ছাত্রীদের অর্ধ কোটি টাকা প্রধান শিক্ষকের সঞ্চয়ী হিসাবে জমা

ছাত্রীদের অর্ধ কোটি টাকা প্রধান শিক্ষকের সঞ্চয়ী হিসাবে জমা

মাসুদুর রহমান : সরিষাবাড়ী সালেমা খাতুন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ওয়াজেদা পারভীনের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাৎ, অভিভাবক ও শিক্ষক কর্মচারীদের সাথে দুর্ব্যবহার এবং নিয়োগ বাণিজ্য সহ বিভিন্ন দুর্নীতির তথ্য পাওয়া গেছে। ছাত্রীদের কাছ থেকে বিদ্যালয়ের নামে ব্যবহৃত ব্যাংক রশিদের মাধ্যমে আদায়কৃত প্রায় অর্ধ কোটি টাকা প্রধান শিক্ষক ওয়াজেদা পারভীনের সঞ্চয়ী হিসাবে জমা হয়েছে। ওয়াজেদা পারভীনের বিভিন্ন অপকর্ম ও দুর্নীতির সঠিক তদন্ত করে প্রশাসন,শিক্ষা মন্ত্রণালয়,শিক্ষা বোর্ড এর নিকট আইনগত ব্যবস্থার জন্য জোর দাবী জানিয়েছেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারী, অভিভাবক, সচেতন মহল সহ স্থানীয় এলাকাবাসী ।

বিদ্যালয় ও ব্যাংক অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৬ সালে ১৬ জুলাই রুপালী ব্যাংক লিঃ আরামনগর বাজার শাখায় জামালপুর স্টেশন রোড ঠিকানা ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সঞ্চয়ী হিসাব (নং-৫৯২৬০১০০০০৩১৯) খোলেন ওয়াজেদা পারভীন। তারপর থেকেই ছাত্রীদের কাছ থেকে প্রধান শিক্ষকের নিজ নামীয় ব্যক্তিগত সঞ্চয়ী হিসাবে রশিদের মাধ্যমে অর্থ আদায় করতে থাকলে সমালোচনা শুরু হওয়ার পর ২০১৬ সালের ২৬ জুলাই সরিষাবাড়ী সালেমা খাতুন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এর নামে বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ও প্রধান শিক্ষক/সম্পাদক যৌথ স্বাক্ষরের মাধ্যমে রুপালী ব্যাংক লিঃ আরামনগর বাজার শাখায় চলতি হিসাব (৫৯২৬০২০০০০১৩৫) খোলা হয়। ওয়াজেদা পারভীনের ব্যক্তিগত সঞ্চয়ী হিসাব খোলার পর বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের কাছ থেকে ব্যাংক রশিদের মাধ্যমে ২০১৬ সালের ১৬ জুলাই থেকে ২০২১ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত ৩৪ লক্ষ ৬৬ হাজার ১৮১ টাকা জমা ও ২০১৬ সালের ২৭ জুলাই থেকে ২০২১ সালের ১৪ মার্চ পর্যন্ত ৩৪ লক্ষ ৬৩ হাজার ৯৩১ টাকা উত্তোলন করা হয়। অপরদিকে বিদ্যালয়ের যৌথ স্বাক্ষরে পরিচালিত চলতি হিসাবে ২০১৬ সালের ২৭ জুলাই থেকে ২০২১ সালের ১১ এপ্রিল পর্যন্ত ৪১ লক্ষ ৬৫ হাজার ৬০ টাকা জমা ও ২০১৬ সালের ২ আগস্ট থেকে ২০২১ সালের ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত ৩৯ লক্ষ ৩৯ হাজার ৩৬০ টাকা উত্তোলন করা হয়। এদিকে ওয়াজেদা পারভীনের ব্যক্তিগত সঞ্চয়ী হিসাবে আদায় হওয়া অর্থ নিজেই আত্মসাৎ করেছেন বলে একাধিক সুত্রে জানা যায় । 

বিদ্যালয় ও পরিচালনা পর্ষদ ও অভ্যন্তরীণ অডিট কমিটি সূত্রে জানা যায়,সরিষাবাড়ী সালেমা খাতুন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অভিভাবকদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে ২০১৫-২০১৬,২০১৬-২০১৭ ও ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরের ৫৮ লাখ ১৪ হাজার ১২ টাকা ০১ পয়সার দুর্নীতির অডিট কমিটির প্রতিবেদনের রিপোর্ট অনুযাযী  বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান স্বাক্ষরিত ১০দিনের সময় দিয়ে পর্যালোচনাসহ ব্যাখ্যা প্রদানের জন্য ২০২১ সালের ৭ মার্চ ১ম নোটিস জারী করেন। ১৮ মার্চ ওয়াজেদা পারভীন পর্যালোচনাসহ সহ ব্যাখ্যার জবাব না দিয়ে লিখিত ভাবে আরও ১০দিন সময়ের জন্য আবেদন করলে সভাপতি সময় বৃদ্ধির আবেদনটি মঞ্জুর করে ৩০ মার্চ এর মধ্যে জবাব দেওয়ার জন্য নির্দেশ প্রদান করেন। ৯ এপ্রিল ম্যানেজিং কমিটির সভায় ওয়াজেদা পারভীনের জবাব সন্তোাষ জনক ও বিধি সম্মত না হওয়ায়  ১০ এপ্রিল পর্যালোচনাসহ ব্যাখ্যা প্রতিবেদন তৈরীর সুবিধার্থে প্রধান শিক্ষক ওয়াজেদা পারভীনকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ছুটি এবং ১১ এপ্রিল বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক আসাদুজ্জামান সামাদকে প্রশাসনিক এবং অর্থনৈতিক কর্মকান্ড সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করে নোটিশ জারী করেন বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান। এ ছাড়াও এন টি আর সি কর্তৃক নিয়োগ প্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক (হিন্দু ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা) নিভা রাণী পাল এর নিকট থেকে এমপিও করা বাবদ ১লক্ষ ত্রিশ হাজার টাকা  নেন ওয়াজেদা পারভীন। নিভা রাণী পাল এর নিকট টাকা না থাকার কারণে বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ কল্যাণ ট্রাস্ট থেকে ধার নিয়ে প্রধান শিক্ষককে দেন যা নিভা রাণী পাল প্রতি মাসে বেতন থেকে পরিশোধ করছেন বলে তুলে ধরে গত ২৫ এপ্রিল বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন নিভা রাণী পাল। বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচিত হওয়ায় বিষয়টি ৩ মে উপজেলা নির্বাহী অফিসার শিহাব উদ্দিনের সভাপতিত্বে তার অফিস কক্ষে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য কয়েকজন বিশেষ মহলের উপস্থিতিতে বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদ পরিচালনা কমিটির সভাপতির নিকট ওয়াজেদা পারভীন ক্ষমা প্রার্থনা করলে বিশেষ মহল ওয়াজেদা পারভীন প্রধান শিক্ষক হিসেবে যেন পুনরায় দায়িত্ব পালন করতে পারেন বলে সভাপতির নিকট অনুরোধ করে ও বিদ্যালয়ে পরিচালিত অভ্যন্তরীণ অডিট বিষয়ে প্রধান শিক্ষকের নিকট বিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক টাকা পাওনা থাকলে সেটা বিদ্যালয়ের চলতি হিসাবে জমা দিতে বলে মর্মে উপস্থিত সকলেই মতামত ব্যক্ত করেন। প্রধান শিক্ষককে আতœসাতকৃত ৫৮ লক্ষ ১৪ হাজার ১২ টাকা ০১ পয়সা থেকে মাত্র  এক কালীন ২ লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা ও প্রতি মাসে বিদ্যালয়ের  ফান্ডে ১০ হাজার টাকা করে ২৫ মাসে পরিশোধ করার শর্তে প্রধান শিক্ষক ওয়াজেদা পারভীনকে স্বপদে বহালের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ৩০ মে জনতা ব্যাংক সরিষাবাড়ী শাখায় বিদ্যালয়ের চলতি (নং-১০২১০০১৫৮৬) হিসাবে ২ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা জমা দেন ওয়াজেদা পারভীন । বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের মিটিং টি ১৩ মে হলেও আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রকাশ করা হয়েছে ৩০ মে। ওয়াজেদা পারভীনের দুর্নীতির সঠিক বিচার না হওয়া ও পুনরায় দায়িত্ব গ্রহণ নিয়ে  স্থানীয় রাজনৈতিক , সচেতন মহল ও শিক্ষক-কর্মচারী,শিক্ষার্থীসহ অভিভাবকদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। শুরু  হয়েছে সমালোচনার ঝড় । 

প্রকাশ থাকে যে , তিনি সরিষাবাড়ী উপজেলার  সানাকৈর শেখ খলিলুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেন । পরে সরিষাবাড়ী রিয়াজ উদ্দিন তালুকদার উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করে পরবর্তীতে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন রত অবস্থায় ৫৬ হাজার টাকা দুর্নীতি করেন। দুর্নীতির দায়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেয়ে অডিট কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী তার মাসিক বেতন থেকে আত্মসাৎকৃত টাকা পরিশোধ করেন। তারপর তিনি ২০১৫ সালের ১ জানুয়ারী সরিষাবাড়ী সালেমা খাতুন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করে আবারো পুর্বের মতো অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাৎ, অভিভাবক ও শিক্ষক কর্মচারীদের সাথে দুর্ব্যবহার এবং নিয়োগ বাণিজ্য সহ বিভিন্ন দুর্নীতি শুরু করে।
 
এ বিষয়ে মুঠোফোনে সরিষাবাড়ী সালেমা খাতুন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ওয়াজেদা পারভীন এড়িয়ে গিয়ে বলেন , আপনি সভাপতি সাহেবের সাথে যোগাযোগ করুন । 

কথা হলে অডিট কমিটির সদস্য ও বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের বিদ্যুৎসাহী সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হামিদ সত্যতা স্বীকার করে জানান, গত ৩ মে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে সমঝোতা হয়েছে । আপনি বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান শাহজাদার সাথে কথা বলেন। 

কথা হলে বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান শাহজাদা ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন।

এ বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ মোজাম্মেল হক বলেন, ইতোপূর্বে সালেমা খাতুন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে ছুটি দিয়েছিল সেটা অনুলিপি পেয়েছি। বিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্ট থাকলে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে নিজ অ্যাকাউন্টে টাকা জমা নেওয়ার কোন বিধান নেই। 

কথা হলে সরিষাবাড়ী উপজেলা নির্বাহী অফিসার শিহাব উদ্দিন জানান, সালেমা খাতুন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি আছে,ম্যানেজিং কমিটি এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিবে। এদিকে উপজেলা নির্বাহী অফিসার শিহাব উদ্দিনকে সমঝোতার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে কোন ধরনের সমঝোতার মিটিং হয়নি বলে তিনি জানিয়েছে । 
 


শেয়ার করুন

-সেবা হট নিউজ: সত্য প্রকাশে আপোষহীন

,

0 comments

মন্তব্য করুন

খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।