আত্মসম্মান রক্ষায় আত্মহত্যা নয়, প্রয়োজন প্রতিরোধ

আত্মসম্মান রক্ষায় আত্মহত্যা নয়, প্রয়োজন প্রতিরোধ
সেবা ডেস্ক: পরীক্ষা কেন্দ্রে মোবাইল ফোন সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল ভিকারুননিসা নূন স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী অরিত্রী অধিকারী। এজন্য বাবা-মাকে ডেকে নিয়ে অপমান করেন প্রিন্সিপাল। মেয়ের হয়ে দফায় দফায় ক্ষমা চান অরিত্রীর বাবা-মা। এরপরও প্রিন্সিপাল মেয়েটিকে স্কুল থেকে ছাড়পত্র দেওয়ার ঘোষণা দেন। পুরো ঘটনা নিজের চোখেই দেখছিল অরিত্রী। বাবা-মায়ের অপমান সইতে না পেরে ওই কিশোরী বাসায় ফিরে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে। গত বছরের ৩ ডিসেম্বরের এই ঘটনায় মানুষ মর্মাহত হয়।

গত ২৮ আগস্ট স্কুলে যাওয়ার পথে শ্নীলতাহানির শিকার হয় কুষ্টিয়া সদর উপজেলার জগতি এলাকার নবম শ্রেণির ছাত্রী ফাহিমা আক্তার। পরিবার এ নিয়ে সামাজিক বিচার চায়। বিচার না পেয়ে 'আত্মসম্মান রক্ষায়' ওই কিশোরী শেষ পর্যন্ত আত্মহননের পথ বেছে নেয়।

গাইবান্ধা সদর উপজেলার ধনকুটি গ্রামে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি এক প্রতিবেশীর বাগান নষ্ট করে কিশোরী শ্রাবন্তী রানীদের একটি ছাগল। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওই প্রতিবেশীর ছেলে মারধর করে শ্রাবন্তী ও তার মাকে। সেই অপমানে সে আত্মহত্যা করে। শ্রাবন্তী স্থানীয় একটি স্কুলের দশম শ্রেণিতে পড়ত।

অরিত্রী, ফাহিমা বা শ্রাবন্তীই নয়; প্রায় প্রতিদিন আত্মসম্মান রক্ষা করতে গিয়ে আত্মহননের খবর আসে গণমাধ্যমে। দেশে প্রতিদিন গড়ে কতজন আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়, সে হিসাব মিললেও 'আত্মসম্মান রক্ষায়' কত মানুষ আত্মহত্যা করে তার পরিসংখ্যান সরকারি-বেসরকারি কোনো দপ্তরে পাওয়া যায় না। তবে সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রায় প্রতিটি আত্মহত্যার নেপথ্যেই থাকে আত্মসম্মান রক্ষা করার বাসনা।

অবশ্য মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, আত্মসম্মান রক্ষায় আত্মহত্যা সমাধান নয়। বেঁচে থেকে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করাই কাম্য। তারা এও বলছেন, সমাজ ও রাষ্ট্রকে আত্মসম্মান হারানোর কারণ উদ্ঘাটন করে প্রচলিত আইনে বা সামাজিক ব্যবস্থা নিলে এ ধরনের আত্মহত্যা থামানো সম্ভব।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় আত্মহত্যা প্রতিরোধে বিশ্বজুড়ে কাজ করছে 'ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর সুইসাইড প্রিভেনশন (আইএএসপি)।' মানুষকে সচেতন করতে সংস্থাটি প্রতি বছরের ১০ সেপ্টেম্বর আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস পালন করে আসছে। 'ওয়ার্কিং টুগেদার টু প্রিভেন্ট সুইসাইড' (আত্মহত্যা প্রতিরোধে একযোগে কাজ করা) স্লোগানে আজ মঙ্গলবার পালিত হচ্ছে ১৭তম আন্তর্জাতিক আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস।

আত্মহত্যা প্রতিরোধে কাজ করা সংস্থাগুলো বলছে, মানুষ পারিবারিক কলহ, নির্যাতন, উত্ত্যক্ত ও ধর্ষণ, বাল্যবিয়ে, বহুবিয়ে ও যৌতুক, পরীক্ষায় অকৃতকার্য ও প্রেমে ব্যর্থ হওয়া, অসুস্থতা ও দারিদ্র্যসহ অন্তত ২৪ কারণে সাধারণত আত্মহননের পথ বেছে নেয়।

ইউনিভার্সিটি অব সাউথ আফ্রিকায় আত্মহত্যার কারণ উদ্ঘাটন ও তা প্রতিরোধ নিয়ে উচ্চতর গবেষণা করছেন ঢাকার ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক ড. আনিসুর রহমান খান। তিনি সমকালকে বলেন, নানা কারণে একজন মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। তবে প্রায় প্রতিটি ঘটনার নেপথ্যেই থাকে আত্মসম্মান রক্ষা করা। কিন্তু আত্মসম্মান রক্ষা করতে গিয়ে নিজেকে চিরতরে শেষ করে দেওয়ার মধ্যে কোনো সমাধান থাকে না। নিজের সম্মানহানি ঘটে এমন কিছুর মুখোমুখি হলে নিজেকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে না দিয়ে শক্ত হাতে এর প্রতিকার চাইতে হবে এবং প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করতে হবে।

এই সমাজবিজ্ঞানী বলেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধে পরিবার ও সমাজেরও দায় আছে। কেউ আত্মহত্যা করলে এর পেছনের পারিবারিক ও সামাজিক কারণ খুঁজে বের করতে হবে। সেই সমস্যার সমাধান করতে হবে।

মনোবিজ্ঞানীদের আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর সাইকোফিজিক্সের সদস্য ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী সাইফুদ্দীন সমকালকে বলেন, আত্মহত্যার মূল কারণ জেনেটিক। আত্মসম্মান রক্ষা বা অভিমানে আত্মহত্যা হলেও প্রতিটি ঘটনার পারিবারিক ও সামাজিক কারণ থাকে। এগুলো চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিলে আত্মহত্যা কমানো সম্ভব।

অধ্যাপক সাইফুদ্দীন বলেন, আত্মহত্যা কেউ হঠাৎ করে না। অনেক আগে থেকেই লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে থাকে। পরিবারের সদস্যরাও হয়তো তা দেখতে পান। কিন্তু এ বিষয়ে জ্ঞান না থাকায় বুঝতে পারেন না। লক্ষণ দেখা দিলে তাকে অবশ্যই মনোচিকিৎসকের কাছে নেওয়া উচিত।

আইএএসপির বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে গড়ে প্রায় ১১ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে। সে হিসাবে দিনে অন্তত ২৮ জন এবং প্রতি ৫১ মিনিটে একজন মানুষ আত্মহননের পথ বেছে নেয়। সারাবিশ্বে প্রতি বছর ৮ লাখ মানুষ আত্মহত্যা করে। সে হিসাবে প্রতি লাখে ১৬ জন এবং প্রতি ৪০ সেকেন্ডে অন্তত একজন মানুষ আত্মহত্যা করে। বিভিন্ন দেশে পুরুষরা আত্মহত্যা বেশি করলেও এভাবে নিজেকে শেষ করে দেওয়ার চেষ্টা বেশি করেন নারীরা। বাংলাদেশে বেশি আত্মহত্যা করেন নারীরা। চীনের কিছু প্রদেশেও নারীরা আত্মহত্যা বেশি করে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যানুযায়ী, গত পাঁচ বছরে দেশে গলায় ফাঁস দিয়ে ও বিষপানে ৫৪ হাজার ৩৯ জন আত্মহত্যা করে। এর মধ্যে গত বছর ১১ হাজার ৪৮৪ জন, ২০১৭ সালে ১১ হাজার ৩৭, ২০১৬ সালে ১০ হাজার ৬৮৫, ২০১৫ সালে ১০ হাজার ৬২৭ এবং ২০১৪ সালে ১০ হাজার ২০৬ জন আত্মহত্যা করে। এর বাইরে অন্যান্য উপায়ে আত্মহত্যার ঘটনাও রয়েছে। মামলা দায়েরের ভিত্তিতে তৈরি করা এই পরিসংখ্যান বলছে, প্রত্যেক বছরই আত্মহত্যার ঘটনা বেড়ে চলছে। তবে তা ঠেকাতে সরকারি পর্যায়ে কোনো উদ্যোগ নেই।

এদিকে বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম বলছে, গত ৬ মাসে ধর্ষণের পর বিচার না পেয়ে ১০টি শিশু আত্মহত্যা করেছে। এ সময়ে নানা কারণে ১৩৩ শিশু আত্মহত্যা করে এবং অন্তত ১০ শিশু আত্মহত্যার চেষ্টা করলেও প্রাণে বেঁচে যায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে উদ্ধৃত করে বাংলাদেশে আত্মহত্যা প্রতিরোধে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা সোসাইটি ফর ভলান্টারি অ্যাক্টিভিটিস (শোভা) বলছে, ১৯৭২ সাল থেকে '৮৮ সাল পর্যন্ত বিশ্বে প্রতি লাখে ৪ জন মানুষ আত্মহত্যা করত। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত তা ১০ জনে ছিল। বর্তমানে সেই সংখ্যা ১৬ জনে দাঁড়িয়েছে। তবে বাংলাদেশে প্রতি লাখে গড়ে ৭ জন আত্মহত্যা করে। এর মধ্যে ঝিনাইদহ জেলায় এই হার লাখে ১৬ থেকে ২২ জন।

শোভা ঝিনাইদহ জেলায় আত্মহত্যা প্রতিরোধে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। ওই এলাকায় আত্মহত্যার কারণ ও তা প্রতিরোধের উপায় নিয়েও সংস্থাটি গবেষণা করে আসছে। এর প্রতিষ্ঠাতা ও পরামর্শক জাহিদুর ইসলাম সমকালকে বলেন, ঝিনাইদহ জেলায় আত্মহত্যার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। গত বছর ওই জেলার ৬টি উপজেলায় ৩৯৬ জন আত্মহত্যা করে। চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে সেই সংখ্যা ১৫৬ জন।

ওই জেলায় সর্বোচ্চ আত্মহত্যার কারণ কী? জাহিদুর বলেন, ঝিনাইদহে নদী ভাঙন, জলোচ্ছ্বাস, খরা বা বন্যার মতো বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না থাকায় ওই এলাকার মানুষের প্রতিকূল পরিবেশে সংগ্রাম বা কষ্ট সহ্য করার মানসিকতা কম। এ ছাড়া প্রাকৃতিক কারণেই এখানকার কিছু মানুষ আগ্রাসী মনোভাবের। ঝিনাইদহ ও আশপাশের জেলাগুলোর মানুষ অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ এবং তাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাও কম। আশপাশের আত্মহত্যার ঘটনাও তাদের প্রভাবিত করে। এর বাইরে অন্যান্য জেলার মতো সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক কারণও এখানে রয়েছে।

 -সেবা হট নিউজ: সত্য প্রকাশে আপোষহীন

,

0 comments

Comments Please