নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে দলের ‘ভারপ্রাপ্ত’ হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর অবশেষে দলের পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন তারেক রহমান।
![]() |
| বিএনপির পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিলেন তারেক রহমান: মায়ের উত্তরসূরি হিসেবে নতুন অধ্যায়ের সূচনা |
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো আজ। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে দলের ‘ভারপ্রাপ্ত’ হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর অবশেষে দলের পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন তারেক রহমান। আজ শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) রাতে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির এক জরুরি বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে তাকে এই দায়িত্ব অর্পণ করা হয়।
সদ্যপ্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুজনিত কারণে দলের শীর্ষ পদটি শূন্য হয়। সেই শূন্যতা পূরণ এবং আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার লক্ষ্যে দলের গঠনতন্ত্র অনুসরণ করে এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
শুক্রবার রাতে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলের স্থায়ী কমিটির এই জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের পর গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চেয়ারম্যান পদটি শূন্য ঘোষণা করা হয়। এই পরিস্থিতিতে দলের নেতৃত্ব ও চেইন অব কমান্ড অটুট রাখতে এবং সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা পূরণে স্থায়ী কমিটির সদস্যরা তারেক রহমানকে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার অনুরোধ জানান। তিনি সেই অনুরোধ রক্ষা করে দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, "বিএনপির গঠনতন্ত্র মোতাবেক জাতীয় স্থায়ী কমিটির সভায় সর্বসম্মতিক্রমে শূন্য পদে আনুষ্ঠানিকভাবে তারেক রহমানকে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে।"
বিএনপির এই নেতৃত্ব বদল সম্পূর্ণ গঠনতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়েছে। বিএনপির গঠনতন্ত্রের ৭-এর ‘গ’ ধারার ৩ উপ-ধারায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে—‘যেকোনো কারণে চেয়ারম্যানের পদ শূন্য হলে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান চেয়ারম্যানের অবশিষ্ট মেয়াদের জন্য চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন এবং গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পরবর্তী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি চেয়ারম্যানের দায়িত্বে বহাল থাকবেন।’
যেহেতু তারেক রহমান ২০০৯ সালে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং ২০১৮ সাল থেকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন, তাই গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তিনিই এই পদের একমাত্র এবং বৈধ উত্তরাধিকারী।
গত ৩০ ডিসেম্বর সকাল ছয়টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন বাংলাদেশের রাজনীতির আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর মৃত্যুতে কেবল বিএনপি নয়, সমগ্র বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হয়। ১৯৮৪ সালের ১০ মে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন দলের ঐক্যের প্রতীক।
দীর্ঘদিন লিভার সিরোসিস, কিডনি জটিলতা ও হৃদরোগসহ নানা জটিল রোগে ভুগে তিনি চলে যান না ফেরার দেশে। তাঁর মৃত্যুর পর দলের নেতাকর্মীদের মাঝে শোকের ছায়া নেমে আসে। তবে সামনে জাতীয় নির্বাচন থাকায় শোককে শক্তিতে পরিণত করে নেতৃত্বের এই পালাবদল অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল।
আজ যিনি বিএনপির চেয়ারম্যান, সেই তারেক রহমান হঠাৎ করে নেতৃত্বে আসেননি। তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল তৃণমূল থেকে। আশির দশকে স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি মায়ের সঙ্গে রাজপথে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৮৮ সালে তিনি দলের গাবতলী উপজেলা ইউনিটে সাধারণ সদস্য হিসেবে বিএনপিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান করেন।
১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় তিনি বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সারা দেশ চষে বেড়িয়েছেন। নির্বাচনী প্রচারণায় তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতার প্রথম প্রকাশ ঘটে। তবে তারেক রহমানের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরে যায় ১৯৯৩ সালে। সে বছর বগুড়া জেলা ইউনিটে তিনি এক ব্যতিক্রমী সম্মেলনের আয়োজন করেন, যেখানে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে নেতা নির্বাচন করা হয়। এই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া দলে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং তিনি অন্যান্য জেলা ইউনিটকেও এভাবে নেতা নির্বাচনে উৎসাহিত করেন।
২০০২ সালে দলের স্থায়ী কমিটি তাঁকে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে মনোনীত করে। এরপর ২০০৫ সালে তিনি সারা দেশে তৃণমূল প্রতিনিধি সম্মেলনের মাধ্যমে দলের সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করেন। দেশের প্রতিটি উপজেলা ইউনিটের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় করে তিনি ‘তৃণমূলের নেতা’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
তারেক রহমানের রাজনৈতিক পথচলা কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। ১/১১-এর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৭ সালে তিনি গ্রেপ্তার হন। রিমান্ডে থাকাকালীন নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর ২০০৮ সালে জামিনে মুক্তি পেয়ে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে পাড়ি জমান।
দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে গত ২৫ ডিসেম্বর, ২০২৫ তারিখে তিনি দেশে ফিরে আসেন। তাঁর এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ছিল দলের নেতাকর্মীদের জন্য এক বিশাল বিজয়। দেশে ফেরার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় তিনি তাঁর মাকে হারান। মায়ের মৃত্যুশোক বুকে নিয়েই আজ তিনি দলের পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, তারেক রহমান তাঁর মায়ের মতোই ধাপে ধাপে নেতৃত্বে এসেছেন। প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া যেমন ১৯৮৩ সালের মার্চে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালে চেয়ারপারসন হয়েছিলেন, তারেক রহমানও ২০০৯ সালে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং পরবর্তীতে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান থেকে আজ পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান হলেন।
২০১৮ সালে মিথ্যা মামলায় বেগম খালেদা জিয়া কারাবন্দি হওয়ার পর থেকে গত সাত বছর লন্ডন থেকেই তিনি দলকে সুসংগঠিত রেখেছেন। তাঁর নেতৃত্বেই বিএনপি এবং সমমনা দলগুলো ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলে, যার ফলশ্রুতিতে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়।
চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমান-এর সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো দলকে সুসংগঠিত রেখে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে বিজয় নিশ্চিত করা। মায়ের মৃত্যুতে দলের নেতাকর্মীরা মানসিকভাবে কিছুটা বিপর্যস্ত হলেও নতুন চেয়ারম্যানের নেতৃত্ব তাদের উজ্জীবিত করবে বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারকরা।
তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বলছেন, "শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শ এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন নেতৃত্ব এখন তারেক রহমান-এর মাধ্যমে এগিয়ে যাবে। আমরা বিশ্বাস করি, তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি রাষ্ট্র ক্ষমতায় গিয়ে জনগণের ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করবে।"
আজকের এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে 'খালেদা জিয়া যুগ' থেকে 'তারেক রহমান যুগে' প্রবেশ করল। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই পরিবর্তন সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সূত্র: /সেবা হট নিউজ: সত্য প্রকাশ্যে আপোষহীন
তারেক রহমান- নিয়ে আরও পড়ুন

তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন: নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়ে ঢাকবে রাজধানী

অবশেষে ট্রাভেল পাস হাতে পেলেন তারেক রহমান: ২৫ ডিসেম্বর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন চূড়ান্ত

দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসনের অবসান: ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরছেন তারেক রহমান

তারেক রহমানের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বকশীগঞ্জে কোরআন শরীফ বিতরণ


খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।