সেবা ডেস্ক: রাজধানীর কাকরাইলে জাতীয় পার্টির (জাপা) কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে গণ-অধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশ ও জাপা নেতাকর্মীদের পৃথক দুটি সংঘর্ষের ঘটনায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।
![]() |
জাপা কার্যালয়ের সামনে পুনরায় সংঘর্ষ: নুরুল হক নুর মারাত্মক আহত, হাসপাতালে ভর্তি |
শুক্রবার (২৯ আগস্ট ২০২৫) সন্ধ্যা ও রাতে ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় গণ-অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে কাকরাইলের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
এছাড়া, গণ-অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খাঁনসহ উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী এবং সাংবাদিকরাও আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনাবাহিনী ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে গণ-অধিকার পরিষদের একটি মশাল মিছিল কাকরাইলের জাতীয় পার্টির কার্যালয়ের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় প্রথম দফা সংঘর্ষের সূচনা হয়।
গণ-অধিকার পরিষদের দাবি, তাঁদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা অতর্কিতভাবে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে হামলা চালায়।
অন্যদিকে, জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেছেন যে গণ-অধিকার পরিষদের মিছিল থেকে তাঁদের কার্যালয়ে হামলা করা হয়েছে।
এই ঘটনায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ইট-পাটকেল নিক্ষেপের ফলে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হন, যার মধ্যে গণ-অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খাঁনও ছিলেন। আহতদের দ্রুত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
গণ-অধিকার পরিষদের উচ্চতর সদস্য ও গণমাধ্যম সমন্বয়ক আবু হানিফ জানান, “আওয়ামী লীগের দোসরদের কার্যক্রম নিষিদ্ধের দাবিতে আমাদের বিক্ষোভ সমাবেশ ছিল।
পল্টন জিরো পয়েন্ট থেকে মিছিল নিয়ে নাইটেঙ্গেল মোড় যাওয়ার পথে জাতীয় পার্টির কার্যালয়ের সামনে পৌঁছালে পেছন থেকে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ শুরু হয়।
আমাদের ধারণা, জাতীয় পার্টির পাশাপাশি আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের সন্ত্রাসীরাও এই হামলায় জড়িত ছিল।”
আরও পড়ুন:
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের প্রেস সেক্রেটারি খন্দকার দেলোয়ার জালালী এক বিবৃতিতে দাবি করেন, “জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে।
আমরা শুনতে পাচ্ছি, ফের আমাদের কার্যালয়ে হামলার পরিকল্পনা চলছে।” তিনি রাত সাড়ে ৮টায় কাকরাইলের কার্যালয়ে এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনের ঘোষণাও দেন।
(ads1)
প্রথম দফা সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও রাত সোয়া ৮টার দিকে গণ-অধিকার পরিষদের নেতাকর্মীরা পুনরায় জাতীয় পার্টির কার্যালয়ের সামনে জড়ো হন।
এ সময় জাপা নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাঁদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনী এসে জাপা নেতাকর্মীদের সরিয়ে দেয়।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গণ-অধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে ১০ মিনিট সময় দেয়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্থান ত্যাগ না করায় পুলিশ ব্যাপক লাঠিচার্জ শুরু করে।
এই লাঠিচার্জে গণ-অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর মারাত্মকভাবে আহত হন। রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে দ্রুত উদ্ধার করে কাকরাইলের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা গেছে, সংঘর্ষের সময় গণ-অধিকার পরিষদের নেতাকর্মীরা ইট-পাটকেল ছুড়ে এবং পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে জাপা কার্যালয়ের চত্বরে প্রবেশের চেষ্টা করে।
এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এলাকাটি ঘিরে ফেলা হয়।
সংঘর্ষে আহত নুরুল হক নুরকে কাকরাইলের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাঁর অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে।
এছাড়া, গণ-অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খাঁনসহ অন্যান্য আহত নেতাকর্মীদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রাশেদ খাঁন সংবাদমাধ্যমকে জানান, “জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা আমাদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে অতর্কিত হামলা চালিয়েছে। এই হামলা ছিল পূর্বপরিকল্পিত।”
সংঘর্ষের পর বিজয়নগর ও কাকরাইল এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সংঘর্ষের সময় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনাবাহিনী ও পুলিশের বিপুল সংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হয়। রমনা থানার পরিদর্শক (অপারেশন) আতিকুল আলম খন্দকার ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এবং তিনি নিশ্চিত করেছেন যে সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে ঢিল ছোড়াছুড়ির ঘটনার পর পুলিশ দ্রুত হস্তক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
তবে, দ্বিতীয় দফা সংঘর্ষে পুলিশের লাঠিচার্জের ঘটনা নতুন করে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
গণ-অধিকার পরিষদের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সহ-সভাপতি ওমর ফারুক বলেন, “জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের দোসর। তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ না করা পর্যন্ত আমরা এখান থেকে যাব না।”
তিনি দাবি করেন, জাতীয় পার্টির কার্যালয় থেকে তাঁদের মিছিলে হামলা করা হয়েছে।
অন্যদিকে, জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম মেম্বার আলমগীর শিকদার লোটন ও সাইফুদ্দিন মিলনসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন।
তাঁরা দাবি করেন, গণ-অধিকার পরিষদের মিছিল থেকে তাঁদের কার্যালয়ে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে উসকানি দেওয়া হয়েছে।
(ads2)
এই সংঘর্ষের পেছনে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপট রয়েছে। গত ১ নভেম্বর ২০২৪-এও বিজয়নগরে জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্র, শ্রমিক ও জনতার’ ব্যানারে একটি মিছিল থেকে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছিল।
জাতীয় পার্টি অভিযোগ করেছিল যে তাঁদের কার্যালয়ে ভাঙচুর ও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে, যদিও অপর পক্ষ দাবি করেছিল যে জাপা থেকে প্রথমে হামলা করা হয়েছিল।
জাতীয় পার্টির ইতিহাসে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সঙ্গে জোট গঠনের বিষয়টি বিতর্কিত। ২০০৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট গঠনের পর জাপা ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ হিসেবে সমালোচিত হয়েছে।
গণ-অধিকার পরিষদ এই সংঘর্ষের পেছনে জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছে, যা এই দুই দলের মধ্যে চলমান উত্তেজনাকে আরও প্রকট করেছে।
সংঘর্ষের পর বিজয়নগর ও কাকরাইল এলাকায় সেনাবাহিনী ও পুলিশের কঠোর নজরদারি চলছে। স্থানীয় সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হলেও উত্তেজনা
এখনও পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি। স্থানীয় বাসিন্দারা আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন, এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পুনরায় সংঘর্ষের আশঙ্কা রয়ে গেছে।
এই ঘটনা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির অস্থিরতা এবং দলগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান শত্রুতার প্রতিফলন। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
গণ-অধিকার পরিষদ ও জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে এই ঘটনার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের জন্য সংবাদ সম্মেলনের প্রস্তুতি চলছে।
খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।