান্তরীণ হবার পর থেকে বিএনপির অন্তঃকোন্দল আরো বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মন্তব্য করে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য যে, তারেক রহমানের ব্যবহারে কষ্ট পেয়ে মির্জা ফখরুল ও মওদুদ আহমেদ একাধিক বার মর্ডান মেজরিটি পার্টি (এমএমপি) নামের নতুন রাজনৈতিক দল তৈরি করতে চেয়েছিলেন। এর জন্য প্রচারণা ও জনসমর্থনের জন্যও তারা মাঠে নামতে চেয়েছিলেন।

গয়েশ্বর আরো বলেন, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা চলাকালে বিএনপির বেশ কিছু নেতার বিরুদ্ধে দল ভাঙার ষড়যন্ত্রের কথা গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়। সেই তালিকায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ এবং দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতাদের নাম আসে। দলের মধ্যে কখনোই একতা’র অভাব ছিলো না। কিন্তু দলের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে তারেক রহমানের হস্তক্ষেপের কারণে আমরা অন্তঃকোন্দলের শিকার হই।

বর্তমানে জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টে যোগ দানের বিষয় নিয়েও বিএনপির অন্তঃকোন্দল খানিকটা বৃদ্ধি পেয়েছে দাবি করে গয়েশ্বর বলেন, মির্জা ফখরুল ও মওদুদপন্থী নেতারা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যোগ দেয়ার জন্য আগ্রহী হলেও রুহুল কবির রিজভীপন্থী একাধিক নেতা ডা. কামালের সঙ্গে হাত মেলাতে রাজি ছিলেন না। যার কারণে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কোনো সমাবেশেই রুহুল কবির রিজভীপন্থী নেতারা উপস্থিত হন না।

গয়েশ্বরের কথার রেশ ধরে সাংবাদিক প্রভাষ আমিন বলেন, বিএনপির একাধিক নেতার কথার প্রেক্ষিতে ধারণা করা যাচ্ছে ২০১৯ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। তবে যদি বিদেশিদের সহায়তায় বিএনপি ক্ষমতায় আসে তাহলে সর্বপ্রথম তারা তারেক রহমানের সকল শাস্তি মওকুফ করতে আদালতের শরণাপন্ন হবেন। অতঃপর তারেককে দেশে ফিরিয়ে আনবেন। তবে তারেক রহমানের পূর্বের আচরণ দেখে বোঝাই যায়, তার কারণে বিভক্ত হওয়া বিএনপি ভবিষ্যতে তারেককে দেশে ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে আরো বিভক্ত হবে।

রাজনৈতিক মহলে এমন কথার প্রচলন আছে যে, তারেক রহমান বেইমানদের কখনো ভুলে যান না। সেক্ষেত্রে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও মওদুদ আহমেদসহ যে সকল নেতা নতুন দল তৈরি করতে চেয়েছিলেন তাদের সকলকে বিএনপি থেকে ছাঁটাই করা হবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

এদিকে তারেককে ঘিরে গড়ে ওঠা লন্ডনভিত্তিক চক্র বিশেষ করে আব্দুল মালেক ও জামায়াত সংশ্লিষ্ট চক্রটি তারেকের কাছে প্রচণ্ড আস্থা তৈরি করেছে। দুঃসময়ে আব্দুল মালেকের আশ্রয়ে থেকে তারেককে তারা তাদের কাছে ঋণী করে ফেলেছেন। ফলে এ চক্রটি তারেক কেন্দ্রীক ‘হাওয়া ভবনের’ মতো আরেকটি বলয়ের সৃষ্টি করেছে। ফলে, ভবিষ্যতে দলের সিনিয়র নেতৃবৃন্দরা বঞ্চিত ও কোণঠাসা হবেন এটা মোটামুটি নিশ্চিত। পার্টির অভ্যন্তরে এ চক্রটি ইতোমধ্যেই ধরাকে সরা জ্ঞান করছে বলেই আভাস মিলছে বিভিন্ন সিনিয়র রাজনীতিকদের কথায়। ফলে অদূর ভবিষ্যতে দলে যে বিভক্তি আরো বাড়বে- তা মোটামুটি নিশ্চিত বলেই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বিএনপির থিংকট্যাঙ্ক খ্যাত বুদ্ধিজীবী।

⇘সংবাদদাতা: সেবা ডেস্ক

,

0 comments

Comments Please

themeforestthemeforest

ছবি কথা বলে