সেবা ডেস্ক: যৌনতা জীবনের স্বাভাবিক চাহিদা, যা জীবনের অন্যান্য দিকের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য ভালবাসা ও বিশ্বাসের মতোই প্রয়োজন যৌন পরিতৃপ্তি। প্রত্যেক মানুষের যৌনচাহিদা ভিন্ন হয়ে থাকে।
বিপরীত লিঙ্গ, সমলিঙ্গ বা উভলিঙ্গের প্রতি আকর্ষণের পাশাপাশি, সমাজমাধ্যমে আরও একটি যৌনচাহিদার আলোচনা উঠে আসছে—যেখানে কারও প্রতি যৌন আকর্ষণই তৈরি হয় না।
অনেকে যৌন আকর্ষণ অনুভব করেন না, এবং এটিকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক বলে মানা হয়। যাঁরা যৌনবাসনা অনুভব করেন না, তাঁদের সাধারণত নিষ্কাম বা ‘অ্যাসেক্সুয়াল’ বলে চিহ্নিত করা হয়।
কিন্তু যৌনতাকে সবসময় সমকামী, বিষমকামী বা উভকামী এই চেনা সমীকরণে মাপা যায় না। সমস্ত ধরনের যৌনচাহিদার মাঝামাঝি এমন একটি গোষ্ঠীর অস্তিত্ব রয়েছে, যাঁদের যৌনতার সংজ্ঞাকে ধরাবাঁধা কোনও ছকের মধ্যে ফেলা যায় না।
সাদা বা কালোর মাঝামাঝি ধূসর অংশে বিচরণ করে এই গোষ্ঠী। এটি হল ‘ধূসর যৌনতা’ বা ‘গ্রে সেক্সুয়ালিটি’।
এই শব্দটি ততটা পরিচিত না হলেও, বিশেষ করে জেন জ়ি প্রজন্মের মধ্যে এই প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। কদাচিৎ বা শুধুমাত্র নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে যৌন আকর্ষণ অনুভব করেন এঁরা।
সহজ কথায়, একজন ‘ধূসর লিঙ্গ’-এর ব্যক্তি সম্পূর্ণ রূপে নিষ্কাম নন। তবে তাঁরা বেশিরভাগ মানুষের মতো ঘনঘন বা তীব্রভাবে যৌন আকর্ষণ অনুভব করেন না।
‘গ্রে সেক্সুয়াল’ শব্দটি প্রথম ২০০৬ সালে ‘অ্যাসেক্সুয়াল ভিজিবিলিটি অ্যান্ড এডুকেশন নেটওয়ার্ক’ (AVEN)-এ প্রকাশিত হয়। তারপর থেকে এটি তাঁদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হয়ে উঠেছে, যাঁরা নিষ্কাম ও যৌনতা পছন্দ করার মাঝামাঝি পর্যায়ে অবস্থান করেন।
উইকিপিডিয়া অনুসারে, ধূসর যৌনতা অ্যাসেক্সুয়াল স্পেকট্রামের অংশ, যেখানে যৌন আকর্ষণের পরিমাণ সীমিত এবং তীব্রতা পরিবর্তনশীল।
নিয়মিত যৌন আকর্ষণ অনুভব করা এবং কোনও যৌন অভিজ্ঞতা না থাকা—দুই ধরনের মানুষই হঠাৎ করে নিজেদের ধূসর যৌনতার ক্ষেত্রে আবিষ্কার করতে পারেন। আশ্চর্যজনকভাবে, বহু মানুষই এখন ‘ধূসর’ হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিতে পছন্দ করছেন।
তাঁদের যৌনচাহিদার অনুভূতির কথা সর্বসমক্ষে তুলে ধরতেও দ্বিধা করছেন না। বিশেষ করে জেন জ়ি প্রজন্মের মধ্যে এই ট্রেন্ড লক্ষণীয়।
নিউ ইয়র্ক পোস্টের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেন জ়ি-র সাম্প্রতিক ‘অবসেশন’ হল ‘গ্রে সেক্সুয়াল’ হিসেবে কামিং আউট করা, যেখানে যৌন আকর্ষণ অ্যালোসেক্সুয়াল (নিয়মিত যৌন আকর্ষণ) এবং অ্যাসেক্সুয়ালের মধ্যবর্তী ধূসর এলাকায় থাকে।
একইভাবে, ডেলি মেলের রিপোর্টে উল্লেখ আছে যে তরুণদের মধ্যে ‘গ্রে সেক্সুয়াল’ পরিচয় নেওয়ার সংখ্যা বাড়ছে, যা কদাচিৎ বা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে যৌন আকর্ষণ অনুভব করাকে বোঝায়।
সমাজমাধ্যমে এই আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে। রেডিটে ‘r/graysexuality’ বা অনুরূপ গ্রুপে প্রায় ৮ হাজার ৩০০ জনেরও বেশি সদস্য রয়েছেন, যাঁরা তাঁদের যৌন আকাঙ্ক্ষা এবং ঘনিষ্ঠতার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন।
X (পূর্বতন টুইটার)-এও এই বিষয়ে আলোচনা চলছে; উদাহরণস্বরূপ, আনন্দবাজারের একটি পোস্টে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে, ‘আপনিও কি ‘গ্রে সেক্সুয়াল’?’ অন্যান্য ব্যবহারকারীরা নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করছেন, যেমন একজন লিখেছেন যে তাঁরা ধূসর যৌনতার সাথে সংযুক্ত হয়ে অনুভব করেন যে যৌন আকর্ষণ অস্থির বা কম তীব্র।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু মানুষের যৌনচাহিদা প্রবল, আবার কিছুর একেবারেই নেই। তাঁদের মাঝামাঝি পর্যায়ে অবস্থান করেন এই গোষ্ঠীর মানুষজন। তাঁদের সম্পর্কে যৌনতা খুব একটা প্রাধান্য পায় না। সঙ্গীর প্রতি খুব একটা যৌন আকর্ষণ অনুভব করেন না তাঁরা। তবে কখনও কখনও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তাঁদের যৌনচাহিদা প্রকাশ পায়। শুধুমাত্র নির্দিষ্ট ব্যক্তির প্রতি বা নির্দিষ্ট মানসিক অবস্থায় আকর্ষণ অনুভব করতে পারেন। অনেক ক্ষেত্রে যৌনতা ব্যতীত অন্য উপায়ে মানসিক ঘনিষ্ঠতা বা আলিঙ্গনের মাধ্যমে ভালবাসা প্রকাশ করতে ইচ্ছুক হন এঁরা। রেডিটের একটি পোস্টে বলা হয়েছে, ধূসর যৌনতা অ্যাসেক্সুয়াল স্পেকট্রামের অংশ, যা অস্বাভাবিক বা কম তীব্র যৌন আকর্ষণ দ্বারা চিহ্নিত।
লন্ডননিবাসী ড্যান বিসন নিজেকে ‘গ্রে সেক্সুয়াল’ বলে পরিচয় দিতে ভালবাসেন। তিনি সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন, ‘‘গ্রে সেক্সুয়ালিটি হল হঠাৎ করে যৌন আকাঙ্ক্ষা বিষয়ে সম্পূর্ণ নিরুত্তাপ থাকা। এই পর্যায় কয়েক মাস স্থায়ী হতে পারে। তারপর একদিন হঠাৎ অনুভব করা যায় যে আদিম প্রবৃত্তিটি আবার ফিরে এসেছে।’’ আরেকজন, ডায়ানে শি, যিনি তেমনভাবে যৌন আকর্ষণ অনুভব করেন না, বলেন যে তাঁর কাছে রোম্যান্টিক আকর্ষণ ক্ষণস্থায়ী। তাঁর দীর্ঘদিনের সঙ্গীর প্রতিও খুব কম যৌন আকর্ষণ অনুভব করেন, এবং তাঁর সঙ্গীও এটি মেনে নিয়েছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন অনেক উদাহরণ পাওয়া যায়, যেমন একজন ইউজার লিখেছেন যে তাঁরা ধূসর যৌনতার সাথে সংযুক্ত হয়ে অনুভব করেন যে যৌনতা তাঁদের জীবনে কম গুরুত্বপূর্ণ।
নিজেদের যৌনচাহিদার বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন থাকেন গ্রে সেক্সুয়ালিটির নর-নারীরা। তাঁরা খুব স্পষ্টভাবেই জানেন, তাঁদের যৌনতার প্রতি আগ্রহ অন্যদের মতো নিয়মিত নয়। সমাজমাধ্যমে তাঁদের চাহিদার বিষয়গুলি সোজাসাপটা ভাবে তুলে ধরতে শুরু করেছেন। নতুন প্রজন্মের অধিকাংশ তরুণ-তরুণী গ্রে সেক্সুয়ালিটির তকমাকে তাঁদের যৌন পরিচয়ের জন্য অত্যন্ত সহায়ক বলে চিহ্নিত করেছেন। জেন জ়ি প্রজন্মের এক ইউটিউবার লিখেছেন, এটি মানুষকে বুঝতে সাহায্য করে যে গ্রে সেক্সুয়াল গোষ্ঠীর মানুষ যৌন আকর্ষণ অনুভব করেন, তাঁরাও যৌনমিলনে আগ্রহী, যৌনতা নিয়ে ফ্যান্টাসি উপভোগ করেন, কিন্তু অনেকের তুলনায় সেগুলির গুরুত্ব তাঁদের কাছে উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
আরও একটি সম্পর্কিত ধারণা হল ‘ডেমিসেক্সুয়ালিটি’, যা ধূসর যৌনতার একটি অংশ। ‘গ্রে সেক্সুয়াল’ গোষ্ঠীর একাংশ নিজেদের ‘ডেমিসেক্সুয়াল’ হিসেবেও পরিচয় দেন। তাঁদের দাবি, একমাত্র শক্তিশালী মানসিক বন্ধন তৈরি করার পরেই তাঁরা যৌন আকর্ষণ বা যৌনচাহিদা অনুভব করেন। এটি যৌনতার স্পেকট্রামকে আরও বিস্তৃত করে তোলে।
সামগ্রিকভাবে, ধূসর যৌনতা যৌন পরিচয়ের একটি গতিশীল অংশ, যা সোশ্যাল মিডিয়া এবং নতুন প্রজন্মের সচেতনতার মাধ্যমে আরও দৃশ্যমান হচ্ছে। এটি দেখিয়ে দেয় যে যৌনতা কোনও কঠোর বিভাজন নয়, বরং একটি স্পেকট্রাম, যেখানে প্রত্যেকের অভিজ্ঞতা অনন্য। যদি আপনিও এই ধূসর অঞ্চলে নিজেকে খুঁজে পান, তাহলে জেনে রাখুন—এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং গ্রহণযোগ্য।
তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার
খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।