পাকিস্তানের দৈনিক দ্য ডন পত্রিকায় “দ্য বাংলাদেশ স্টোরি”

পাকিস্তানের দৈনিক দ্য ডন পত্রিকায় “দ্যা বাংলাদেশ স্টোরি”
দ্য ডন পত্রিকায় প্রকাশিত নিউজের স্ক্রিনশট



সেবা ডেস্ক: স্বাধীনতা’র ৫০ বছরে’র মধ্যেই বাংলাদেশ কীভাবে প্রতিবেশী ভা’রত এবং একাত্তরে হেরে যাওয়া পাকিস্তানকে সামাজিক-অর্থনৈতিক বেশি’রভাগ সূচকে পেছনে ফেলছে সেই গল্প নিয়ে পাকিস্তানে’র দৈনিক দ্য ডনেদ্য বাংলাদেশ স্টোরিশিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেছেন পাকিস্তানে’র প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানে’র প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কা’র নীতিবিষয়ক উপদেষ্টা ইশরাত হুসাইন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে’র আগে বাংলাদেশে’র পটুয়াখালী, চট্টগ্রাম ঢাকায় কর্ম’রত ছিলেন।

পাকিস্তানি দৈনিক ডনেবাংলাদেশে’র গল্পশিরোনামে লেখা নিবন্ধে তিনি বলেছেন, একদা হেনরি কিসিঞ্জারে’র চোখেতলাবিহীন ঝুড়ি’র সেই বাংলাদেশকে এখন উন্নয়নে’র রোল মডেল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। স্বাধীনতা’র প’র বাংলাদেশে’র জাতীয় আয় ৫০ গুণ, মাথাপিছু আয় ২৫ গুণ (ভা’রত পাকিস্তানে’র চেয়ে বেশি) এবং খাদ্য উৎপাদন চা’র গুণ বেড়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি . গুনে’র মধ্যে সীমাবদ্ধ ‘রয়েছে। ফলে মাথাপিছু খাদ্যপ্রাপ্তি বেড়েছে। ১৯৯০ সালে’র তুলনায় ‘রপ্তানি ১০০ গুণ বেড়েছে। দারিদ্র ৬০ শতাংশ (১৯৯০ সাল) থেকে ২০ শতাংশে নেমে এসেছে। প্রত্যাশিত গড় আয়ু বেড়ে ৭২ বছ’র হয়েছে। একমাত্র শ্রীলঙ্কা ছাড়া এই অঞ্চলে’র প্রায় সব দেশে’র চেয়ে বেশি’রভাগ সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ এগিয়ে আছে। মানব উন্নয়ন সূচকে’র মান ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

মাত্র গত ৩০ বছরে’র মধ্যেই বাংলাদেশে’র এই উন্নয়ন হয়েছে। তা’র আগে’র প্রথম দুই দশকে কঙ্কালসা’র বাংলাদেশ নানামুখী সংকট রাজনৈতিক অস্থি’রতা’র মুখোমুখি হয়েছে। ১৯৯০ সালে পাকিস্তানে’র মাথাপিছু আয় বাংলাদেশে’র তুলনায় দ্বিগুণ ছিল, কিন্তু আজ তা কমে মাত্র সাত-দশমাংশে নেমে এসেছে। করোনাভাইরাস মহামারি’র আগে ২০১১ থেকে ২০১৯ সালে’র মাঝে বাংলাদেশে’র মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) গড়ে থেকে শতাংশে’র মধ্যে ছিল- যা ওই সময়ে পাকিস্তানে’র জিডিপি’র তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।

বাংলাদেশে’র গল্প বেশ আকর্ষণীয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ একটি দেশ কীভাবে তা’র দৈত্যাকা’র প্রতিবেশী ভা’রত এবং পাকিস্তানকে বেশি’রভাগ আর্থ-সামাজিক সূচকে ছাড়িয়ে যেতে গেল?

দেশটিতে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত সামরিক শাসন ছিল। এ’রপ’র দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা পায়।

১৯৯১ সাল থেকে পালাবদল করে ক্ষমতায় আছে প্রধান দুই রাজনৈতিক দল শেখ হাসিনা’র আওয়ামী লীগ এবং খালেদা জিয়া’র বিএনপি। ২০০৭ সালে সাময়িক বিঘ্ন ঘটে; এই সময় তত্ত্বাবধায়ক স’রকা’র দুই বছরে’র জন্য দেশ শাসন করে। ২০০৯ সাল থেকে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে এবং টানা তৃতীয়বারে’র মতো নির্বাচনে জয়ী হয়েছে। দুই নেত্রী’র লড়াই এবং তিক্ততা তীব্রই ‘রয়ে গেছে। খালেদা জিয়া নির্বাচন বর্জন করেছেন এবং দলে’র জ্যেষ্ঠ অনেক নেতা’র মতো তিনিও কারান্তরীণ আছেন।

ধ’রনে’র ভয়ানক রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং অস্থিতিশীলতাকে সঙ্গী করে কীভাবে দেশটি যথেষ্ঠ অর্থনৈতিক সামাজিক অগ্রগতি বজায় রাখছে তা খুবই বিস্ময়ক’র।

তিক্ত রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। এটা কীভাবে হল?

প্রথমত, ভা’রত পাকিস্তানে’র বিপরীতে বাংলাদেশে’র মানুষ একই ভাষা, জাতিসত্তা ইতিহাসে’র সঙ্গে সাংস্কৃতিকভাবে সমজাতীয় এবং কার্যত কোনো ধর্মীয়, সাম্প্রদায়িক, উপজাতি সামন্ত বিভাজন নেই। গ্রামীণ-শহুরে বিভাজন থাকলেও দ্রুত উন্নয়ন নিশ্চিতে’র ফলে সাধা’রণ মানুষে’র অসন্তোষ নেই। আ’রও ভালো করা’র ইচ্ছা-অভিপ্রায় শক্তিশালী সামাজিক নীতি হয়ে উঠেছে। বাইরে’র কোনো গুরুত’র হুমকি’র সম্মুখীন নয় বাংলাদেশ।

দ্বিতীয়ত, রাজ্য বা প্রদেশে’র হস্তক্ষেপকারী কোনো কাঠামো নেই। এ’র ফলে একক কেন্দ্রীয় স’রকা’র প্রশাসনিক, রাজনৈতিক, আইনি আর্থিক ক্ষমতা’র নিয়ন্ত্রণ ক’রছে। যে কা’রণে বহু-স্তরে’র স’রকা’র ব্যবস্থা’র অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব নেই। দুর্বল বিরোধীদল এবং প্রশাসনে’র শীর্ষে দলীয় অনুগতদে’র নেতৃত্ব (কখনো কখনো আধা-কর্তৃত্ববাদী হিসেবে সমালোচিত) যে কোনো ধ’রনে’র সিদ্ধান্ত কার্যক’র করা’র ক্ষমতাকে শক্তিশালী এবং আমলাদে’র দায়বদ্ধ করে তোলে।

তৃতীয়ত, ১৯৭১ সালে’র আগেও নারী’র ক্ষমতায়ন প্রবল ছিল। কিন্তু পরিবা’র পরিকল্পনা, নারী শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং ক্ষুদ্রঋণে’র জন্য বেস’রকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো’র (এনজিও) সক্রিয় সম্পৃক্ততা’র ফলে প’রবর্তী সব স’রকা’র সকল স্তরে জোরেশোরে প্রচা’রণা অব্যাহত রেখেছিল।

নিজেদে’র দুর্বলতা সম্পর্কে সচেতন স’রকা’র সুশীল সমাজে’র সংস্থা এনজিওগুলোকে পূর্ণ সমর্থন এবং স্বাধীনভাবে কাজ করা’র সুযোগ দিয়েছে। শিক্ষিত সুস্থ নারীদে’র আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কাজে’র সুযোগ ‘রয়েছে। এ’র ফলে নারী শ্রমে’র হা’র বৃদ্ধি পেয়েছে এবং লিঙ্গ বৈষম্য হ্রাসে ভূমিকা রাখছেন এই নারীরা। ছেলেদে’র তুলনায় প্রাথমিক স্কুলে মেয়েদে’র ভর্তি’র অনুপাত ১০৫ শতাংশ।

চতুর্থত, তিক্ত রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা’র প’রও অর্থনৈতিক নীতি, প্রকল্প এবং কর্মসূচি বাস্তবায়নে ধারাবাহিকতা ‘রয়েছে। দলগুলো মূল পাটাতন- সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, রাজস্ব আহ’রণ, মুক্ত বাণিজ্য, বেস’রকারি খাতকে উৎসাহ দান এবং সামাজিক উন্নয়নে’র প্রতিশ্রুতি থেকে বিচ্যুত হয়নি। স’রকা’র বদল হলেও নীতিমালা’র কা’রণে উন্নয়ন কিংবা বিনিয়োগকারী এবং বাজা’র পরিস্থিতিতে তা’র কোনো প্রভাব পড়ে না। বরং সময়ে’র সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে’র জন্য বিনিয়োগকারীরা নির্বিঘ্ন পরিকল্পনা নিতে পারেন।

পঞ্চমত, বাংলাদেশে’র বাণিজ্য উদারীক’রণ, উন্মুক্ত অর্থনীতি, বিদেশি প্রযুক্তিগত জ্ঞান ভাগাভাগি এবং ‘রপ্তানিকা’রকদে’র উদা’র নগদ প্রণোদনা দেওয়া’র প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ হয়েছে। দর্শনীয় এই কর্মযজ্ঞে’র ফলে তৈরি পোশাক ‘রপ্তানিতে চীনে’র প’রই ‘রয়েছে বাংলাদেশ। এ’র সুফলও ভোগ ক’রছে দেশটি। বেশি’রভাগ বিদেশি ব্র্যান্ড তাদে’র পোশাক তৈরি’র জন্য বাংলাদেশকে বেছে নিচ্ছে। এই শিল্পে নারী’র কর্মসংস্থান তাদে’র সামাজিক মর্যাদা এবং পরিবারে’র মধ্যে ক্ষমতা’র সম্পর্ক বৃদ্ধি করেছে। দেশে’র উদ্যোমী তরুণদে’র মাঝে উদ্যোক্তা হওয়া’র প্রবল আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। উচ্চ শিক্ষা এবং দক্ষতা’র চাহিদা তুমুল বৃদ্ধি পেয়েছে।

ষষ্ঠত, দেশীয় সঞ্চয় এবং বিনিয়োগে’র হা’র ১৫ শতাংশ থেকে দ্বিগুণ বেড়ে ৩০ শতাংশ হওয়ায় উচ্চ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে। উৎপাদন খাতে বেস’রকারি বিনিয়োগে’র বিশাল আধিপত্য এবং অবকাঠামো খাতে স’রকারি ব্যয়ে’র কা’রণে এসবে’র সুফল ব্যাপকভিত্তিক হয়েছে। ক্রমবর্ধমান সামগ্রিক চাহিদা উচ্চ-আমদানি’র ক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু ‘রপ্তানি এবং রেমিট্যান্স সম্প্রসা’রণে’র মাধ্যমে আমদানিতে অর্থায়ন করা হয়েছিল। যে কা’রণে চলমান ঘাটতি স্বাভাবিকভাবেই মোকাবিলা করা সম্ভব হয়েছে।

বাংলাদেশে’র কাছ থেকে আমরা অনেক কিছু শিখতে পারি। দেশটি’র প্রধান দুই দলে’র নেতৃত্ব বুঝতে পেরেছিল যে, শুধু ছোট একটি অভিজাত শ্রেণি’র ক্ষমতা সীমাবদ্ধ রাখা’র পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদে জনগণকেও সম্পৃক্ত ক’রতে হবে। এতেই বরং রাজনৈতিক লাভ বেশি হবে। দুটি দলই নির্বাচনে একজন প্রার্থী’র ব্যক্তিগত অবস্থানে’র চেয়ে তা’র কার্যক্রম, জনপ্রিয়তা এবং দলীয় রেকর্ডে’র ভিত্তিতে মনোনয়ন দিয়েছে, যা’র ফলে নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়েছে। বেস’রকারি খাত, রাজনীতিবিদ এবং আমলাদে’র মধ্যে ঐক্যে’র সম্পর্ক স্থিতিশীল ভা’রসাম্য নিয়ে এসেছে। রাজনীতিবিদরা তাদে’র নির্বাচনী প্রচা’রণা’র জন্য ব্যবসা’র কাছ থেকে অর্থ পেতেন, আমলারা তাদে’র স্বল্প বেতনকে উপহা’র এবং পারিশ্রমিক দিয়ে পরিপূ’রণ ক’রতেন এবং ব্যবসায়ীরা শ্রম পরিবেশে’র খ’রচে তাদে’র ব্যবসা’র প্রসা’র ঘটান। কিন্তু তারা টাকা বিদেশে নিয়ে যাননি।

ট্যাক্স-জিডিপি’র অনুপাত থেকে শতাংশ ‘রয়েছে। এ’র পেছনে’র দর্শনটি সম্ভবত, ব্যক্তিগত ব্যবসায়ীদে’র হাতে একটি প্রান্তিক ডলারে’র প্রভাব স’রকারি খাতে’র চেয়ে বহুগুণ বেশি হয়। ফলে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স’রকা’রকে বিচক্ষণতা অবলম্বন ক’রতে হয়। ঘাটতি শতাংশে’র নিচে ‘রয়েছে এবং এভাবে প্রাথমিক আর্থিক উদ্বৃত্তে’র কা’রণে স’রকারি ঋণে’র অনুপাত হ্রাস পেয়েছে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতিমালা’র ধারাবাহিকতা, ‘রফতানি বৃদ্ধি, মানবসম্পদে বিনিয়োগ (বিশেষ করে নারীদে’র জন্য) এবং স’রকারি বেস’রকারি খাত একত্রে কাজ করা’র মধ্য দিয়েই  বাংলাদেশে’র এই সাফল্য এসেছে।  


শেয়ার করুন

-সেবা হট নিউজ: সত্য প্রকাশে আপোষহীন

,

0comments

মন্তব্য করুন

খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।